আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ ও গতিপ্রকৃতি

- May 28, 2019
১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে ৩রা আগস্ট ইতালিয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস জলপথে আমেরিকা আবিষ্কার করেন। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে উত্তর আমেরিকায় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন উপনিবেশ গড়ে তোলে। নানা কারণে ইংল্যান্ডের মোট ১৩টি উপনিবেশ আমেরিকায় গড়ে ওঠে। এগুলি হল ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ড, পেনসিলভ্যানিয়া, ম্যাসাচুসেটস, কানেকটিকাট, রোড দ্বীপ, ডেলাওয়ার, নিউইয়র্ক, উত্তর ক্যারোলিন, দক্ষিণ ক্যারোলিন, নিউ জার্সি, নিউ হ্যামপশায়ার এবং জর্জিয়া। ইংল্যান্ড কর্তৃক একজন করে গভর্নর উপনিবেশগুলিতে নিযুক্ত হতেন। প্রতিটি উপনিবেশে একটি করে প্রতিনিধি সভা ছিল। ভার্জিনিয়া ছিল অভিজাততান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক উপনিবেশ। কিন্তু নানা কারণে উপনিবেশগুলির সঙ্গে ইংল্যান্ড বিরোধী মনোভাব পোষণ করতে থাকে। ফলস্বরূপ ১৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ এপ্রিল শুরু হয় "আমেরিকা স্বাধীনতা যুদ্ধ বা আমেরিকান বিপ্লবী যুদ্ধ।" যা ইতিহাসে "আমেরিকার বিপ্লব" নামে পরিচিত।
battle lexington and concord 1775
রাজনৈতিক কারণ: ইংল্যান্ডের হুইগ দল উপনিবেশগুলির ভৌগোলিক দূরত্বের জন্য অভ্যন্তরীণ প্রশাসন সম্পর্কে উদাসীন ছিল। উপনিবেশের প্রতিনিধি সভাগুলির স্বায়ত্তশাসনের প্রবণতা তাই বৃদ্ধি পায়। অধিকাংশ উপনিবেশে ছিল রাজতন্ত্রের বিরোধী। ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লবের পর (১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতি নয়, বরং তারা ক্রমওয়েলের প্রজাতান্ত্রিক শাসনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন।

অর্থনৈতিক কারণ: অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উপনিবেশগুলি মাতৃভূমি ইংল্যান্ডের সম্পূর্ণ প্রভাবাধীন ছিল। নেভিগেশন আইন অনুসারে উপনিবেশগুলিতে উৎপন্ন পণ্য সামগ্রী ইংল্যান্ডের জাহাজ ভিন্ন অন্য কোন দেশের জাহাজে রপ্তানি করা চলত না এবং উপনিবেশগুলির কয়েকটি বিশেষ সামগ্রী ইংল্যান্ড ভিন্ন অন্য কোন দেশে রপ্তানি করার অধিকার ছিল না। তা ছাড়া বিদেশে শিল্পজাত পণ্য সামগ্রী একমাত্র ইংরেজ বণিকদের সহায়তায় আমদানি করতে হত। তামাক, তুলো, চিনি প্রভূতি পণ্য একমাত্র ইংল্যান্ডের বাজারে রপ্তানি করে এবং চা, ইস্পাত বা পশমের দ্রব্য প্রভূতি পণ্য ইংল্যান্ড থেকে ক্রয় করে উপনিবেশগুলির গুরুতর আর্থিক ক্ষতি হতে থাকে।

সামাজিক কারণ: উপনিবেশেগুলিতে ইংল্যান্ডের মতো শ্রেণী বৈষম্য ছিল না। গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে বিশ্বাসী ও অভ্যস্থ উপনিবেশেবাসীদের মধ্য সামাজিক সংহতি ও ঐক্য গড়ে উঠেছিল। তাই উপনিবেশেগুলিতে ইংল্যান্ড হস্তক্ষেপ শুরু করলে তারা বিক্ষুব্ধ হয়।

ধর্মীয় কারণ: যে সমস্ত ইংরেজ ধর্মীয় অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে ইংল্যান্ড ছেড়ে উপনিবেশে বসতি স্থাপন করেছিল তারা অধিকাংশ ছিল পিউরিটান বা প্রোটেস্ট্যান্ট। তাই তারা প্রথম জেমস ও প্রথম চার্লস ক্যাথলিক আদর্শের ও অ্যাঙ্গলিকান চার্চের বিরোধিতার অবতীর্ণ হয়।

সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের প্রভাব: ১৭৫৬-৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় ঘটলে ফরাসী উপনিবেশিক আশঙ্কা দূরীভূত হয়। ঐতিহাসিক এডমন্ড রাইট সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ আমেরিকার বিপ্লবকে অনিবার্য করে তোলে বলে মনে করেন।

দার্শনিক প্রভাব: দার্শনিক টমাস পেইন তার "সাধারণ বুদ্ধি" নামক পাণ্ডুলিপির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের শাসন অবিশ্বাস্য বলে ঘোষণা করে। টমাস জেফারসন আমেরিকাবাসীদের বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। হ্যারিংটন ও মিলটন প্রমুখ মৌলিক অধিকারতন্ত্র উপনিবেশবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে।

নেভিগেশন আইন: ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের স্টুয়ার্ট রাজা দ্বিতীয় চার্লস নেভিগেশন আইন পাশ করেন। এই আইনে বলা হয়, আমেরিকায় কলকারখানা গড়ে তুলতে নিষেধ করা হয়। আমেরিকার তুলো আমদানি করা থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উপনিবেশে উৎপাদিত চিনি, নীল, তামাক ইত্যাদি কেবল ইংল্যান্ডের জাহাজে করে ইংল্যান্ডেই রপ্তানি করার কথা বলে।

সুগার ও স্ট্যাম্প অ্যাক্ট: গ্রেনভিল ১৭৬৪ সালে সুগার অ্যাক্ট চালু করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গ্রেনভিল "Writs of Assistance" নামে এক আইনের দ্বারা চোরাচালান বন্ধ, রাজস্ব বৃদ্ধি ও সন্দেহভাজন আমেরিকানদের বাড়ি তল্লাশি করার কথা ঘোষণা করে। এছাড়া ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে স্ট্যাম্প অ্যাক্ট আরোপ করে। আমেরিকানরা এই আইনকে "Fatal Black Act" রুপে চিহ্নিত করে ও ঘোষণা করে "No taxation without representation"। যেহেতু ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আমেরিকার কোন প্রতিনিধি নেই তাই তারা কর দিতে বাধ্য নন। ফলে বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী গ্রেনভিল পদত্যাগ করে। এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী বাকিংহাম ১৭৬৬ সালে স্ট্যাম্প অ্যাক্ট বাতিল করে।

ঘোষণার আইন: প্রধানমন্ত্রী বাকিংহাম "ঘোষণার আইনে" বলেন, আমেরিকানদের উপর কর ধার্য করার অধিকার ইংল্যান্ডের আছে। ১৭৬৭ সালে তাই অর্থমন্ত্রী চার্লস টাউনসেন্ড আমেরিকায় আমদানিকর চা, কাগজ, চিনি ও কাচের উপর কর ধার্য করেন।

বোস্টন টি পার্টি: ইংল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী লর্ড নর্থ সমস্ত কর বন্ধ করে চায়ের উপর কর বহাল রাখেন পাউন্ড প্রতি ৩ পেনি। এই পরিস্থিতিতে ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ ডিসেম্বর বোস্টন বন্দরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চা বোঝায় ব্রিটিশ জাহাজ এলে। কয়েকজন ঔপনিবেশিক রেড ইন্ডিয়ানদের ছদ্মবেশে জাহাজে উঠে ৩৪২ টি চায়ের পেটি সমুদ্রে ফেলে দেয়। লর্ড অ্যাক্টটন বলেন "That three pence broke up the British Empire." এই আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ সরকার ম্যাসাচুসেটসে অন্তর্গত বোস্টন বন্দর বন্ধ করে দেন এবং ম্যাসাচুসেটসে প্রদেশের স্বায়ত্তশাসন অধিকার নাকচ করেন। ফলে ঔপনিবেণিকদের বিক্ষোভ তীব্রতর হয়।

ফিলাডেলফিয়া কংগ্রেস: ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ফিলাডেলফিয়া শহরে প্রথম অধিবেশনে আমেরিকার কাছে তেরটি ব্রিটিশ উপনিবেশের মধ্যে জর্জিয়া ব্যতীত বারটির প্রতিনিধিগণ সমবেত হন। এই কংগ্রেস বা সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারের নিকট তাদের অভিযােগের প্রতিকার দাবি করার ব্যবস্থা করা হইল এবং ইংলণ্ডের সহিত ঔপনিবেশিকদের বাণিজ্য বন্ধ করার প্রস্তাবও গহীত হয়। কিন্তু এই আবেদন ইংল্যান্ডরাজ তৃতীয় জর্জ বা তার মন্ত্রিসভার নিকট বিবেচনার যােগ্য বলিয়া মনে হইল না। তদানীন্তন ইংলণ্ডের দূরদর্শী নেতৃবর্গ যথা - পিট, আল অব চ্যাথাম, এডমণ্ড বার্ক প্রভৃতি আমেরিকাস্থ ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে মীমাংসায় উপনীত হবার যুক্তি দেখান। কিন্তু তাহা ইংরেজ সরকারের নিকট গ্রহণযােগ্য হয় নাই।

১৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে লেক্সিংটনে মােতায়েন ইংরেজ সৈন্য ও ঔপনিবেশিকদের মধ্যে গুলি চলে। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। সেই বৎসর ফিলাডেলফিয়া শহরে কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে পুনরায় ঔপনিবেশিকগণ তাদের দাবি ইংল্যান্ড রাজ তৃতীয় জর্জের নিকট পেশ করে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সামরিক বলে আমেরিকাকে পদানত করতে চায়। ফলে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সৃষ্টি হয়।

Advertisement
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি: ১৭৭৫ খীষ্টাব্দে এপ্রিল মাসে লেক্সিংটন এবং কনকর্ড নামক স্থানে ব্রিটিশ সৈনা ও ঔপনিবেশিকদের মধ্যে প্রকাশ্য সংঘর্ষের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাসাচুসেটসে বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বোস্টন বন্দরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় স্যার উইলিয়াম হাের নেতৃত্বে এক ব্রিটিশ সমরবাহিনী বােস্টন বন্দরে পাঠানো হয়। ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে জুন মাসে বাঙ্কারহিলের যুদ্ধে ঔপনিবেশিকগণ জেনারেল হাের হাতে পরাজিত হয়। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কিউবেক যুদ্ধে ব্রিটেন প্রথম পরাজিত হয়। কিন্তু জর্জ ওয়াশিংটনের হাতে পরাজিত হয়ে ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে জেনারেল হো ম্যাসাচুসেটস ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে ফিলাডেলফিয়া শহরে কংগ্রেসের তৃতীয় অধিবেশনে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘােষণা করা হয়। এই স্বাধীনতার ঘােষণাপত্রে (Declaration of Independence) বলা হয় যে, ঈশ্বর সৃষ্ট মানুষ সকলই সমান এবং জীবনধারণ, স্বাধীনতা এবং জীবনকে সুখকর করে তোলার অধিকার সকলেরই সমান। এই সকল অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যেই সরকার গঠন করা হয়ে থাকে। সরকার জনসাধারণের মতামত অনুসারেই শাসনকার্য পরিচালনা করিবে। অন্যথায় সরকারকে পরিবর্তন করা এবং নতুন সরকার গঠন করিবার অধিকার জনসাধারণের আছে। শাসক ও শাসিতের রাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্কের এই ব্যাখ্যা আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করে। ফ্রান্স ইংল্যান্ডের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিল। স্বভাবতই ফ্রান্স এই যুদ্ধে ঔপনিবেশিক গণকে অর্থ ও সৈন্য সাহায্য করে। স্পেন এবং হল্যান্ড ইংলডের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিকদের পক্ষ গ্রহণ করে।

এদিকে উইলিয়াম হাে ওয়াশিংটনের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করিয়া নিউ ইয়র্ক দখল করে। কিন্তু ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে স্যারাটোগা নামক স্থানে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আত্মসমপণ করতে বাধ্য হয়। এবং ধীরে ধীরে ইংরজবাহিনী পরাজিত হতে থাকে যথাক্রমে রোড আইল্যান্ড, আগস্ট ১৭৭৮, কিংস মাউন্টেন, অক্টোবর ১৭৮০, কাউপেন্স, জানুয়ারী ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে। এবং সর্বশেষ ১৭৮১ খ্রীষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিস পরাজিত হয়ে ইয়র্ক টাউন নামক স্থানে আত্মসমর্পণ করলে ঔপনিবেশিকদিগকে পদানত করবার চেষ্টা বিফলতায় পর্যবসিত হয়। ইয়র্ক টাউন যুদ্ধ ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ভার্সাই এর সন্ধি (১৭৮৩) দ্বারা ব্রিটিশ সরকার আমেরিকার স্বীকার করে নেয়।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যারা ইংল্যান্ড রাজ তৃতীয় জর্জের পক্ষ গ্রহণ করেছিল তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, কিন্তু এই সন্ধির শর্ত অনুসারে তাদের সকলের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমারেখা এই সন্ধির দ্বারাই নির্ধারিত হয়েছিল। আমেরিকার স্বাধীনতা এবং সেই সীমারেখা অপরিবর্তিত রয়েছিল। এই সন্ধির অপর শর্ত দ্বারা স্পেন ইংলডের কাছ থেকে ফ্লোরিডা ও মিনরকা নিয়ে নেয়, আর ফ্রান্স ইংল্যান্ড কতৃক পূর্ব অধিকৃত টোবাগো, গরি, সেনিগাল ও সেন্ট লুসিয়া ফিরে পায়।
Advertisement