PayPal

বৈদিক যুগের অর্থনীতি

author photo
- Wednesday, July 17, 2019

আর্য সভ্যতার অর্থনীতি জীবন

ঋক বৈদিক যুগের প্রথমদিকে আর্যরা ছিল যাযাবর ও পশুপালক। তাদের সমাজ ছিল পশুপালক সমাজ। ঋকবেদের যুগে তারা সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের (উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাব এবং নিম্ন সিন্ধু অঞ্চল) মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই যুগের শেষদিকে আর্যরা স্থায়ী বসতি নির্মাণ ও কৃষিকার্য শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পশুপালন অর্থনীতি ধীরে ধীরে কৃষি অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। কৃষি অর্থনীতির সূচনা হলেও, এই যুগে পশুপালন অর্থনীতিই ছিল প্রধান।
বৈদিক যুগের অর্থনৈতিক জীবন
কৃষি : আর্যরা দ্রাবিড়দের ন্যায় নাগরিক জীবনের পক্ষপাতী ছিলেন না। বৈদিক যুগে আর্যরা গ্রাম্য জীবনকে শ্রেয় মনে করতেন। আর্যদের সমাজ জীবনে কৃষি ছিল প্রধান। এই জীবিকাকে অবলম্বন করে আর্যদের জীবনযাত্রা চলত। আফগানিস্তান হতে উত্তরপ্রদেশের সরযু নদী পর্যন্ত আর্য বসতি এ যুগে বিস্তৃত ছিল। পাঞ্জাব ও দিল্লি অঞ্চলে প্রচুর গম ও যব চাষ হত। বৈদিক যুগে ধান চাষকে প্রাধান্য দেওয়া হত না। কিন্তু কোনাে কোনাে পন্ডিত বলেন বৈদিক যুগে ধানের চাষ হত। কেউ কেউ বলেন, ভারতে আসার পূর্বে আর্যরা ধান চাষ জানত না। তারা ধান চাষের পদ্ধতি শিখেছিল স্থানীয় উপজাতিদের কাছ থেকে। “যব” শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যব বলতে ধানকেও বােঝাত।

লাঙল ও জলসেচ ব্যবস্থা : কোনাে কোনাে পণ্ডিতের মতে চাষের জন্য লােহার ফলাযুক্ত লাঙল দ্বারা জমিকে গভীরভাবে চাষ করা হত। লাঙল টানা হত বলদের সাহায্যে। লাঙলের নাম ছিল শীর। কৃষিকাজের উপযােগী জলসেচের ব্যবস্থারও কিছু কিছু উল্লেখ পাওয়া যায়। এজন্য জলচক্র ও জলাশয় বাবহার করা হত। ঋকবেদে উল্লিখিত 'কুল্যা' এবং 'খনিত্রিমা আপ' শব্দদুটি প্রচ্ছন্নভাবে জলসেচের ইঙ্গিত বহন করে। 'কুল্যা’ কথার অর্থ হল কৃত্রিম জলপ্রণালী।

লােহার ব্যবহার : কেউ কেউ বলেন যে ঋকবেদের যুগে আর্যরা লােহার ব্যবহার জানত না। তারা লৌহপিণ্ড গলাবার পদ্ধতি জানত না। কিন্তু কোনাে কোনাে পণ্ডিত বলেন, আর্যরা লােহার লাঙল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করত। জৈমিনি উপনিষদ ব্রাহ্মণ (আনুমানিক রচনাকাল ৬০০ খ্রিঃ পূঃ)-এ কৃষ্ণ-অয়স ও শ্যাম-অয়স বা লােহার স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। ডঃ রামশরণ শৰ্মা মনে করেন যে, লােহার ব্যাপক ব্যবহার জানা না থাকলে গাঙ্গেয় উপত্যকার ঘন জঙ্গল পরিষ্কার করা বা আঠালাে পলিমাটিতে লাঙল চালানাে সম্ভব হত না। এই যুগের খুব বেশি লােহার ফাল পাওয়া যায় নি। এর কারণ হিসেবে ডঃ রামশরণ শর্মা এই অঞ্চলের আর্দ্র জলবায়ুর কথা বলেছেন, যা লােহার জিনিষপত্রকে নষ্ট করে দেয়। কৃষক বা হলকর্ষককে বলা হত কীনাশ।

পশুপালন : আর্যদের মধ্যে কৃষির সঙ্গে গাে-পালন অপরিহার্য ছিল। অনেকে পশুপালন করেও জীবিকা অর্জন করত। গরুকে বলা হত গােধন। এই গােসম্পদ বৃদ্ধির জন্য ঋগবেদে প্রার্থনা আছে। দক্ষিণা হিসাবে পুরােহিতকে গােরু ও ক্রীতদাসী দান করা হত। ঋগবেদে গােরুকে বলা হয়েছে ‘অগ্ন'। অর্থাৎ যাকে হত্যা করা যায় না। গরু যাতে হারিয়ে না যায় এজন্য গরুগুলির কানে নানারকম সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া থাকত। এ যুগে আর্য গােষ্ঠীগুলি পরস্পরের গরু লুঠ করত। সােনা রুপার মতাে গরুকে মূল্যবান মনে করা হত। কার কত গরু আছে তার দ্বারা সেই ব্যক্তির আর্থিক অবস্থা বিচার হত। কোনাে দ্রব্যের মূল্য গরুর দামের দ্বারা স্থির করা হত। গঙ্গা যমুনার সমতলে গােচারণের প্রচুর সুবিধা ছিল। যুদ্ধের প্রয়ােজনে ঘােড়া ব্যবহার করা হত বলে সে যুগে ঘোড়ার মর্যাদাও ছিল প্রায় গোরুর সমান। পশমের জোগান ঠিকমতাে পাওয়ার জন্য এ যুগে ভেড়া পালনও যথেষ্ট হত।

ব্যাবসা ও বাণিজ্য : ব্যাবসা বাণিজ্য করেও আর্যদের অনেকে জীবিকা অর্জন করত। ঋগবেদের যুগে (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্ব) ‘পনি' নামে একশ্রেণির অনার্য লােকেরা এখানে ব্যাবসা বাণিজ্যে বেশ দক্ষ ছিল। আর্য বসতি বিস্তারের ফলে আর্যদের মধ্যে বৈশ্যরা বাণিজ্যে নিযুক্ত হয়। আর্যরা গ্রাম ও বসতিগুলির ভিতর বেশিরভাগ বাণিজ্য চালাত। সিন্ধুর শাখানদী ও যমুনার দুই তীরের গ্রামগুলির মধ্যে বাণিজ্য চলত। স্থলপথে রথ বা গােরুর গাড়ি ও নদীপথে নৌকায় মাল চলাচল করত। বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক যােগাযােগ ছিল না। তবে একথা সত্য যে তখনকার অর্থনীতি উন্নত ছিল না। কারণ বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের মূলভিত্তি মুদ্রা তখনও প্রচলিত হয়নি। অধ্যাপক ব্যাসাম এর মতে, এ যুগে নিয়মিত ব্যবসায়ী বা মহাজন সম্প্রদায় বলে কিছু ছিল না। তখন গরু ছিল বিনিময়ের মাধ্যম।

সামুদ্রিক বাণিজ্য : বৈদিক আর্যগণ সামুদ্রিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করত। তাছাড়া ঋগবেদে বহু দাঁড়যুক্ত নৌকার উল্লেখ আছে, সম্ভবত এই নৌকাগুলি ছিল সমুদ্রগামী। কিন্তু এই সামান্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে কোনাে সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। বৈদিক যুগে আর্যদের সামুদ্রিক বাণিজ্য করার একমাত্র প্রশস্ত পথ ছিল সিন্ধু নদের মােহনার পথ। তাছাড়া আর্য সভ্যতা ছিল কৃষিকেন্দ্রিক। আর্য সভ্যতা হরপ্পার মতাে শিল্পকেন্দ্রিক ছিল না। সুতরাং আর্যদের মধ্যে আন্তবাণিজ্য করাই স্বাভাবিক ছিল। তাদের হাতে উদ্বৃত্ত পণ্য না থাকায় বৈদেশিক বাণিজ করা সম্ভব ছিল না।

বৈদিক যুগের মুদ্রা : বৈদিক যুগে 'মনা' নামে একপ্রকার মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হত। সে সময়ে ব্যবিলনে "মানা" নামে একপ্রকার মুদ্রার প্রচলন ছিল। কোনাে কোনাে পণ্ডিতের মতে বৈদিক যুগের "মনা" ব্যবিলনের "মানা" এবং ল্যাটিন "মিনার" অনুকরণ বলা যেতে পারে। এরূপ সামঞ্জস্য হতে বহির্জগতের সঙ্গে বৈদিক আর্যদের যােগাযােগ ছিল বলে ধারণা করা হয়। "মনা" ভিন্ন "নিস্ক" নামে এক ধরনের স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ছিল। কিন্তু এই মুদ্রার ওজন ও আকৃতির সমতা ছিল না। রৌপ্যমুদ্রা না থাকায় মুদ্রার সংখ্যা কম ছিল। এজন্য মুদ্রার দ্বারা ক্রয় বিক্রয়ের অসুবিধা দেখা দেয়।

যোগাযোগ ব্যবস্থা : অনুমান করা হয় যে, বৈদিক যুগ থেকেই যােগাযােগ ব্যবস্থা চালু হয়। ঘোড়ায় টানা রথ, চারচাকা বিশিষ্ট বলদে টানা গাড়ি এবং নৌকা ব্যবহৃত হত। ঋগবেদে শত দাড়বিশিষ্ট নৌকা "শত অনিত্র"-র উল্লেখ আছে। এ থেকে অনুমান করা হয় যে, আর্যরা সমুদ্রযাত্রাও করত। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই মত পােষণ করেন না।

কর ও রাজস্ব ব্যবস্থা : ঋগবেদের যুগে (১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্ব) সাধারণ মানুষ দলপতিকে তার কাজের বিনিময়ে নিজেদের উৎপাদিত শস্য প্রদান করত। একে বলা হত "বলি"। "বলি" কোনও কর নয়, এটি উপহার হিসেবে প্রদান করতেন, কর বাধ্যতামূলক ছিল না। পরবর্তী বৈদিক যুগে (১০০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্ব) রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়। তাই এই যুগে "বলি" বাধ্যতামূলক করে পরিণত হয়। এইসময় "বলি" ও "শুল্ক" নামে দুধরনের কর দিতে হত। এই যুগে জিনিসপত্রের মাধ্যমে রাজস্ব দিতে হত। কারণ এই যুগে মুদ্রার প্রচলন হয়নি।