আর্য সভ্যতা

- July 17, 2019
প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় আর্যজাতি ও বৈদিক সভ্যতার প্রভাব অসীম। আর্য শব্দটি বহু অর্থে ব্যবহৃত হয়। সংস্কৃত অর্থ ধরলে আর্য শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় সৎবংশজাত ব্যক্তি। পণ্ডিত ম্যাক্সমুলার ও স্যার উইলিয়াম জােনস মনে করেন, আর্য একটি ভাষার নাম। আর্য শব্দটি জাতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। উইলিয়াম জোনস আর্য কথাটিকে ভাষাগত অর্থে ব্যবহার করেন। আর্য হল প্রাচীন অথবা ইন্দো ইউরোপীয় ভাষার নাম।
আর্য সভ্যতার ছবি
আর্যদের আদি বাসস্থান তত্ত্ব: ডা. এ. সি. দাস, পণ্ডিত গঙ্গানাথ ঝা, ড. ত্রিবেদী, ড.কাল্লা প্রমুখ মনে করেন, কাশ্মীর অথবা পাঞ্জাবের সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে আর্যদের আদি বাসস্থান। বৈদিক সাহিত্যে উল্লিখিত গাছপালা, পশুপাখি এই অঞলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যেত। সংস্কৃত ভাষার মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক আর্যভাষা গোষ্ঠীর শব্দসম্ভার বিদ্যমান। পাঞ্জাব ও তার সন্নিহিত স্থানে ঋগবেদের ভৌগােলিক বিবরণে মিল লক্ষ করা যায়। তাই ভারতকে আর্যদের আদি বাসস্থান ধরা হয়।

আবার অনেকে ইউরােপীয় লিথুয়ানিয়া ভাষার সঙ্গে প্রাচীন আর্যভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন। ইউরোপেই আর্যভাষা গােষ্ঠীর প্রাধান্য বেশি। অধ্যাপক হার্ট ভিস্টুলা নদীর অববাহিকা অঞ্চলকে আর্যদের আদি বাসস্থান বলেছেন। অধ্যাপক গাইলস বলকান উপদ্বীপ বা পূর্ব ইউরােপকে আর্যদের আদি বাসস্থান বলেছেন।

অধ্যাপক ব্রান্ডেনস্টাইন কোনাে বর্তমার পাদদেশের স্টেইপ তৃণবৃত অঞ্চলকে আর্যদের আদি বাসস্থান বলেছেন। সম্ভবত, এই অঞ্চলটিতে রাশিয়ার ইউরাল পর্বতের কিরঘিজ তৃণভূমি অঞ্চল ছিল আর্যদের বাস। এই অঞ্চল থেকে আর্যদের একটি শাখা পশ্চিমে আসে। পরে এই শাখা দুভাগে বিভক্ত হয়ে একটি ভাগ ইরানে অপরটি ভারতে প্রবেশ করে। এই অভিমত অধিকাংশ পণ্ডিত গ্রহণ করেছেন।

বৈদিক সাহিত্য: ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব — এই চারটি বেদ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ ও বেদাঙ্গ নিয়ে বিশাল বৈদিক সাহিত্য গড়ে উঠেছে। আনুমানিক 1400 খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে 1000 খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে ঋগবেদ রচিত হয় বলে মনে করা হয়। "বিদ" শব্দের অর্থ জ্ঞান। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যে, বেদ মানুষের রচনা নয় — স্বয়ং ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী শুনে শুনে মনে রাখা হত। তাই বেদের অপর নাম শ্রুতি। বেদ অপৌরষেয় নিত্য।

প্রাকৃতিক বর্ণনা ও প্রকৃতি দেবীর শ্রুতিগান ছিল ঋগবেদের বিষয়বস্তু। সামবেদের শ্লোক যাগযজ্ঞের সময় গীত হত। যজুবেদ যাগযজ্ঞের মন্ত্রাদি ও অথর্ববেদে সৃষ্টি রহস্য, চিকিৎসাবিদ্যা ও নানা বশীকরণ মন্ত্রাদি স্থান পেয়েছে। দেবদেবীর সৃতিগান ও যজ্ঞের মন্ত্রাদি নিয়ে সংহিতা রচিত। যাগযন্ত্রের বিধান সন্নিহিত আছে ব্রাহ্মণ ভাগে। অরণ্যে থাকাকালীন সময়ে প্রয়ােজনীয় ধর্মতত্ত্ব পালনের নির্দেশ আছে আরণ্যকে। আরণ্যকের দার্শনিক চিন্তার মত বিষয়বস্তু স্থান পেয়েছে উপনিষদে। শিক্ষা, ছন্দ, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ ও কল্প হল বেদাঙ্গ। সাংখ্যযোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, পূর্বমীমাংসা ও উত্তর মীমাংসা হল ষড়দর্শন।

রাজনৈতিক জীবন: আর্যরা নানা গোষ্ঠী, দলে ও উপদলে বিভক্ত ছিল। বৈদিক যুগের রাজনৈতিক জীবন ছিল প্রয়োজনভিত্তিক। ভরত, যদু, সঞ্জয়, অনু প্রভূতি গােষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ লেগে থাকত। আর্য সমাজের সর্বনিম্ন স্তর ছিল পরিবার। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হত গোষ্ঠী। কয়েকটি গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত হত উপজাতি। গ্রাম, বিশ, জন ইত্যাদি ছিল এই যুগের বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগ। গ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন গ্রামণী, বিশের বিশপতি ও জনের রাজন ছিলেন শাসনকর্তা। গ্রামণী, দূত, সেনানী, পুরোহিত, গুপ্তচর রাজাকে শাসনকার্য সাহায্য করতেন। বিবাদের মধ্যস্থতা করতেন মধ্যমাসি, অপরাধ দমন করতেন উগ্র, বিচারের দায়িত্বে থাকতেন গ্রাম্যবাদিন। রাজার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য সভা ও সমিতি নামে দুটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ছিল।

সামাজিক জীবন: আর্য সভ্যতার সমাজের ভিত্তি ছিল পরিবার। এই সময় পরিবারের প্রধানকে বলা হত কুলপ বা কুলপতি। পরিবার ছিল যৌথ। বৈদিক যুগে সমাজে নারীর মর্যাদা ছিল। গার্গী, মৈত্রেয়ী, ঘােষা, বিশ্ববারা, অপালা, লােপামুদ্রা প্রমুখ বিদুষী নারীর পরিচয় বৈদিক যুগে পাওয়া যায়। এই যুগে সমাজে সকলে সুতি ও পশমের পোশাক পরিধান করত। পুরুষের দেহের ঊর্ধ্বাঙ্গ ও নিম্নাঙ্গ দুটি বস্ত্র এবং নারীরা অন্তবাস ব্যবহার করত। নারীরা সােনা, রুপাে ও দামি পাথরের অলংকার এবং ফুলের মালা ব্যবহার করত। খাদ্য হিসাবে আর্যরা চাল, গম, যব, ফল, সবজি, মাছমাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য ব্যবহার কত।

আর্যসমাজে চতুবর্ণ প্রথা প্রচলিত ছিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি বর্ণের মধ্যে ব্রাহ্মণরা ছিল শ্রেষ্ঠ। শূদ্ররা তিন বর্ণের সেবা করত। সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের মধ্যে চতুরাশ্রম প্রথা প্রচলিত ছিল। আর্য সন্তান গুরুগৃহে শিক্ষণলাভের সময় ব্রহ্মচর্যাশ্রম পালন করতেন। যেীবনে সংসার পালনকে বলা হত গার্হস্থ্যশ্রম। প্রৌঢ় বয়সে সংসার ত্যাগ করে অরণ্যে ঈশ্বর চিন্তায় কালাতিপাত করার থেকে বলা হত বানপ্রস্থ। সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে ঈশ্বর চিন্তায় নিমগ্ন থাকাকে বলা হত সন্ন্যাস।

অর্থনৈতিক জীবন: ঋক বৈদিক যুগের সভ্যতা ছিল গ্রামীণ সভ্যতা। কৃষি ছিল বৈদিক যুগের অর্থনীতির মূলভিত্তি। ড. রায়চৌধুরী মনে করেন, বাস্তুজমি ও কৃষিজমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছিল। আর্যরা ধানচাষের কৌশল উপজাতিদের কাছে শিখেছিল। পরবর্তী বৈদিক যুগে লােহার লাঙল ব্যবহার প্রচলিত হয়। গৃহপালিত পশুর মধ্যে গােরুর গুরুত্ব ছিল বেশি। গাে সম্পদ লুণ্ঠন ও পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধ হত। গরুকে হত্যা করা যায় না বলে অঘৃ বলা হত। গাে সম্পদ হরণের যুদ্ধকে বলা হত গাভিষ্টি। যুদ্ধের সময় ঘােড়ার ব্যবহার প্রচলন ছিল। ঋকবৈদিক যুগে বিভিন্ন পেশার লোক ছিল। ধাতুশিল্পী, সূর্ণকার, কুমাের, শিল্পী, তাঁতি, কসাই প্রভৃতি পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈশ্যরা ব্যাবসা বাণিজ্য পরিচালনা করত। জলপথ ও স্থলপথে ব্যবসা বাণিজ্য চলত। "নিষ্ক" ও "মনা" দুটি মুদ্রার কথা জানা যায়। বিনিময়ের মাধ্যমেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাবসাবাণিজ্য চলত।

ধর্মীয় জীবন: আর্যরা বৃষ্টি, চন্দ্র, সূর্য, সমুদ্র ও পাহাড় পর্বতের পূজা করত। এই যুগে ইন্দ্র ছিলেন শ্রেষ্ঠ দেবতা। ইন্দ্রের পরে স্থান ছিল অগ্নিদেবের। পাপপুণ্যের ধারক ও জলের দেবতা ছিলেন বরুণ। বৃক্ষের দেবতা ছিলেন সােম। বজ্জ্রের দেবতা ছিলেন মরুৎ। বৃষ্টির দেবতা ছিলেন পজ্যন্য। এছাড়া অদিতি, উষা, সাবিত্রী, সরস্বতী ইত্যাদি দেবীর পূজা করা হত। যাগযজ্ঞ, প্রার্থনা, হােম, মন্ত্রতন্ত্র প্রাধান্য পেত। ধর্মচর্চার প্রধান অঙ্গ ছিল যাগযজ্ঞ। ধর্ম চর্চায় ব্যক্তিগত কামনা বাসনা প্রাধান্য পেত। ভারতীয় সংস্কৃতিতে আর্যসভ্যতার প্রাধান্য ছিল অপরিসীম। আর্য সভ্যতা লৌহযুগের গ্রামীণ সভ্যতা।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় - প্রাচীন ভারতের ইতিহাস
2. দিলীপকুমার চক্রবর্তী - ভারতবর্ষের প্রাগিতিহাস
3. জীবন মুখোপাধ্যায় - ভারতের ইতিহাস
4. Romila Thapar - History of India
5. Sen, Shailendra Nath - Ancient Indian History and Civilization
6. R.C. Majumdar - The Vedic Age