মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য

- July 23, 2019
মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর বংশ পরিচয় নিয়ে দুটি মত প্রচলিত। গ্রীক লেখক জাস্টিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে নীচবংশগত অভিহিত করেছেন। বিশাখদত্তের মুদ্রারাক্ষস নাটকে তাকে বৃশল ও কুলহীন বলা হয়েছে। পুরাণের কোথাও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে শূদ্র বলা হয় নি, কিন্তু বিষ্ণুপুরাণ এর এক টীকাকার তাকে নীচবংশজাত বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মাতা বা মাতামহী মুরা ছিলেন নন্দ বংশের এক রাজার শূদ্রপত্নী। মুরার নাম থেকে চন্দ্রগুপ্ত প্রতিষ্ঠিত বংশ মৌর্যবংশ নামে পরিচিত।
মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
জৈন পরিশিষ্টপার্বণ-এ তাকে ময়ূর পােষক বা ময়ূরপালকদের এক প্রজাতান্ত্রিক গােষ্ঠীর দলপতির সন্তান বলা হয়েছে। বৌদ্ধগ্রন্থ মহাবংশ অনুসারে তিনি ছিলেন মোরিয় নামে এক ক্ষত্রিয় বংশের সন্তান। বৌদ্ধগ্রন্থ মহাপরিনির্বাণ সূত্র-তে বলা হচ্ছে যে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ছিলেন হিমালয়ের পাদদেশে পিপ্পলিবন নামক স্থানের মোরিয় নামে এক প্রজাতান্ত্রিক ক্ষত্রিয় গােষ্ঠীর সন্তান। মুরা নয়—মোরিয় নাম থেকে প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ মৌর্যবংশ নামে পরিচিত হয়েছে।

চন্দ্রগুপ্তের বাল্যজীবন : বৌদ্ধগ্রন্থ থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রথম জীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। বলা হয় যে, তার পিতা হিমালয়ের পাদদেশে পিপ্পলিবনে মােরিয় গােষ্ঠীর নেতা ছিলেন। তিনি যুদ্ধে নিহত হলে তার সহায় সম্বলহীন পত্নী শিশুপুত্র চন্দ্রগুপ্তকে নিয়ে পাটলিপুত্রে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে রাখাল ও শিকারি বালকদের মধ্যে চন্দ্রগুপ্তের বাল্যকাল অতিবাহিত হতে থাকে। কথিত আছে যে, এই সময় চাণক্য নামে নন্দশাসন বিদ্বেষী জনৈক বিচক্ষণ ব্রাহ্মণ তাঁর মধ্যে নানা রাজোচিত লক্ষণ ও গুণাবলী লক্ষ করে তাকে তক্ষশিলায় নিয়ে যান এবং রাজনীতি ও যুদ্ধবিদ্যায় সুশিক্ষিত করে তােলেন। বলা বাহুল্য, এই চাণক্যই হলেন ইতিহাস খ্যাত বিশিষ্ট কূটনীতিজ্ঞ কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত।

চন্দ্রগুপ্ত ও আলেকজাণ্ডারের মধ্যে সাক্ষাৎ : গ্রিক ঐতিহাসিক জাস্টিন ও প্লুটার্ক - এর রচনা থেকে জানা যায় যে, ৩২৬-৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজাণ্ডারের ভারত আক্রমণকালে তরুণ চন্দ্রগুপ্ত আলেকজাণ্ডারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্বৈরাচারী নন্দশাসন উচ্ছেদের জন্য তার সাহায্য প্রার্থনা করেন। আলেকজাণ্ডার তার নির্ভীক আচরণকে ঔদ্ধত্য বলে মনে করে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। ভীত স্বতন্তু গ্রিক শিবির থেকে দ্রুত পলায়ন করে প্রাণরক্ষা করেন। জাস্টিন এর মতে এরপর তিনি বিন্ধ্যর অরণ্য সংকুল অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং স্থানীয় উপজাতিদের নিয়ে একটি সেনাদল গড়ে তােলেন।

নন্দ বংশের উচ্ছেদ : চন্দ্রগুপ্তের সর্বপ্রথম কৃতিত্ব হল মগধের সিংহাসন থেকে নন্দ বংশের স্বৈরাচারী শাসক ধননন্দকে উচ্ছেদ করে সেখানে মৌর্য বংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। নন্দশাসন সম্পর্কে জনমত তখন প্রবল ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। (১) ধননন্দ ছিলেন নিষ্ঠুর এবং প্রজাপীড়ক। (২) তিনি প্রজাদের উপর অতিরিক্ত হারে কর আরোপ করেন এবং তা আদায়ের জন্য নানা অত্যাচার করতেন। (৩) ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে গ্রিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জনচক্ষে তিনি অপদার্থ বলে প্রতিপন্ন হন। (৪) তিনি শূদ্রবংশােদ্ভূত হওয়ায় জনচক্ষে তার মর্যাদা নষ্ট হয়। মহাবংশ, জৈন পরিশিপার্বণ, পুরাণ, মুদ্রারাক্ষস প্রভূতি গ্রন্থ থেকে ধননন্দের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্তের যুদ্ধের কথা জানা যায়। বলা হয় যে, ভুল রণকৌশলের জন্য নন্দরাজার বিরুদ্ধে চন্দ্রগুপ্তের প্রথম অভিযান ব্যর্থ হয়। তিনি সরাসরি রাজধানী পাটলিপুত্রের উপর আক্রমণ হেনেছিলেন। কথিত আছে যে, এ সময় চন্দ্রগুপ্ত জনৈক শিশু ও তার মায়ের কথােপকথন থেকে এক অপূর্ব শিক্ষালাভ করেন, যা তিনি তার পরবর্তী রণকৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। বলা হয় যে, জনৈক শিশু খাদ্যগ্রহণ করতে গিয়ে প্রথমেই গরম ভাত বা রুটির মাঝখানে হাত দেওয়ায় তার মা শিশুটিকে এই বলে ভৎসনা করেন যে, গৱম ভাত বা রুটির মাঝখানটি চারপাশের খাবারের চেয়ে অনেক বেশি গরম থাকে। এই থেকে চন্দ্রগুপ্ত শিক্ষা নিয়ে ধীরে ধীরে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। দ্বিতীয় চেষ্টায় চন্দ্রগুপ্ত যুদ্ধে জয়ী হন, ধননন্দ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন এবং মগধের সিংহাসনে মৌর্য বংশ প্রতিষ্ঠিত হয় (৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে)।

গ্রীক শাসনের উচ্ছেদ : চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের অপর কীর্তি হল উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে গ্রিক শাসনের অবসান ঘটানাে। গ্রিক বীর আলেকজাণ্ডার পাঞ্জাব ও ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে গ্রিক আধিপত্য স্থাপন করেছিলেন ঠিকই ভারতীয়রা এই আধিপত্য মেনে নিতে পারে নি। ৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজাণ্ডারের ভারত ত্যাগের পরেই ভারতে অধিকৃত অঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয় কান্দাহারে। তারপর অশ্বকায়ন নামক স্থানের অধিবাসীরা গ্রিক গভর্নর নিকানাের এবং উচ্চ সিন্ধু উপত্যকার অধিবাসীরা গভর্নর ফিলিপ্পোস-কে হত্যা করে (৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে)। ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজাণ্ডারের মৃত্যুর পর ভারতে ব্যাপক গােলযােগ শুরু হয়। এর উত্তরাধিকারহীন আলেকজাণ্ডারের সাম্রাজ্যের বন্টন নিয়ে তার সেনাপতিদের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয়। এর ফলে ভারতে গ্রিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযােগে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য গ্রিকদের উপর আক্রমণ হানেন। জাস্টিন লিখেছেন যে, "আলেকজাণ্ডারের মৃত্যু পর ভারতীয়রা দাসত্বের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে দেয় এবং গ্রিক শাসনকর্তাদের হত্যা করে। এই মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ছিলেন সান্ড্রোকোটাস বা চন্দ্রগুপ্ত।" গ্রিক ঐতিহাসিকদের রচনা উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, এই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ৩২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং তা শেষ হয় ৩১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এইভাবে পাঞ্জাব ও সিন্ধু জয় করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য উত্তর পশ্চিমে সিন্ধুনদ ছিল চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যের সীমানা।

চন্দ্রগুপ্ত ও সেলুকাসের মধ্যে যুদ্ধ : সিরিয়া ও ভারতবর্ষ সহ পশ্চিম এশিয়া সেনাপতি সেলুকাসের ভাগে পড়ে। এই অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি সিন্ধু অঞ্চলে উপস্থিত হন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল কীনা সে সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। গ্রিক ঐতিহাসিক স্ট্রাবো চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও সেলুকাসের মধ্যে এক সন্ধির কথা উল্লেখ করেছেন যা থেকে মনে করা হয় যে, সেলুকাস এই যুদ্ধে পরাজিত হন। সন্ধির শর্ত অনুসারে তিনি কাবুল, কান্দাহার, হিরাট এবং বেলুচিন্তানের মাকরান প্রদেশ দিতে বাধ্য হন। প্লুটার্ক ও স্ট্রাবো-র মতে চন্দ্রগুপ্ত সেলুকাসকে ৫০০ হাতি উপহার দেন। কথিত আছে যে, এই সন্ধিকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে সেলুকাস তার কন্যা হেলেনের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের বিবাহ দেন এবং চন্দ্রগুপ্তের রাজসভায় মেগাস্থিনিস নামে একজন গ্রীক দূতকে পাঠান। তিনি ৩০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত পাটলিপুত্রে ছিলেন। মেগাস্থিনিসের বিবরণ ভারত ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। যাই হােক, এই সন্ধির ফলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজ্যসীমা হিন্দুকুশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

অন্যান্য রাজ্যজয় : শক রাজা রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি পশ্চিম ভারতে সৌরাষ্ট্র (গুজরাট) জয় করেন। সৌরাষ্ট্র তার শাসনকর্তা পুষ্যগুপ্ত জলসেচের জন্য সুদর্শন হ্রদ খনন করেন। অবন্তী (মালব) এবং কোঙ্কনের (মহারাষ্ট্র) কিছু অংশ তিনি জয় করেন। ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে দাক্ষিণাত্যে দাক্ষিণাত্যে মহীশূরের চিতলদ্রুগ জেলা ও তামিলনাড়ুর তিনেভেলি জেলা পর্যন্ত তার আধিপত্য বিস্তৃত ছিল। পূর্ব ভারতে বাংলা বা বঙ্গদেশ তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। মহাস্থানগড় লিপি থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

সাম্রাজ্যর সীমানা : চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন। তার সাম্রাজ্য উত্তর পূর্বে পারস্য, পশ্চিমে আরব সাগর, পূর্বে বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণে মহীশূর ও মাদ্রাজ পর্যন্ত বিস্তৃত। হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী তাকে "ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক বহৎ সাম্রাজ্যের স্থাপয়িতা" বলে অভিহিত করেছেন।

কৃতিত্ব : মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এক অনন্য কীর্তির অধিকার ছিলেন। একজন ভাগ্যান্বেষী হিসেবে জীবন শুরু করে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি এক বৃহৎ ও সার্বভৌম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন এবং ভারত ইতিহাসের একজন উল্লেখযােগ্য নরপতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। (১) ভারত ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণ তার আবির্ভাব। স্বৈরাচারী নন্দ বংশের উচ্ছেদ করে মগধে তিনি মৌর্যবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ভারত থেকে বিদেশি গ্রিকদের উচ্ছেদ সাধন তার অন্যতম কৃতিত্ব। গ্রিকদের পরাজিত করে তিনি ভারতের রাজনৈতিক সীমানা পারস্যের সীমা পর্যন্ত প্রসারিত করেন। এ সত্বেও গ্রিকদের সঙ্গে তার প্রীতির সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং এই সম্প্রতি তিন প্রজন্ম স্থায়ী ছিল। (২) ভারতীয় রাজন্যবর্গ যুগ যুগ ধরে সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখতেন, তিনি বহুলাংশে তা বাস্তবায়িত করেন। হিমালয় থেকে মহীশূর পর্যন্ত ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তিনি এক সুবিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ভারতের রাজনৈতিক ঐক্যের পথ প্রশস্ত করেন। (৩) বিজিত স্থানের উপর তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মেগাস্থিনিস তার শাসনপ্রণালীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কৌটিল্য বলেন যে, 'প্রজার সুখেই রাজার সুখ, প্রজার মঙ্গলে রাজার মঙ্গল'। মনে হয়, এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য দেশে এক কেন্দ্রীভূত ও জনকল্যাণকামী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

মৃত্যু : জৈন আচার্য্য ভদ্রবাহুর নিকট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন ও পরবর্তীকালে ৪২ বছর বয়সে সিংহাসন ত্যাগ করে জৈন ধর্ম গ্রহণ করে তাঁর সাথে দাক্ষিণাত্য যাত্রা করেন। জৈন প্রবাদানুসারে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মহীশূরের শ্রবণবেলগোলায় জৈন আচার অনুযায়ী স্বেচ্ছা-উপবাস করে দেহত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্রঃ
1. জীবন মুখোপাধ্যায় - ভারতের ইতিহাস
2. অঞ্জন গোস্বামী - ভারত অনুসন্ধান
3. অতুলচন্দ্র রায় - ভারতের ইতিহাস
4. প্রভাতাংশু মাইতি - ভারত ইতিহাস পরিক্রমা
5. N.K.Sastri - The age of the Nanda's and the Mauryas, P. 144.
6. H.C. Roychowdhury - Political History of Ancient India, P. 234-235.
7. V.Smith - Early History of India, 1957,p.126, 156.