Advertise

বৈদিক যুগের রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল?

পণ্ডিতরা বৈদিক যুগকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন - ঋক বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগ। ঋগ্বেদের অভ্যন্তরে আর্য সভ্যতার যে যে যুগের কথা বলা হয়েছে তাকে ঋক-বৈদিক যুগ এবং পরবর্তী বেদসমূহ ও বৈদিক সাহিত্যে যে যুগের কথা বলা হয়েছে, পরবর্তী-বৈদিক যুগ বলা হয়। মােটামুটিভাবে ঋক-বৈদিক যুগের কালসীমা হল খ্রিঃ পূঃ ১৫০০ - ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এবং পরবর্তী বৈদিক যুগের কালসীমা হল খ্রিঃ পূঃ ১০০০ - ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
বৈদিক যুগের রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল
পরিবার, গৃহপতি, গ্রামণী, বিশ, বিশপতি : আর্য সমাজের মূল ভিত্তি ছিল পারিবারিক জীবন। গৃহপতি ছিলেন পরিবারের প্রধান। গহপতির নির্দেশই ছিল সর্বপ্রধান। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গ্রাম গঠিত হত। গ্রামের মােড়ল গ্রামীণ নামে পরিচিত ছিল। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত ছিল বিশ বা জন। বিশ বা জনের প্রধানকে বলা হত বিশপতি বা রাজা।

সভা ও সমিতি : বৈদিক যুগে রাজতন্ত্র ব্যতীত কোথাও কোথাও গণতন্ত্র প্রচলিত ছিল। তবে গণতন্ত্র অপেক্ষা রাজতন্ত্র অধিক প্রচলিত ছিল। সভা ও সমিতি নামে দুটি জনসাধারণের প্রতিষ্ঠান ছিল। রাজা ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নিয়ে গুরত্বপূর্ণ রাজকার্যসমূহ পরিচালনা করতেন। তবে সভা ও সমিতির গঠন সম্বন্ধে সঠিক কোনাে তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবত সমাজের প্রধান ও জ্ঞান বৃদ্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে সভা এবং সকল জনসাধারণের প্রতিনিধি নিয়ে সমিতি গঠিত হত।

রাজকর্মচারী : রাজাকে শাসনকার্যে সাহায্য করতেন পুরােহিত, সেনানী, ব্রজাপতি, গ্রামণী, গুপ্তচর, দূত প্রভৃতি কর্মচারীরা। সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় কার্যে পুরােহিতের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরােহিতের পরেই ছিল সেনানী বা প্রধান সেনাপতির স্থান। তার কাজ ছিল যুদ্ধ কালে রাজাকে সাহায্য করা। শান্তির সময় তাকে অসামরিক কাজকর্ম করতে হত। গ্রামণী ছিলেন গ্রামের শাসনকর্তা। ব্রজাপতি গোচারণভূমি দেখাশোনা করত। গুপ্তচর রাজাকে রাজ্যর নানা বিষয়ে অবহিত করতেন। দূত কূটনৈতিক কাজে রাজাকে সাহায্য করতেন। পরবর্তী বৈদিক যুগে নতুন পদের সৃষ্টি হয় সেগুলি হল সংগ্রহিত্রী (কোষাধ্যক্ষ), ভগদুখ (কর আদায়কারী), দূত (রাজকীয় ঘােষক), ক্ষত্রি (রাজসংসারের সরকার), অক্ষপ (জুয়াখেলার অধ্যক্ষ) ইত্যাদি। সীমান্ত অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীকে বলা হত স্থপতি। একশােটি গ্রামের শাসন দেখাশােনার দায়িত্বে ছিলেন শতপতি। গ্রামণী ছিলেন গ্রামের প্রধান।

পুরোহিত : যাগযজ্ঞ ও ধর্মীয় কার্যে পুরোহিত ছিল প্রধান। নানা কূটনৈতিক বিষয়ে রাজাকে পরামর্শ দিতেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে পার্থনা করতেন। বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্র বৈদিক যুগের প্রভাবশালী পুরোহিত ছিলেন।

সম্রাট, একরাট, রাজচক্রবর্তী : বৈদিকযুগের গােড়ার দিকে রাজনৈতিক অনৈকর ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। এযুগে কুরু, পাঞ্চল প্রভৃতি নতুন গােষ্ঠী উল্লেখযােগ্য হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত হয় কাশী, কোশদ, বিদ্রোহ প্রভৃতি নতুন রাজ্য। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রাজা প্রতিবেশী দুর্বল রাজাকে পরাজিত করে সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করতেন। এরূপ সাম্রাজ্য বিস্তারের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। সম্রাট, বিরাট, স্বরাট, একরাট, রাজচক্রবর্তী, ভােজ, সার্বভৌম, বিশ্বজনীন প্রভৃতি উপাধি এই প্রচেষ্টার পরিচায়ক। রাজসূয়, বাজপে, অশ্বমেধ প্রভৃতি যজ্ঞানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রাজাগণ নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠ চেষ্টা করতেন। একচ্ছত্র সাম্রাজ্য স্থাপনের দ্বারা রাজশক্তি বৃদ্ধি পেলেও, প্রাচীন ভারতে যথেচ্ছাচার বা স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিশেষ কোনাে সুযােগ ছিল না। প্রত্যেক রাজা অভিষেকের সময় প্রজা পালনের শপথ গ্রহণ করতেন।

রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি : একসময় রাজার ক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রাজা নিজেকে দেবতার প্রতিভূ বলেও ঘােষণা করেন। শতপথ ব্রাহ্মণ এ বলা হয়েছে যে, রাজ হলেন প্রজাপতি বা ব্রম্মার সাক্ষাৎ প্রতিনিধি। রাজাকে বলা হত ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, বায়ু, অর্ঘ প্রভৃতি দেবতার শক্তিতে বলশালী। শুধুমাত্র ব্রাক্ষ্মণ ছাড়া রাজার সার্বভৌমত্ব সকলের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শতপথ ব্রাত্মণ এ বলা হয়েছে, রাজা হলেন অভ্রান্ত ও সকল শক্তির উর্ধ্বে। তিনি ইচ্ছামত মানুষের উপর অত্যাচার করতে পারতেন।

রাজস্ব ব্যবস্থা : ঋক বৈদিক যুগে রাজার আয়ের উৎস ছিল বলি। বলি হল দান, প্রণামি বা উপহার। পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজস্ব আদায় করতেন সংগ্রহিত্রী ও ভাগদুখ নামে দু-ধরনের রাজ কর্মচারী। বলি ও শুল্ক নামে দু-ধরনের রাজস্ব প্রজারা দিতে বাধ্য হত। তবে ব্রাহ্মণ ও রাজপরিবারের সদস্যরা কোনাে রাজস্ব প্রদান করতেন না।

বিচার ব্যবস্থা : বিচারব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ স্থানে। বিচারকার্য পরিচালনায় দায়িত্বে ছিলেন অধ্যক্ষ। অপরাধীকে ধরে আনার জন্য পুলিশ ছিল তাদের উগ্র বলা হত। পারস্পরিক বিবাদে করতেন তাকে বলা হয় মধ্যমাসি। রক্তপাত জনিত অপরাধের শাস্তি ছিল শতদায় বা একশটি গরু। অনেক সময় মুষ্টিমেয় সভাসদদের নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র সমিতি মাধ্যমেও বিচারকার্য সম্পন্ন হত। গ্রামের ছােটোখাটো বিচারালয়ের দায়িত্বে ছিলেন গ্রাম্যবাদিন নামে গ্রাম্য বিচারক। তিনি অবশ্য গ্রামসভার প্রধান থাকতেন। বিচারের শাস্তি স্বরূপ অনেক সময় অপরাধীকে জল ও আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হত বলেও জানা যায়। সাধারণত দেওয়ানির মামলা মেটানাে হত গ্রাম্য সালিসির মাধ্যমে।