ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাসের যুগ বিভাজন

- July 21, 2019
মানব সভ্যতার ইতিহাসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় - প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ ও আধুনিক যুগ। প্রাচীন যুগকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায় - প্রাগৈতিহাসিক যুগ, প্রায় ঐতিহাসিক যুগ ও ঐতিহাসিক যুগ।
Stone Age of India
প্রাগৈতিহাসিক যুগ: জন্মের পাঁচ লক্ষ বছর আগেই ভারতে মানুষের বসবাস শুরু হয় এবং সভ্যতার উন্মেষ হতে থাকে। এ যুগের কোনও লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। মানুষের ব্যবহৃত হাতিয়ার, যন্ত্রপাতি ও দ্রব্যাদির উপর ভিত্তি করে এসমরে ইতিহাস লেখা হয়। তাই এই যুগকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ (Pre Historic Age) বলা হয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ 'প্রাক্ লিপি সংস্কৃতিসমূহের পরিচায়ক। এ সময় মানুষ লিপি বা অক্ষরের ব্যবহার জানত না। এ যুগের সংস্কৃতি বলতে বােঝায় মানুষের হাতিয়ার, বাসস্থান, মৃৎশিল্প প্রভৃতি উপকরণ। তাই প্রাগৈতিহাসিক যুগ হল মানব সভ্যতার সেই অধ্যায়, যে সময়ের কোনও লিখিত বিবরণ নেই এবং কেবলমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের উপর ভিত্তি করেই যে যুগের ইতিহাস রচিত হয়।

প্রায় ঐতিহাসিক যুগ : প্রায় ঐতিহাসিক (Proto Historic) যুগ বলতে সেই সময়কে বােঝায়, যখন লিপির ব্যবহার শুরু হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে হরপ্পা সংস্কৃতির কথা বলা যায়, যদিও সে লিপির পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয় নি। অনেকে আবার সংস্কৃতির পর্যায়ভেদে লিপিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে চান না। বৈদিক যুগের বিপুল ও অনুপম সাহিত্য স্রষ্টাদের নিশ্চয় প্রাগৈতিহাসিক মানুষ বলা যাবে না, কিন্তু তাদের লিপিজ্ঞান ছিল না এবং সে যুগে বর্ণমালাও আবিষ্কৃত হয় নি। এই কারণে অনেকে ভারতের ক্ষেত্রে প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলতে কেবলমাত্র প্রস্তর যুগকেই বােঝেন। অনেকে আবার ভারতে ধাতুর ব্যবহারের সুত্রপাত থেকে লৌহ যুগের সূচনা পর্যন্ত কালপর্বটিকে প্রায় ঐতিহাসিক যুগ হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষপাতী।

ঐতিহাসিক যুগ : ডঃ ভিনসেন্ট স্মিথ এর মতে উত্তর ভারতের কালানুক্রম সম্বলিত ইতিহাস (Chronological history) পাওয়া যায় ৬৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে দাক্ষিণাত্যের ক্ষেত্রে আরও পরে। তার মতে সকল দিক থেকে ভারতে ঐতিহাসিক যুগের সূচনার সন্দেহাতীত তারিখ হল ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ – আলেকজাণ্ডারের আক্রমণের বৎসর। ভারতীয় ঐতিহাসিকরা অবশ্য মনে করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে ভারতে লিপির প্রচলন হয় এবং এ সময় থেকেই ভারতে ঐতিহাসিক যুগের সূচনা।

প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিভাজন : প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ পাথরের হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত। তাই এই যুগ প্রস্তর যুগ (Stone Age) নামে পরিচিত। পাথরের হাতিয়ার ও তার আকৃতি দেখে পণ্ডিতরা প্রস্তর যুগকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন — প্রাচীন প্রস্তর যুগ, মধ্য প্রস্তর যুগ এবং নব্য প্রস্তর যুগ।

প্রাচীন প্রস্তর যুগ : প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ পাথরের যে সব হাতিয়ার ব্যবহার করত তার আয়তন ছিল বিরাট এবং তাতে কোনও সৌন্দর্য ও মসৃণতা ছিল না। তারা একই হাতিয়ার দিয়ে মাংস কাটা, কাঠ কাটা ও শিকারের কাজ করত। এগুলিকে "হাত কুঠার" বলা হয়। ভারতে দুটি অঞ্চলে প্রাচীন প্রস্তর যুগের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেছে। একটি হল পাঞ্জাবের সােয়ান নদীর অববাহিকা, এবং অপরটি হল দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ। ফলে এই দুটি সংস্কৃতির একটিকে বলা হয় সােয়ান সংস্কৃতি (Soan Culture) এবং অপরটিকে বলা হয় মাদ্রাজ সংস্কৃতি (Madras Culture)। দুটি সংস্কৃতির সময়কাল ও বৈশিষ্ট্য একই এবং তাদের উৎপত্তিস্থল হল নদী উপকুল। এই যুগে মানুষ কৃষিকার্য বা আগুন জ্বালাতে জানত না তাদের কোনও স্থায়ী বাসস্থানও ছিল না। ছোটো ছােটো দলে বিভক্ত হয়ে তারা যাযাবর জীবনযাপন করত। বনের ফল, লতা গুল্মো ও পশুর মাংস খেয়ে তারা জীবনধারণকরত। এই যুগে মানুষ ছিল খাদ্য সংগ্রাহক, খাদ্য উৎপাদক নয়। আনুমানিক ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে প্রাচীন প্রস্তর যুগ শেষ হয়।

মধ্য প্রস্তর যুগ : মােটামুটি ৮০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ভারতে মধ্য প্রস্তর যুগ স্থায়ী হয়। মানুষের ব্যবহৃত পাথরের ক্ষুদ্র আকৃতিই এই যুগের বৈশিষ্ট্য। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক প্রভৃতি অঞ্চলে এইযুগেৱ হাতিয়ার পাওয়া গেছে। এই যুগের শেষ দিকে জীবজন্তুকে পােষ মানানাে এবং মৃৎশিল্প ও কৃষিকার্যের সূচনা হয়। মৃৎশিল্প ছিল হস্তনির্মিত কুমােরের চাক তখনও আবিষ্কৃত হয়নি।

নব্য প্রস্তর যুগ : ভারতের প্রায় সর্বত্রই কম বেশি নব্য প্রস্তর যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নব্য প্রস্তর যুগের সূচনা বিভিন্ন সময়ে। মােটামুটিভাবে বলা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দ থেকে ভারতে নব্য প্রস্তর যুগের সূচনা হয়। নব্য প্রস্তর যুগের হাতিয়ারগুলি ছিল অনেক বেশি মসৃণ, ধারালাে ও বাবহারের উপযােগী। নব্য প্রস্তর যুগে কৃষি ও পশুপালন অনেক বেশি অগ্রসর হয়, মানুষ স্থায়ী বসতি গড়ে তুলতে শুরু করে, কুমােরের চাক আবিষ্কৃত হয়, মানুষ আগুন জ্বালতে শেখে এবং বস্ত্রবয়ন শুরু করে। নব্য প্রস্তর যুগের মানুষ ধান, গম ও বার্লি চাষ করত। নব্য প্রস্তর যুগে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটে।

Advertisement
তাম্র প্রস্তর যুগ : নব্য প্রস্তর যুগের পর মানুষ তামার ব্যবহার শুরু করে। কালক্রমে তামার সঙ্গে টিন ধাতু মিশিয়ে তৈরি হয় ব্রোঞ্জ নামে এক ধাতু সংকর। ভারতে নব্য প্রস্তর যুগ ও ধাতুর যুগের মধ্যে কোনও সীমারেখা টানা সম্ভব নয়, কারণ তামা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পাথরের ব্যবহারও করতে থাকে। তাই এই যুগকে তাম্র প্রস্তর যুগ (Chalcolithic Age) বলা হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদরা ৩২৫০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ থেকে ২৭৫০খ্রিঃ পূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে তাম্র প্রস্তর যুগ বলে অভিহিত করেছেন। সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতা হল তাম্র প্রস্তর যুগের সভ্যতা। বালুচিস্তানের ঝোব, কোয়েটা, সিন্ধুর কোটদিজী, পাঞ্জাবের কালীবঙ্গাল প্রভৃতি অঞ্চলে তাম্র প্রস্তর যুগের সভ্যতার নিদর্শন ঘটে। ভারতের উত্তরে সিন্ধু উপত্যকা থেকে দক্ষিণে তুঙ্গভদ্রা নদী এবং পূর্বে মেদিনীপুর থেকে পশ্চিমে গুজরাট পর্যন্ত ভারতে এই যুগের বিস্তার ঘটেছিল।

লৌহযুগ : ভারতে লৌহ যুগ শুরু হয়েছে ১০০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। এটি বিস্তৃতিলাভ করে উচ্চগাঙ্গেয় উপত্যকা, মালব মালভূমি এবং তাপ্তি উপত্যকায়, বালুচিস্থান সমভূমি, মধ্য ও নিম্নগাঙ্গেয় উপত্যকা এবং উত্তর পশ্চিম অঞ্চল বিশেষত পেশােয়ার অঞ্চলে। ভারতবর্ষে প্রথম লােহার খোঁজ পাওয়া যায় উচ্চ গাঙ্গেয় উপত্যকায়। ৪০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে এই সংস্কৃতি পরিচিত ছিল পেন্টেড গ্রেওয়ার (Painted Grey Ware) নামে । কিন্তু তখন লােহার ব্যবহার ছিল সামান্য। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ব্যাপকহারে লােহার ব্যবহার চালু হয়। এর সাথে যুক্ত ছিল নর্দান ব্ল্যাক পােলিশ ওয়্যার (Northern Black Polished Ware) সংস্কৃতি। মালৰ অঞ্চলে এবং তাপ্তি উপত্যকায় নাগদা, ইরান, প্রকাশ ইত্যাদি অঞ্চলে লােহার ব্যবহার প্রাথমিক তাম্র প্রস্তর যুগের ব্যাপক পরিবর্তন আনে। অহিসত্র (Ahichhatra), বারাণসী , কোশাম্বী, শ্রাবন্ত্রী এবং উজ্জয়িনী এই কয়েকটি স্থানে লৌহযুগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। মনে রাখা দরকার যে, ভারতের সর্বত্র তামা ও ব্রোঞ্জ যুগ বা লৌহ যুগের সূচনা একই সময়ে হয় নি। দক্ষিণ ভারতে তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। মধ্য প্রস্তর যুগের পরেই সেখানে সরাসরি লৌহ যুগের সূচনা হয়।

কয়েক হাজার বৎসর ব্যাপী প্রস্তর যুগকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগ। আবার ধাতুর যুগের সূচনা থেকে লৌহ যুগের সূচনা পর্যন্ত সময়কে প্রায় ঐতিহাসিক যুগ বলা হয়। ডঃ বাসাম এর মতে "বেদ, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদের যুগ ভারত ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক যুগের মধ্যবর্তী যুগ।"
Advertisement