আর্য জাতির আদি নিবাস

- July 14, 2019
আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল, সে সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নন। একদল ঐতিহাসিক মনে করেন যে, ভারতবর্ষই হল আর্যদের আদি বাসস্থান। অপর দলের মতে, ইউরোপ তাদের আদি বাসস্থান। অনেকে আবার এ সম্পর্কে মধ্য এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা, স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও উত্তর মেরুর কথা বলে থাকেন।
আর্যদের আদি বাসভূমি
ভারত আর্যদের আদি বাসভূমি : পারজিটার, মহামহােপাধ্যায় গঙ্গানাথ ঝা, পণ্ডিত লক্ষ্মীধর শাস্ত্রী, পুসলকার, ড: ত্রিবেদী, কাল্লা প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ নানা যুক্তিতর্কের দ্বারা প্রমাণ কার চেষ্টা করেছেন যে, ভারতবর্ষহ হল আর্যদের আদি বাসস্থান। পারজিটার পুরাণের উপর ভিত্তি করে বলেন যে, ভারতই হল আর্যদের আদি বাসস্থান এবং ভারত থেকেই তারা অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়েন। তিনি বলেন যে, উত্তর-পশ্চিম থেকে ভারতে আর্য আক্রমণের বা পশ্চিম থেকে পূর্বে আর্যদের অগ্রগতির কোনও উল্লেখ ভারতীয় ঐতিহ্যে নেই–বরং ভারতীয় পুরাণগুলিতে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে আর্যদের বহির্গমন উল্লেখ পাওয়া যায়। মহামহোপাধ্যায় গাঙ্গানাথ ঝা বলেন যে, গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমস্থল পথ বিস্তৃত ব্রহ্মর্ষিদেশ হল আর্যদের আদি বাসস্থান। ড: ত্রিবেদী-এর মতে, এই স্থান হল মুলতান। কাল্লা এ সম্পর্কে কাশ্মীর ও হিমালয় সংলগ্ন স্থানের কথা বলছেন। পণ্ডিত লক্ষ্মীধর শাস্ত্রী হিমালয়ের পাদভূমি অঞ্চলকে আর্যদের আদি বাসভূমি বলে চিহ্নিত করেছেন।

ভারত আর্যদের আদি বাসভূমি যুক্তি : আর্যদের ভারতীয় উৎপত্তির অনুকুলে বেশ কিছুি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।
(১) ডঃ পুসলকার বলেন যে, এমন কোনও প্রমাণ নেই যা থেকে বলা যায় যে, আর্যরা বহিরাগত-বরং বেদ থেকে স্পষ্টই বােঝা যায় যে, সপ্তসিন্ধু অঞ্চলকেই তারা তাদের বাসস্থান বলে মনে করত। সাধারণত দেশত্যাগী ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ছেড়ে আসা দেশের স্মৃতিচারণ করে থাকে। বৈদিক সাহিত্যে এ ধরনের কোনও স্মৃতিচারণ নেই।
(২) ভাষাতন্ত্রের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে, মূল ইন্দো-ইউরােপীয় বা আর্য ভাষার সর্বাধিক শব্দ সংস্কৃতে প্রবেশ করেছে—অন্য কোনও আর্য ভাষায় নয়। সুতরাং মূল ভাষার সঙ্গে সংস্কৃত শব্দের যােগাযোগ বেশি।
(৩) বেদের মতাে উন্নত সাহিত্য অন্যান্য স্থানের আর্যরা সৃষ্টি করতে পারে নি। বলা হয় যে, সমাজের উদ্বৃত্ত লােকগুলি ভারত ত্যাগ করে ইউরােপের দিকে চলে যায়, কিন্ত মেধাবী আর্যরা ভারতেই থাকে।
(৪) ঋগ্বেদে উল্লিখিত জীবজন্তু, গাছপালা ও ভৌগােলিক বিবরণের সঙ্গে পাঞ্জাব ও সন্নিহিত অঞ্চলের বেশ সাদৃশ্য আছে। এইসবযুক্তির উপর ভিত্তি করে তারা বলেন যে, ভারতই হল আর্যদের আদি বাসভূমি।

ভারত আর্যদের আদি নিবাস সমালোচনা : স্যার জন মার্শাল, ডঃ বি. কে. ঘােষ প্রমুখ ঐতিহাসিকরা আর্যদের ভারতীয় উৎপত্তির বিরুদ্ধে বেশ যুক্তির অবতারণা করেছেন।
(১) আর্যদের ভারতে আদি বসবাস সম্পর্কে কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই।
(২) ভারতই যদি তাদের আদি বাসস্থান হয়, তাহলে ভারতের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে না পড়ে কেন বাইরে চলে গেল?
(৩) বােঘাজকোই এবং তেল-এল-আমার্না নামে দুটি শিলালিপি যথাক্রমে এশিয়া মাইনর ও মিশরে আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথম শিলালিপিটি ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের । এই শিলালিপিতে হিটাইট রাজগণ বৈদিক দেবতা ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র প্রমুখ দেবতার নাম উল্লেখ করেছেন। তেল-এল-আমার্না লিপিতে মিশরের ফারাও-দের অধীনস্থ প্রাচীন সিরীয় রাজাদের নাম ছিল আর্যদের নামের মতোই। এই কারণে অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে, আর্যরা বিদেশ থেকে ভারতে আসে এবং ভারতে আসার পূর্বে তারা পশ্চিম এশিয়াতেই বসবাস করত।
(৪) উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশ এবং সমগ্র দাক্ষিণাত্যে অনার্য ভাষার অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে, আর্যরা বহিরাগত। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে আর্যদের বাসভূমি ভারতে ছিল না। আর্যরা যদি স্মরণাতীত অতীত থেকেই ভারতে বাস করে থাকে তবে এইসব অনার্য মানুষ ও ভাষা কোথা থেকে এলাে?
(৫) অন্যান্য আর্য ভাষা অপেক্ষা সংস্কৃতে তালব্য বর্ণ যথা-ন, ং, ৎ এবং মূর্ধন্য বর্ণ যথা-ঋ, ট, ঠ, ড, ণ, র, ষ প্রভৃতির আধিক্য আর্য ভাষার উপর দ্রাবিড় বা অস্ট্রিক প্রভাবের প্রমাণ দেয়।
(৬) এটি প্রমাণিত যে, আর্যরা হরপ্পা সভ্যতার স্রষ্টা নয় বা হরপ্পা সভ্যতার ভাষাও আর্য নয় বরং এটি প্রমাণিত যে, আর্য সভ্যতা অপেক্ষা হরপ্পা সভ্যতা প্রাচীন এবং আর্যরাই হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসকারী। এটিই প্রমাণ করে যে, আর্যরা বহিরাগত।

আর্যদের আদি বাসভূমি ইউরোপ : অনেকের মতে ইউরোপ হল আর্যদের আদি বাসস্থান।
(১) এইসব পণ্ডিতরা প্রথমেই ইন্দো-ইউরােপীয় ভাষাসমূহের ভৌগােলিক বণ্টনের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেন যে, এই ভাষাগােষ্ঠীর সাতটির মধ্যে পাঁচটিই ইউরােপে—কেবলমাত্র সংস্কৃত ও পারসিক ইউরােপের বাইরে। এ থেকে সঙ্গত কারণেই অনুমান করা চলে যে, আর্যদের আদি বাসভূমি ইউরােপের বাইরে ছিল না।
(২) ইন্দো-ইউরােপীয় ভাষাগুলির মধ্যে একমাত্র লিথুয়ানিয়ার ভাষাই প্রত্যক্ষভাবে আর্য ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্কৃত নয়।
(৩) বলা হয় যে, আদি আর্যরা যে জলবায়ু ও লতাগুল্মের সঙ্গে পরিচিত ছিল তা একমাত্র ইউরােপেই মেলে। তারা প্রাচ্যের জীবজন্তু উট, বাঘ, হাতি, গাধা প্রভৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিল না বরং তারা ওক, উইলাে, বিচ প্রভৃতি বৃক্ষাদি এবং কুকুর, শূকর, ঘােড়া প্রভৃতি জীবজন্তুর সঙ্গে পরিচিত ছিল।

বলা বাহুল্য, ভারতীয় পণ্ডিতরা এইসব যুক্তির বিরুদ্ধে সােচ্চার। ইউরােপই যদি আর্যদের আদি বাসস্থান হয়, তবে ইউরােপের সেই স্থানটি কোথায়? এ ব্যাপারে পণ্ডিতরা একমত নন। অধ্যাপক ম্যাকডােনেল এবং অধ্যাপক গাইলস এ প্রসঙ্গে অষ্টিয়া, হাঙ্গেরি ও চেকোশ্লোভাকিয়া নিয়ে গঠিত দক্ষিণ-পূর্ব ইউরােপের কথা বলেছেন। অধ্যাপক হার্ট ভিস্টুলা নদীর অববাহিকা অঞ্চল, ঐতিহাসিক কার্ল পেনকা ও রাইস স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং অনেকে উত্তর জার্মানি, লিথুয়ানিয়া, দক্ষিণ রাশিয়া ও কাস্পিয়ান সাগরীয় অঞ্চলের কথা বলেন।

আর্যদের আদি বাসভূমি উত্তর মেরু : সেরগিও জাবরােওস্কি উত্তর আফ্রিকা-কে আর্যদের আদি বাসভূমি বলে চিহ্নিত করেছেন। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের বিশিষ্ট নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক তার বিখ্যাত 'দি আরক্টিক হােম ইন দি বেদস' (The Arctic Home in the Vedas) গ্রন্থে নানা যুক্তির সাহায্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, উত্তর মেরু অঞ্চলই হল আর্যদের আদি বাসস্থান। এ ব্যাপারে তিনি বৈদিক সাহিত্য ও মেরু অঞ্চলের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি উল্লেখ করে বলেছেন যে, সেখানে ছয়মাস দিন ও ছয়মাস রাত্রি থাকে। বলাবাহুল্য, একমাত্র মেরু অঞ্চলেই তা সম্ভব। আধুনিক বৈজ্ঞানিকরা মেরু অঞ্চলের প্রবল শৈত্যপ্রবাহের কথা স্মরণ করে তিলকের বক্তব্যকে আজগুবি বলে অভিহিত করলেও ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন যে, এক সময় উত্তর মেরুর আবহাওয়া মনুষ্য বসতির উপযােগী ছিল।

আর্যদের আদি বাসস্থান মধ্য এশিয়া : ম্যাক্সমুলার বলেন মধ্য এশিয়া হল আর্যদের আদি বাসস্থান। পরে তাদের একটি দল কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণের গতিপথ ধরে এশিয়া মাইনরের মধ্য দিয়ে গ্রিস ও ইতালিতে উপস্থিত হয়। তাদের আরেকটি শাখা মধ্য এশিয়া থেকে পশ্চিমের পথ ধরে ভারতবর্ষে পৌছায়। এই মতবাদের সমর্থনে বলা হয় যে, ইরানি বা পারসিকদের ধর্মগ্রন্থ জেন্দা আবেস্তায় উল্লিখিত 'আরিয়ানাভেজা' নামক স্থানটি মধ্য এশিয়ায়। ইরানীয় ভাষায় রচিত জেন্দা আবেস্তার সঙ্গে ঋগবেদের প্রচুর মিল। দুটি গ্রন্থে কয়েকজন দেবতা ও সামাজিক শ্রেণির বর্ণনা একই রকম। এইসব তথ্যের ভিত্তিতে মধ্য এশিয়াকে আর্যদের আদি বাসস্থান বলা হয়।

ব্রান্ডেনস্টাইনের মত : এডওয়ার্ড মেয়ার পামীর উপত্যকার কথা বলেন এবং তাকে সমর্থন করেন ওল্ডেনবার্গ এবং অধ্যাপক কিথ। বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ ব্রান্ডেনস্টাইন প্রাচীন আর্য ভাষাতত্ত্ব ও শব্দার্থবিদ্যার উপর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, কোনও পর্বতমালার পাদদেশে শুষ্ক ও তৃণাবৃত (Steppe) অঞ্চলই হল আর্যদের আদি বাসস্থান। সেই অঞ্চলটি হল উরাল পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত কিরঘিজের তৃণভূমি। এই মতের সমর্থন পাওয়া যায় স্রডার, নেহরিং, গর্ডন চাইল্ড, হেরমান কুলকে প্রমুখের রচনায়। এ প্রসঙ্গে স্রডার দক্ষিণ রাশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চল, নেহরিং দক্ষিণ রাশিয়া ও ইউক্রেন এবং কুলকে ইউরেশীয় তৃণভূমির কথা বলেছেন। অধ্যাপক ব্যাসাম বলেন যে, খ্রিঃ পূঃ ২০০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে পােল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বৃহৎ শুষ্ক তৃণভূমি অঞ্চলে অর্ধ-যাযাবর বর্বররা বাস করত। পরে যে আর্যরা ভারত আক্রমণ করে, তারা ছিল এদেরই উত্তর পুরুষ।

উপসংহার : আর্যদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে পণ্ডিতরা আজও একমত নন। আজও এ সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় নি-তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক আপাতত কিরঘিজের তৃণভূমির পক্ষে মত দেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর মতে দক্ষিণ রাশিয়াই আর্যদের আদি বাসভূমি।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় - প্রাচীন ভারতের ইতিহাস
2. দিলীপকুমার চক্রবর্তী - ভারতবর্ষের প্রাগিতিহাস
3. Romila Thapar - History of India
4. Sen, Shailendra Nath - Ancient Indian History and Civilization
5. R.C. Majumdar - The Vedic Age
Advertisement