তৈমুর লং এর ভারত আক্রমণ ও ফলাফল

- May 16, 2019
তুঘলক বংশের শেষ শাসক নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহের রাজত্বকালে সমরখন্দের সামরিক নেতা তৈমুর লঙ/লং বা আমির তৈমুর ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত আক্রমণ করে। তৈমুর লং ১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য এশিয়ার সমরখন্দের কেচ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তৈমুর লং এর পিতা আমির তার্ঘি বারলা তুর্কী উপজাতিদের সুরগান বা চাঘতাই তুর্কী সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। তিনি কেচ নামক ক্ষুদ্র অঞ্চলের অধিপতি ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ৩৩ বছর বয়সে কেচ রাজ্যর সিংহাসনে বসেন।
Timur the Lame Image
বাল্যকালে যুদ্ধ করার সময় তৈমুরের একটি পা বর্শাবিদ্ধ হয়। এই সময় থেকে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকে। এই কারণে তার নামের সঙ্গে "লঙ" কথাটি যুক্ত হয়। তিনি মধ্য এশিয়া ও এশিয়ার বিস্তৃণ অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব স্টাপন করে। মেসোপটেমিয়া, পারস্য, সিরিয়া, তুর্কিস্থান, এশিয়ার মাইনর ও আফগানিস্থান জয় করে পৃথিবীর ইতিহাসে তৈমুর লং বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তৈমুর লং এরপর ভারত অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন।

তৈমুরের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য: তৈমুর লং এর আত্মজীবনী "তুজুক ই তৈমুরী (মিলফুজা ই তৈমুরী)" থেকে জানা যায় তৈমুর লঙ এর ভারত অভিযানের দুটি উদ্দেশ্য ছিল। (১) বহুদেববাদ ও পৌত্তলিকতায় আচ্ছন্ন ভারতীয়দের সত্যধর্মে দীক্ষিত করা এবং (২) ভারতের অমিত ধন ঐশ্বর্য লুণ্ঠন করা। আসলে ভারতের বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করায় ছিল তার একমাত্র উদ্দেশ্য। পৌত্তলিকতার বিনাশ একটি অজুহাত মাত্র। মধ্য এশিয়া থেকে এত দূরদেশে অভিযানে আসতে তার সেনাবাহিনী ও আমির ওমরাহরা আপত্তি জানালে তাদের সামনে তিনি ধর্মের কথা তুলে ধরেন। এই প্রেক্ষিতে ড: মজুমদার লিখেছেন - "As a matter of fact, he combined in himself the savage ferocity of Ceinghiz Khan and the fanaticism of Sultan Mahmud."

তৈমুর লং ভারত আক্রমণের বিবরণ: ১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে গোড়ার দিকে তৈমুরের পৈত্র পীর মহম্মদ মুলতান দখল করেন। ওই বছর এপ্রিল মাসে তৈমুর লং সমরখন্দ থেকে বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সিন্ধু, ঝিলাম ও রাভি নদী অতিক্রম করে রাজধানী দিল্লি অভিমুখে অগ্রসর হন। পথিমধ্য দীপালপুর, ভাতনার, শীরসা, কৈথাল প্রভূত স্থান লুঠ করে এবং বহু নরনারীকে হত্যা করে তিনি দিল্লির উপকন্ঠে হাজির হন ১২ ডিসেম্বর ১৩৯৮ সালে। এখানে প্রায় একলক্ষ মানুষ হত্যা করা হয়।

দিল্লির সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ ও তার প্রধানমন্ত্রী মল্লু ইকবাল তাকে প্রতিরোধ করতে অগ্রসর হন ১৭ ডিসেম্বর ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দ। তৈমুর লং এর কাছে পরাজিত হয়ে মল্লু ইকবাল বরণ প্রদেশে এবং সুলতান নাসিরউদ্দিন মহম্মদ গুজরাটে পলায়ন করে। এরপর দিল্লিতে প্রবেশ করে ১৮ ডিসেম্বর ১৩৯৮ সালে তৈমুর ও তার সেনাদল দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে লুণ্ঠন ও হত্যাকান্ড চালায়। জৈনিক ঐতিহাসিক লিখেছেন যে, হিন্দুদের ছিন্নমুন্ডু দিয়ে সৌধ নির্মাণ করে তৈমুরের সেনাদল উল্লাস প্রকাশ করে। নরদেহগুলি মাংসাশী পশু ও পাখির খাদ্য পরিণত হয়। এরপর তিনি প্রভূত ধনরত্ন ও অসংখ্য বন্দী সহ দেশে ফিরে যান ১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে। দেশে ফেরার পথে ফিরোজাবাদ, মিরাট, হরিদ্বার ও জম্মু অঞ্চলে লুণ্ঠন করে এবং শিবালিকা পাহাড়ের পথ ধরে উত্তরে যাওয়ার সময় কাংড়া (হিমাচল প্রদেশ) দখল করে। ভারত ত্যাগের পুর্বে তিনি খিজির খাঁ-কে মূলতান, লাহোর ও দিপালপুরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে যান ৬ ই মার্চ ১৩৯৯ খ্রিস্টাব্দ। ১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ মার্চ সিন্ধু নদ অতিক্রম করে তৈমুর লং দেশে ফিরে যান।

তৈমুর লঙ এর ভারত আক্রমণের প্রভাব: ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে তৈমুর লঙ্গের ভারত আক্রমণের প্রভাব গুরত্বপূর্ণ। তৈমুর লং এর লুণ্ঠনের ফলে ভারত থেকে প্রচুর সোনা, রূপা, মণি-মুক্তা বিদেশে চলে যায়। ঐতিহাসিক বদাউনি লিখেছেন, তৈমুরের হাত থেকে যারা নিষ্কৃতি পেয়েছিল তারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রাণ হারায় এবং এর ফলে দিল্লির জনসংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে দিল্লির আকাশে দুমাস ধরে একটি পাখিকেও উড়তে দেখা যায় নি। লক্ষ লক্ষ মানুষের সঙ্গে গবাদি পশু নষ্ট হয়ে যায়।

Advertisement
তৈমুর লং এর ভারত আক্রমণের ফলে সুলতানী শাসনের সামরিক বাহিনীর দৈন্য দশা প্রকাশ পায়। তৈমুর লঙ এর ভারত আক্রমণের পর গুজরাট, সামনা, বিয়ানা, কালপি, মাহাবা, মুলতান, পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রভুতি অঞ্চলে স্বাধীন রাজ্য গড়ে ওঠে। সুলতানী সাম্রাজ্য দিল্লী থেকে পালামের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্য সংকুচিত হয়ে পড়ে।

তৈমুর লং ধর্মের নামে হিন্দুদের উপর নৃশংস অত্যাচার করে। ফলে হিন্দু মুসলমানদের মধ্য সম্প্রদায়গত বিরোধ দেখা দেয়। হিন্দু পিতা মাতা আতঙ্কিত হয়ে তাদের কন্যাদের বাল্যবিবাহ দিতে থাকে। কারণ নারীর মর্যাদা রক্ষার এটায় অন্যতম পথ বলে মনে করে। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ সমাজের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

তৈমুর লং এর সেনাবাহিনী বহু অট্টালিকা ও মন্দির ধ্বংস করেছিল। তাছাড়া তিনি বহু সুদক্ষ ভারতীয় কারিগর, রাজমিস্ত্রি ও শিল্পীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যান। এদের প্রতিভার অবদান থেকে ভারত বঞ্চিত হয় এবং সমৃদ্ধশালী হয় সমরখন্দ শিল্পকলা। এই সকল ভারতীয় শিল্পীর মাধ্যমে ভারতীয় শিল্পের ধারা সম্প্রসারিত হয় মধ্য এশিয়ার নানা অঞ্চলে।

তৈমুর লং এর ভারত আক্রমণের পর নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহ গুজরাট থেকে দিল্লিতে ফিরে আসেন এবং যৎসামান্য অঞ্চলের উপর রাজত্ব করতে থাকে। দিল্লি সুলতানের আধিপত্য তখন কেবলমাত্র দিল্লি, রোটাক, দোয়াব ও সম্বল অঞ্চলের মধ্য সীমাবদ্ধ ছিল। ১৪১৩ সালে নাসিরউদ্দিন মহম্মদ শাহ মৃত্যু হলে দিল্লীর ওমরাহগণ দৌলত খাঁ লোদী নামে আফগান ওমরাহকে সিংহাসনে বসান। ফলে ভারতের দুশো বছরের তুর্কি শাসনের অবসান ঘটে।
Advertisement