আর্যদের ভারতে বসতি স্থাপন

- July 14, 2019
দীর্ঘদিন নিজ বাসভূমিতে বসবাসের পর আর্যরা বহির্দেশে গমন করে। তাদের সমষ্টিগত ভাবে দেশত্যাগের কোনও সুম্পষ্ট কারণ জানা যায় না। তবে মনে হয় যে জনসংখ্যাবৃদ্ধি, খাদ্যাভাব, ভূমির অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জমির শুষ্কতা বৃদ্ধি এবং গৃহবিবাদ প্রভৃতি কারণেই তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়। উইল ডুরান্ট বলেন যে, তারা জাতীয় সম্মানের জন্য যুদ্ধ করত না, গবাদি পশু সংগ্রহের জন্যই যুদ্ধ করত। তাদের একটি অংশ অগ্রসর হয় পশ্চিম ইউরােপের দিকে এবং অপর অংশটি অগ্রসর হয় পূর্বদিকে। যে অংশটি পূর্বদিকে অগ্রসর হয়, তারা প্রথমে পারস্যে বসতি স্থাপন করে। তারপর পারস্য থেকে তাদের একটি অংশ চলে যায় ভারতে। আর্যদের এই অভিপ্রয়াণ বা দেশান্তরগমন চলে দীর্ঘদিন ধরে—কোনও এককালীন অভিপ্রয়াণ বা পূর্ব পরিকল্পনার মাধ্যমে নয়। দীর্ঘদিন ধরে ছােটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতাে তারা ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে এসে আঘাত হানে।
আর্যদের ভারতে বসতি বিস্তার
আদি আর্য বা ইন্দো-ইরানীয়রা (Indo-Iranians) কোন পথে ইরানে এবং ভারতীয় আর্য বা ইন্দো-এরিয়ানরা (Indo-Aryans) কোন পথে ভারতে প্রবেশ করল সে সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নন—তবে তারা এই পথের একটি রূপরেখা অঙ্কন করার চেষ্টা করেছেন। মােটামুটিভাবে বলা যায় যে, আর্যরা (১) দানিয়ুব নদীর তীর ধরে প্রথমে ওয়ালাসিয়া এবং পরে আরও দক্ষিণে দার্দানেলেস ও বসফরাস প্রণালীর দিকে অগ্রসর হয়। (২) এই প্রণালী অতিক্রম করে তারা এশিয়া মাইনরের মালভূমিতে উপস্থিত হয়। (৩) এরপর তারা ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস অতিক্রম করে পারস্যে উপনীত হয়। পারস্যে তারা বেশ কিছুদিন বাস করে এবং এখানে তারা দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। ইন্দো-ইরানীয়রা পারস্যে থেকে গেল, কিন্তু অপর শাখা ইন্দো-এরিয়ানরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করল। ঋগ্বেদ ও জেন্দা আবেস্তা-র ভাষা এবং দুই গ্রন্থে বর্ণিত ধর্মীয় রীতিনীতি থেকে মনে হয় যে আর্য ও ইরানীয়রা একই গােষ্ঠীভুক্ত ছিল।

সপ্তসিন্ধু : গিরিপথের মধ্য দিয়ে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে আর্যরা প্রথমে আফগানিস্তান এবং পরে পাঞ্জাবে বসতি বিস্তার করে। ঋগ্বেদের প্রথম অংশে উত্তর-পশ্চিম ভারতের কয়েকটি পাহাড় পর্বত, নদ নদী ও স্থানের উল্লেখ আছে। ঋগ্বেদে আফগানিস্থানের (১) কুভা (কাবুল), (২) সুবাস্ত (সােয়াং বা গন্ধার অঞ্চল), (৩) ক্রুম্ব (কুররম), (৪) গোমতি (গোমাল) এবং (৫) সপ্তসিন্ধু অথাৎ-শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী ৰা রাভি, চন্দ্রভাগা বা চেনাব, বিতস্তা বা ঝিলাম, সিন্ধু ও সরস্বতী প্রভৃতি নদীর উল্লেখ আছে। এই অঞ্চল সপ্তসিন্ধু অঞ্চল নামে পরিচিত। বর্তমানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও পাঞ্জাব নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল ঋগ্বেদে ব্রহ্মবর্ত বা ঈশ্বরের দেশ নামে পরিচিত ছিল। ঋগ্বেদে হিমবং বা হিমালয় এবং কাশ্মীরের অন্যতম শৃঙ্গ মুজবন্তর উল্লেখ পাওয়া যায়। ঋগ্বেদে নর্মদা নদী বা বিন্ধ্য পর্বতের কোনও উল্লেখ নেই। সেখানে গঙ্গা-র কথা একবার এবং যমুনা নদীর কথা মাত্র তিনবার উল্লিখিত হয়েছে। এ থেকে মনে হয় যে, এই নদীগুলি তাদের কাছে খুব পরিচিত ছিল না। পশুর মধ্যে ঋগ্বেদে বাঘেরও উল্লেখ নেই। এর দ্বারা এটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ব্যাগ্রসংকুল বঙ্গদেশের সঙ্গে তখনও আর্যদের পরিচয় হয় নি।

মধ্যদেশ : সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে আর্যদের বসতি বিস্তার একেবারে সহজ ছিল না। স্থানীয় দ্রাবিড়ভাষী অনার্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করে তারা এই অঞ্চলে বসতি বিস্তারে সক্ষম হয়। ঋগ্বেদে এই অনার্যদের দস্যু বলে অভিহিত করা হয়েছে। কালক্রমে তাদের লােকসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পশুপালনের জন্য উপযুক্ত তৃণভূমি ও কৃষিকার্যের জন্য উর্বর জমির অভাব ঘটে। এছাড়া, আর্যদের বিভিন্ন গােষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ দেয় দেয়। এই অবস্থায় তারা বিভিন্ম দিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। দক্ষিণ রাজপুতানার মরু অঞ্চল থাকায় তারা সমৃদ্ধশালী ও উর্বর পূর্ব ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। গঙ্গা-যমুনার অববাহিকা অঞ্চলে যে অরণ্য ছিল তা আগুনে পুড়িয়ে পরিষ্কার করে আর এই অঞ্চলে বসতি বিস্তার করে। এইভাবে ঋক-বৈদিক যুগের শেষ অধ্যায়ে সরযু নদী পর্যন্ত আর্য আধিপত্য বিস্কৃত হয়। এই অঞ্চলটিকে মধ্যদেশ বলা হত।

বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ : ভারতে প্রবেশকালে আর্যরা কয়েকটি গােষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এই গােষ্ঠীগুলির মধ্যে সৃঞ্জয়, অনু, পুরু, ভরত, যদু, ড্রূহু ও তুর্বস। গরু চুরি, জমি দখল ও নদীর জলের উপর কর্তৃত্ব নিয়ে সর্বদাই তাদের মধ্যে বিরােধ চলত এবং এ সময় তারা অনার্য দস্যুদের সাহায্য নিতেও কুণ্ঠিত হত না। এ সময় ভরত গােষ্ঠী খুব উল্লেখযােগ্য হয়ে ওঠে। ঋগ্বেদে দশ রাজার যুদ্ধের কথা উল্লেখ আছে। আর্যদের দশটি গােষ্ঠী ভৱত গােষ্ঠীর রাজা সুদাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধে জয়যুক্ত হয়ে রাজা সুদাস ভরত গােষ্ঠীর ভবিষ্যৎ গৌরবের ভিত্তি স্থাপন করেন। বলা হয় যে, ভরত গােষ্ঠীর নাম থেকেই আমাদের দেশের নাম হয় ভারতবর্ষ।

পূর্ব ভারত : ঋগ্বেদের পরবর্তীকালে আর্যরা গঙ্গা অতিক্রম করে আরও পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। আনুমানিক ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে পূর্ব ভারতে আর্য আধিপত্য বিস্তৃত হয়। বৈদিক যুগে এই অঞ্চলটি প্রাচী বলে পরিচিত ছিল। শতপথ ব্রাহ্মণে বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ, বারাণসী, বিহার প্রভৃতি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। পূর্ব ভারতে আর্য সম্প্রসারণ সহজসাধ্য হয় নি। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ এই অঞ্চলকে অনার্য দস্যুদের আবাসস্থল বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বৌধায়ন ধর্মসুত্র অনুসারে এই অঞ্চল বাসের অযােগ্য। মহাভারতের যুগেও পূর্ব ভারতকে আর্যদের বাসের অযােগ্য বলা হয়েছে।

পশ্চিম ভারত : মধ্যদেশ-এর পশ্চিমে অবস্থিত মালৰ, সৌরাষ্ট, গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলে আর্য সভ্যতার সম্প্রসারণ হলেও, এই অঞ্চলের মানুষের সম্পূর্ণ আর্যীকরণ সম্ভব হয় নি। বিভিন্ন বৈদিক সাহিত্যে এই অঞ্চলের মানুষকে মিশ্র জাতি বলে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীকালের বৈদিক সাহিত্যে পশ্চিম ভারতকে আর্যাবর্ত বা আর্যদের বাসস্থানের অংশ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দক্ষিণ ভারত : উত্তর ভারতে আর্যদের সম্প্রসারণ হয়েছিল মূলত বাহুবলের দ্বারা। অপরপক্ষে, দাক্ষিণাত্যে আর্য সভ্যতার সম্প্রসারণ হয় শান্তিপূর্ণ পথে এবং অনেক দেরিতে। দ্রাবিড় সভ্যতার পীঠস্থান দক্ষিণ ভারতে আর্য সংস্কৃতি বিস্তারে আর্য ঋষি ও মুনিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে ঋষি অগস্ত্যের কথা বলা যায়। যাই হােক, দক্ষিণ ভারতে আর্য সংস্কৃতির বিস্তার সহজ ছিল না। এখানে শবর, পুলিন্দ, অন্ধ্র প্রভৃতি অনার্য জাতির অস্তিত্ব আজও প্রবল। দাক্ষিণাত্যে আর্য সভ্যতা আজও সম্পূর্ণ বিস্তৃত হয় নি।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় - প্রাচীন ভারতের ইতিহাস
2. দিলীপকুমার চক্রবর্তী - ভারতবর্ষের প্রাগিতিহাস
3. Romila Thapar - History of India
4. Sen, Shailendra Nath - Ancient Indian History and Civilization
5. R.C. Majumdar - The Vedic Age
Advertisement