সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা

- July 10, 2019
বিশ্বের প্রাচীন নদীমাতৃক সভ্যতাগুলির সমসাময়িক ছিল প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা। তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের প্রাচীনতম এই সভ্যতা হরপ্পার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল বলে এর নাম হরপ্পা সভ্যতা। মুলকেন্দ্র হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো ছাড়াও রংপুর, কোটদিজি, কালিবঙ্গান, রূপার, লোথাল প্রভৃতি প্রায় 250 টি জায়গায় উন্নত নগরজীবনের নিদর্শন ও নগর পরিকল্পনা (Urban Planning) লক্ষ করে নিঃসন্দেহে হরপ্পা সভ্যতাকে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা বলা যায়।
মহেঞ্জোদারো স্নানাগার
রাস্তাঘাট (Harappan Civilization Roads): এখানকার রাস্তাগুলি ছিল 9 ফুট থেকে 34 ফুট চওড়া। পূর্ব পশ্চিম এবং উত্তর দক্ষিণে সোজা ও প্রশস্ত রাস্তাগুলি একে অপরকে অতিক্রম করেছে। পোড়া ইট, চুন, সুরকি, বালি ও পাথর দিয়ে রাস্তাগুলি তৈরি ছিল। প্রধান রাজপথ থেকে ছোট ছোট রাস্তা ও গলির রাস্তা তৈরি করা হত। বড়াে রাস্তাগুলির দু-দিকে নির্মাণ করা হত। পাথরের তৈরি বাড়ির নিদর্শন পাওয়া যায়নি। বাড়িগুলিতে কােনো লোহার নিদর্শন পাওয়া যায়নি। প্রতিটি বাড়িতে ছিল প্রশস্ত উঠোন, স্নানঘর, কুয়াে, সােকপিট ও নর্দমা। বাড়িগুলি উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল। গর্ডন চাইল্ড মনে করেন, এখানকার অধিবাসীরা গৃহনির্মাণের পৌর আইন মান্য করতেন। বাড়িগুলি সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকত।

দুর্গ (Harappan Civilization Citadel): মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা ও কালিবঙ্গানে একটি করে দুর্গের ধংসাবশেষ পাওয়া গেছে। হরপ্পার দুর্গের বাইরে দেওয়াল কাঁচা ইটের তৈরি ও 13 মিটার চওড়া। দুর্গে হরপ্পা সভ্যতার শাসক শ্রেণির মানুষ বাস করতেন। প্রতিটি বাড়ির নর্দমা বড়াে রাস্তার নর্দমার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য ম্যানহােলের ব্যবস্থা ছিল। এ. এল. ব্যাসাম বলেছেন, "No other ancient civilization untill that of the Romans has so efficient a system of drains" .

জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা (Harappan Civilization Drainage System): প্রতিটি বাড়ির শৌচাগারের জল ও বৃষ্টির জল রাস্তার নীচ দিয়ে বড়াে নর্দমায় নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল। বাড়ির দূষিত জল নর্দমা দিয়ে এসে রাস্তার ঢাকা দেওয়া বাঁধানো নর্দমায় পড়তো। নর্দমা গুলি পরিষ্কারের জন্য ইট দিয়ে তৈরি ঢাকা ম্যানহোল এর ব্যবস্থা ছিল। ড: কোশাম্বি এর মতে, আধুনিক কালের আগে ভারতের কোনাে শহরে এত উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

মহেঞ্জোদারো শস্যাগার (Mahenjodaro Barn): মহেঞ্জোদারোর স্নানাগারের পাশে ছিল একটি কেন্দ্রীয় শস্যাগার। এর আয়তন ছিল দৈর্ঘ্য ২০০ফুট এবং প্রস্থে ১৫০ ফুট। শস্যাগার-সংলগ্ন বিরাট চাতালে শস্য ঝাড়াই - মাড়াই হত। শস্যাগারের পাশেই ছিল শ্রমিকদের বাসস্থান। ডঃ এ . এল . ব্যাসাম এটিকে রাষ্ট্রিয় ব্যাঙ্কের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্যার মর্টিমার হুইলার বলেন যে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের পূর্বে এ ধরনের বিশাল শস্যাগার পৃথিবার আর কোথাও পাওয়া যায় নি।

মহেঞ্জোদারো সভাগৃহ (Mahenjodaro Hall): মহেঞ্জোদারোতে এক বিরাট সভাগৃহ পাওয়া গেছে। অনেকে এটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সম্প্রতি S. R. Rao সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করায় এখানকার অধিবাসীদের স্বাক্ষরজ্ঞানের সঙ্গে এই সভাগৃহটি সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করা হয়।

মহেঞ্জোদারো স্নানাগার (Great Bath): মহেঞ্জোদারোতে একটি বিরাট স্নানাগার পাওয়া গেছে। এর মাপ ছিল (180x108) বর্গফুট। ভিতরে জলাধারটির মাপ ছিল (39x23) বর্গফুট। গভীরতা ছিল 23 বর্গফুট। স্নানাগারটি পোড়া ইট দিয়ে বাঁধানো। ইটগুলি তৈরি হয় জিপসাম এবং মর্টার দিয়ে। ঋতুভেদে জল গরম বা ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থাও ছিল। এই জলাধারের তিনদিকে ছিল বারান্দা এবং একদিকে ছিল ছোট ছোট কিছু ঘর। রামশরণ শর্মার মতে, স্নানের পর পােশাক পরিবর্তনের জন্য ঘরগুলি ব্যবহৃত হত। স্যার মর্টিমার হুইলার করেন যে, ভারতীয় ধর্মীয় জীবনে স্নানের গুরত্ব অপরিসীম। স্নানাগারটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহূত হত এবং এর সন্নিহিত ঘরগুলি ছিল পুরোহিতদের বাসস্থান। ডঃ দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বি এই কক্ষগুলিকে পতিতাদের বাসস্থান বলে উল্লেখ করেছেন।

পৌর শাসন (Urban Rules): গর্ডন চাইল্ড মনে করেন, হরপ্পায় উন্নত পেীর শাসন ছিল। উদারনৈতিক পেীর শাসন না থাকলে এত সুন্দর পরিকল্পিত নগর গড়ে উঠত না।

উন্নত নির্মাণ কৌশল (Advance Craft): গ্রিড পদ্ধতিতে বাড়িঘর নির্মাণ করা হত। রাস্তাঘাট, পয়ঃপ্রণালী, ডাস্টবিন, সােকপিট সব কিছুই উন্নত পরিকল্পিত নির্মাণ শৈল্পিই প্রমাণ করে।

গ্রন্থপঞ্জি (Reference Books):
1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় - প্রাচীন ভারতের ইতিহাস
2. দিলীপকুমার চক্রবর্তী - ভারতবর্ষের প্রাগিতিহাস
3. Romila Thapar - History of India
4. Sen, Shailendra Nath - Ancient Indian History and Civilization
5. S. Ratnagar - The Harappan Civilization
6. Basham - The Wonder That was India
Advertisement