লোদী বংশের ইতিহাস - Lodi Dynasty

- May 17, 2019
লোদীরা ছিল আফগানিস্তানের অধিবাসী। লোদি রাজবংশ ছিল পশতু রাজবংশ। আফগান লোদী উপজাতির "শাহু খেল" গোষ্ঠীর অর্ন্তভুক্ত মালিক বাহরম লোদি সুলতান ফিরোজ তুঘলকের আমলে মুলতানে আসেন এবং সেখানকার গভর্নর মর্দান দৌলতের অধীনে চাকুরী নেন। বাহারামের এক পুত্র সুলতান শাহ শিরহিন্দের শাসক নিযুক্ত হন এবং খিজির খাঁ কর্তৃক "ইসলাম খাঁ" উপাধি লাভ করে। বাহরামের অপর এক পুত্র মালিক করার পুত্র ছিলেন বাহলুল লোদী। সৈয়দ-বংশীয় সুলতান মহম্মদ শাহের শাসনকালে বাহলুল লোদী ছিলেন পাঞ্জাবের শাসনকর্তা। দিল্লির সুলতান মহম্মদ শাহের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে মালবের শাসক মহম্মদ খলজী-কে বাহলুল লোদী পরাজিত করে পুরষ্কার হিসেবে লাহোরের শাসক পদে নিয়োজিত হয়। এরপর বাহলুল লোদী দিল্লির সৈয়দ বংশের শেষ সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের উজির হামিদ খাঁ-কে পরাজিত করে দিল্লি দখল করে। এবং আলম শাহ সেচ্ছায় বাহলুল লোদী-কে সিংহাসন সমর্পণ করে, তিনি বদাউনে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে বাহলুল লোদী দিল্লির সিংহাসনে বসে ১৪৫১ সালে লোদি রাজবংশের সূচনা করে। লোদি রাজবংশের ধর্ম ছিল সুন্নি ইসলাম।
Lodi dynasty map
বাহলুল লোদী (১৪৫১-১৪৮৯ খ্রিস্টাব্দ): বাহলুল লোদি ১৪৫১ সালে ১৯ এপ্রিল "সুলতান আবুল বাহলুল শাহ গাজী" উপাধি নিয়ে দিল্লির সালতানাতে বসেন। তিনি কোন রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করেনি। বাহলুল লোদী সৈয়দ বংশের শেষ সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের জামাতা মালবের শাসক মামুদ শাহ শার্কি-কে দিল্লির সন্নিকটে নারেলা নামক স্থানে পরাজিত করে। এরপর মামুদ শাহ শার্কির পুত্র হোসেন শাহ শার্কিকে ১৪৮৬ সালে পরাজিত করে জৌনপুরের শাসক রুপে বসান নিজ পুত্র বরবক শাহ-কে। তিনি মুলতান, মেওয়াট ও দোয়াব অঞ্চলে বিদ্রোহের সম্ভাবনা নির্মূল করেন। কাল্পি, ঢোলপুর ও গোয়ালিয়র পর্যন্ত তার আধিপত্য ছিল। ১৪৮৯ সালে গোয়ালিয়র জয়ের পর দিল্লি ফেরার পথে অসুস্থ হয়ে মারা যান।

সিকান্দার লোদি (১৪৮৯-১৫১৭ খ্রিস্টাব্দ): সিকান্দার লোদী ছিলেন বাহলুল লোদীর তৃতীয় পুত্র নিজাম খান "সিকান্দার শাহ লোদী" নাম নিয়ে দিল্লির সালতানাতে বসেন। এইসময় বাহলুল লোদীর জ্যৈষ্ঠপুত্র জৌনপুরের শাসনকর্তা বরবক শাহ বিদ্রোহ ঘোষণা করলে, সিকান্দর লোদী তাকে পরাজিত ও পদচ্যুত করেন। সিকান্দার লোদি ত্রিহুত ও বিহার জয় করেন। এরপর বাংলা আক্রমণ করেন। এবং বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সঙ্গে অনাক্রমন চুক্তি হয় ১৪৪৫ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর সিকান্দার লোদি ঢোলপুর, নারওয়ার, চন্দেরি ও নাগরপুর জয় করেন।

সিকান্দার লোদী "গুলরুখ বা লালফুল" নামে ফরাসি কবিতা লিখতেন। তার নির্দেশে সংস্কৃত ভাষায় চিকিৎসা সংক্রান্ত গ্রন্থ ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করা হয় (ফার-হাংগ-ই-সিকন্দরী)। তিনি আগ্রা নগরীর গোড়াপত্তন করেন। সিকান্দার লোদীর মাতা ছিলেন হিন্দু। তিনি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেন এবং মন্দিরের উপর মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি নগরকোটের জলামুখী মন্দির ভেঙ্গে কসাই খানার বাটখারা হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দেন। ড: এ. বি. পাণ্ডে বলেন, সিকান্দার লোদী ছিলেন লোদী বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি।

ইব্রাহীম লোদি (১৫১৭-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ): ইব্রাহিম লোদী ছিলেন সিকান্দার লোদি-র জ্যৈষ্ঠপুত্র। তিনি ছিলেন লোদী বংশের শেষ সুলতান। তিনি ছিলেন অযোগ্য ও অত্যাচারী। ফলে আফগান আমিররা সিকান্দার লোদি-র কনিষ্ঠ ভ্রাতা জালাল খাঁকে জৌনপুরের স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা করে। ফলে ইব্রাহীম লোদী তাকে হত্যা করে। বিদ্রোহী জালাল খাঁকে আশ্রয় দেবার অপরাধে গোয়ালিয়র রাজ্য আক্রমণ করে রাজা বিক্রমজিৎ-কে পরাজিত করে। ইব্রাহিম লোদীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে আফগান আমিরদের নেতা পাঞ্জাবের শাসনকর্তা দৌলত খান লোদী এবং সুলতানের কাকা ও গুজরাটের শাসনকর্তা আলম খাঁ লোদী কাবুলের অধিপতি বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। হিন্দুরাজ্য প্রতিষ্ঠার আশায় মেবারের অধিপতি রানা সংগ্রাম সিংহ নীরব ভূমিকা পালন করে। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে এপ্রিল মাসে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ বা জলপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের কাছে ইব্রাহিম লোদী পরাজিত ও নিহত হন। এবং লোদী শাসন বা লোদি রাজবংশের পতন ঘটে। এইভাবে ভারতের তিন শতাব্দীর দিল্লি সালতানাত পতন হয় এবং ভারতে মোগল যুগের সূচনা হয়।

লোদী বংশের পতনের কারণ: ইব্রাহিম সিংহাসনে আরোহণের সময়, লোদি রাজবংশের রাজনৈতিক কাঠামোটি পরিত্যক্ত বাণিজ্যিক পথ এবং অবনমিত কোষাগারের কারণে লোদী বংশ বিলীন হয়ে গিয়েছিল। দাক্ষিণাত্য একটি উপকূলীয় বানিজ্য পথ ছিল, কিন্তু শেষ ১৫ শতাব্দীর সরবরাহ লাইন ধসে গিয়েছিল। এই নির্দিষ্ট বাণিজ্য পথের অবনতি ও পরিণতিতে ব্যর্থতার ফলে উপকূল থেকে অভ্যন্তরের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যেখানে লোদি সাম্রাজ্য ছিল। বাণিজ্য পথের রাস্তায় যুদ্ধ শুরু হলে লোদি রাজবংশ নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় নি। অতএব তারা বাণিজ্য পথগুলি ব্যবহার করেনি, ফলে তাদের বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে এবং তাই তাদের কোষাগারে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার জন্য ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। লাহোরের গভর্নর দৌলত খান লোদি ইব্রাহিমের দ্বারা অপমানের প্রতিশোধ নিতে কাবুলের শাসক বাবুরকে তার রাজ্যে আক্রমণ করতে বলেছিলেন। ইব্রাহিম লোদি এভাবে বাবরের সাথে যুদ্ধে নিহত হন। ইব্রাহিম লোদীর মৃত্যুর সাথে সাথে লোদি রাজবংশের অবসান ঘটে। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতানী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

মহম্মদ খাঁ: মহম্মদ খাঁ ছিলেন সিকান্দার লোদি-র পুত্র। তিনি প্রায় ১০ হাজার সেনাবাহিনী নিয়ে মেবারের রাজপুত রানা সংগ্রাম সিংহ বা রানা সঙ্গ-র সঙ্গে যোগদান করে। এবং ১৫২৭ সালে ১৭ ই মার্চ বাবরের সঙ্গে আগ্রার অদূরে খানুয়ার যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এবং এই যুদ্ধে মহম্মদ খাঁ ও রানা সংগ্রাম পরাজিত হয়।

মামুদ লোদী: ইব্রাহিম লোদির ভাই মামুদ লোদী নিজেকে সুলতান ঘোষণা করে এবং মুগল বাহিনীর সঙ্গে ১৫২৯ খ্রিষ্টাব্দে ৬ ই মে পাটনার উত্তরে গঙ্গা ও গর্গরা নদীর সঙ্গম স্থলে মামুদ লোদীর নেতৃত্বে আফগান বাহিনী ও বাবরের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে এতে মামুদ লোদী পরাজিত হয়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে ঘর্ঘরার যুদ্ধ নামে পরিচিত। মামুদ লোদী পূর্ব দিকে পালিয়ে যায় এবং নতুন ভাবে সেনাবাহিনী খুঁজতে থাকে। মোগল সম্রাট হুমায়ন পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে জৌনপুর আক্রমণ করে মামুদ লোদী-কে ১৫৩২ সালে দৌরার যুদ্ধে পরাজিত করে।
Advertisement