হরপ্পা সভ্যতার ধর্মীয় জীবন

- July 13, 2019
(১) সিন্ধু উপত্যকায় খননকার্যের ফলে প্রচুর অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি মিলেছে। পারস্য, এলাম, মেসােপটেমিয়া, মিশর প্রভৃতি স্থানেও এ ধরনের মূর্তি মিলেছে। মনে হয় সর্বত্র ধর্মের এই আদর্শ প্রচলিত ছিল। পণ্ডিতরা এই মূর্তিগুলিকে মাতৃমৃতি বা ভূমাতৃকা বলেছেন। সিন্ধু উপত্যকার এই মূর্তিগুলিতে ধোঁয়ার চিহ্ন স্পষ্ট। মনে হয় দেবীকে প্রসন্ন করার জন্য ধূপ - তেল দেওয়া হত এবং সামনে প্রদীপ জ্বালা হত। তাদের উদ্দেশ্যে নরবলি দেওয়া হত। একটি সিলে নরবলির চিহ্ন স্পষ্ট। তবে এই মাতৃদেবী কুমারী, না কোনও পুরুষ দেবতার স্ত্রী তা বলা দুরূহ।
Indus Valley/Harappan Civilization Skeleton Pictures
২) হরপ্পা সভ্যতায় মন্দিরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ আছে। কয়েকটি বড়াে বড়াে অট্টালিকাকে অনেকে মন্দির বলে মনে করেন। সেগুলি মন্দির হলেও সেখানে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে পুজোর রীতি প্রচলিত ছিল না।

(৩) একটি সিলে উথানপাদ ভঙ্গিতে এক নগ্ন নারীমূর্তি অঙ্কিত আছে। সেই নারীর উদর থেকে উদ্গত হয়েছে একটি চারাগাছ। মনে হয় সিন্ধুবাসী মনে করত যে মেয়েদের মা হওয়া, আর মাটিতে ফসল হওয়া একই ব্যাপার। অনেকে একে ভূ - মাতার মুর্তি বলে মনে করেন। পরবর্তীকালের হিন্দুধর্মেও এ বিশ্বাস মুছে যায় নি। দেবী দুর্গার অপর নাম শাকস্তুরী অর্থাৎ যিনি ‘আয়ুদেহসমুবৈঃ' (যিনি নিজ দেহ সমুদ্ভূত)।

(৪) একটি সিলে বাঘ, হাতি, গণ্ডার, মােষ ও হরিণ — এই পাঁচটি পশু দ্বারা পরিবৃত ও ত্রিমুখবিশিষ্ট ধ্যানমগ্ন এক যােগামূর্তি দেখা যায়। মূর্তিটির মাথায় দুটি শিং আছে। অনেকের ধারণায় এটি শিব - মূর্তি, কারণ হিন্দু ধারণায় শিৰ হলেন ত্রিমুখ, পশুপতি ও যােগেশ্বর। অধ্যাপক ব্যাসাম এটিকে 'আদি শিব’ বলে অভিহিত করেছেন কারণ শিবের বাহন ষাড়, কিন্তু এই মূর্তিতে ষাড় নেই।

(৫) সিন্ধুবাসীদের মধ্যে বৃক্ষ, আগুন, জল, সাপ বিভিন্ন জীবজন্ত, লিঙ্গও যােনি পূজা এবং সম্ভবত সূর্য উপাসনাও প্রচলিত ছিল। কয়েকটি সিলে সূর্যের প্রতীক স্বস্তিকা ও চক্র পাওয়া গেছে।

(৬) একটি সিলে একটি অর্ধ-নর অর্ধ বৃষ মূর্তিকে একটি বাঘের সঙ্গে লড়াই করতে দেখা যাচ্ছে। এই মূর্তিটি হল সুমেরের গিলগামেশ নামক বীরের সাহায্যকারী অর্ধ-নর অর্ধ-বৃষ আকৃতিবিশিষ্ট 'ইঅবনি' মুর্তির অনুরূপ। সিন্ধু উপত্যকার এই মূর্তি সুমেরীয় সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার ঐক্য প্রমাণ করে। এছাড়া, এই মুর্তি পৌরাণিক যুগের হিরণ্যকশিপু নিধনকারী নৃসিংহ মূর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে হয় যে, সিন্ধুবাসীরা এই নর-বৃষ মূর্তিকে দেবতা হিসেবে পূজা করত।

(৭) সিন্ধুবাসী পরলােকে বিশ্বাস করত। তারা মৃতদেহ (remains) সমাধিস্থ করত। খননকার্যের ফলে প্রায় ৫৭টি বর আবিষ্কৃত হয়েছে। সমাধি ছিল তিন ধরনের — (ক) মৃতদেহের সঙ্গে আসবাসপত্র, অলঙ্কার প্রভৃতি দেওয়া হত। একে বলা হয় পূর্ণ সমাধি। (খ) কেবলমাত্র মৃতের কঙ্কালটিকে কবরস্থ করা হত। (গ) মৃতদেহ ভস্মীভূত করে কেবলমাত্র ভস্মাবশেষটুকু একটি পাত্রে ভরে, তা সমাধিস্থ করা হত। মৃতদেহকে সাধারণত কবরস্থানের উত্তর থেকে দক্ষিণে শায়িত করা হত। লােথালে কয়েকটি যুগ্ম কবর, অর্থাৎ পাশাপাশি দুটি কঙ্কাল শায়িত অবস্থায় পাওয়া গেছে। অনেকের মতে কবরের এই ভেদাভেদ শ্রেণি-বৈষম্যের পরিচায়ক।
Advertisement