সৈয়দ বংশের ইতিহাস

author photo
- Sunday, May 19, 2019
advertise here

দিল্লীর সৈয়দ বংশের পরিচয়

তুঘলক বংশের শেষ সুলতান নাসিরউদ্দিন মামুদের মৃত্যুর পর দিল্লির আমির ও ওমরাহগন ১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দে জৈনিক আফগান দৌলত খাঁ লোদী নামে এক ব্যক্তিকে দিল্লীর সিংহাসনে বসান। সিংহাসনে তার কোন বৈধ অধিকার ছিল না। দিল্লির অভিজাতদের একাংশ খিজির খাঁকে দিল্লী আক্রমণের জন্য পরামর্শ দেন। ১৪১৪ সালে ৬ লই জুন তৈমুরের প্রতিনিধি ও মুলতানের শাসনকর্তা খিজির খাঁ দিল্লীর সালতানাত দখল করেন। এর ফলে দিল্লীতে তুর্কি শাসনের অবসান হয় এবং আফগান শাসন প্রতিষ্ঠা হয়।

খিজির খাঁ (১৪১৪-১৪২১ খ্রিস্টাব্দ):

"তারিখ ই মুবারকশাহী" গ্রন্থের মতে, খিজির খান সৈয়দ ছিলেন নবী হযরত মহম্মদের বংশধর। এই কারণে তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ সৈয়দ বংশ নামে পরিচিত। ড: নিজামী বলেন, খিজির খাঁ প্রকৃতই সৈয়দ ছিলেন কিনা তা প্রমাণ করা কঠিন। সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক খিজির খাঁকে মুলতানের জায়গীর প্রদান করে। পরে মল্লুইকবালের ভ্রাতা সারঙ্গ খাঁ মুলতান দখল করে নেয় এবং তিনি মেওয়াট পালিয়ে যান। তৈমুর লং ভারত আক্রমণ করলে খিজির খাঁ তৈমুরের পক্ষে যোগদান করে। পুরষ্কার স্বরূপ তৈমুর লং ভারত ত্যাগের পূর্বে খিজির খাঁকে মুলতান, লাহোর ও দিপালপুরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।


খিজির খাঁ তৈমুরের পুত্র শাহরুখ খানের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখেন। তিনি কখনো সুলতান উপাধি গ্রহণ করেননি। খিজির খান উপাধি গ্রহণ করে "রায়ত ই আলা" (প্রধান প্রজা)। নিজ নামে মুদ্রা চালু করেননি। তিনি মোট সাত বছর রাজত্ব করেন। তিনি তৈমুর লং এর আনুগত্য উচ্চাকাঙ্খী তুর্কি অভিজাতদের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে। তার রাজত্বকালে কোনপ্রকার শৃঙ্খলা ছিল না।

খিজির খাঁর রাজত্ব কেবলমাত্র দিল্লী, পাঞ্জাব ও দোয়াব অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি কাটিহার, এটাওয়া, খোর, কাম্পিল, পাতিয়ালি, গোয়ালিয়র, বায়না প্রভূতি অঞ্চলের বিরুদ্ধে অভিযান পাঠান ও বার্ষিক রাজস্বের প্রতিশ্রুতি পান। তার আমলে সিরহিন্দ ও বদাউনে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এটাওয়া অভিযানের সময় খিজির খাঁ অসুস্থ হয়ে পড়ে। সেখান থেকে দিল্লী আসার কয়েকদিনের মধ্য মারা যান (১৪২১ সালে ২০ মে)।

মুবারক শাহ (১৪২১-১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দ):

খিজির খাঁর মৃত্যুর পর তার পুত্র মুবারক শাহ দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তিনি সিংহাসনে বসে অভ্যন্তরীণ সমস্যা দূরীকরণে চেষ্ঠা করে ব্যর্থ হন। তিনি ভাষা, সাহিত্য ও সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি নিজের নামে মুদ্রা খোদাই করেন এবং খুৎবা পাঠ করে তৈমুর বংশের অধীনতা বর্জন করেন। তিনি অভিজাতদের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ব্যাবস্থা করে। তিনি ভাতিন্দা ও দোয়াব অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন করে সেখানে কর আদায়ে সক্ষম হয়। কিন্তু পাঞ্জাবের খোক্কর উপজাতিদের দমন করা সম্ভব হয়নি। তার রাজত্বের শেষ দিকে কাবুল থেকে মুঘল আক্রমণ ঘটে। শাহরুখ এর ভাতিজা মামুদ মির্জার পক্ষে কাবুলের সহকারী গভর্নর শেখ আলী দিল্লী আক্রমণ করে। এই আক্রমণ তিনি প্রতিহিত করেন। তার প্রধানমন্ত্রী সাওয়ার-উল-মুলুক ছিলেন ধর্মান্তরিত হিন্দু। ১৪৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ ফেব্রুয়ারি মাসে মুবারকাবাদ শহরে সিধপাল ও রনু নামক দুই ব্যক্তি মুবারক শাহকে হত্যা করে। ড: হামিদউদ্দিন সুলতান মুবারক শাহকে সৈয়দ বংশের শ্রেষ্ট শাসক বলে অভিহিত করেন।


তিনি শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৪৩৩ সালে যমুনা নদীর তীরে মুবারকাবাদ শহর নির্মাণ করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতা য় ইয়াহিয়া সিরহিন্দী "তারিখ ই মুবারকশাহী" নামক ফরাসী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেন।

মহম্মদ শাহ (১৪৩৪-১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দ):

দিল্লির সুলতান মুবারক শাহ ছিলেন নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর ভ্রাতুষ্পুত্র মহম্মদ-বিন-ফরিদ সুলতান মহম্মদ শাহ উপাধি নিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন অপদার্থ ও অযোগ্য ব্যক্তি। এর ফলে তার মন্ত্রী সাওয়ার-উল-মুলুক সকল ক্ষমতা করায়ত্ত করেন। মহম্মদ শাহ তাকে খান-ই-জাহান উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ছিলেন অত্যাচারী। ফলে আমির ওমরাহগণ তাকে পদচ্যুত করে নতুন প্রধানমন্ত্রী করেন কামাল-উল-মূলক নামে এক ব্যক্তিকে। মালবের শাসক মামুদ খলজি দিল্লী দখলের উদ্দেশ্যে এক অভিযান পাঠান। এই বিপদের দিনে পাঞ্জাবের শাসনকর্তা বাহলুল লোদী মামুদ খলজি-কে পরাজিত করেন। সুলতান মহম্মদ শাহ কৃতজ্ঞতাবশত বাহলুল লোদীকে খান-ই-খানন উপাধিতে ভূষিত করে। এবং দিপালপুর ও লাহোরের জায়গীর বাহলুল লোদীর হাতে অর্পণ করেন। ১৪৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মহম্মদ শাহর মৃত্যু হয়।

আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৪৫-১৪৫১ খ্রিস্টাব্দ):

মহম্মদ শাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র আলাউদ্দিন "আলম শাহ" উপাধি নিয়ে দিল্লির সালতানাতে বসেন। তিনি ছিলেন অযোগ্য শাসক। তার সঙ্গে উজির হামিদ খানের বিবাদ শুরু হয়। হামিদ খাঁ সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহকে পদচ্যুত করার জন্য বাহলুল লোদিকে দিল্লী দখলের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। বহলুল লোদি দিল্লী দখল করেন (১৪৫০ সালে)। সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ তার উজির হামিদ খাঁকে হতাশ করে বাহলুল লোদিকে দিল্লির সালতানাত তুলে দিয়ে বদাউনে চলে যান। সেখানে তিনি অতি সাধারণ কৃষকের মত জীবন অতিবাহিত করেন। ১৪৬৪ সালে আলাউদ্দিন আলম শাহর মৃত্যু হয়। এইভাবে দিল্লীর সৈয়দ বংশের ৩৭ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে। এবং দিল্লিতে লোদী রাজবংশের সূচনা হয়।
Advertisement advertise here