সুলতান রাজিয়া ভারতবর্ষের প্রথম ও শেষ নারী শাসক

- April 21, 2019
ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে রাজিয়া প্রথম নারী। সাধারণত প্রচলিত 'সুলতানা' রাজিয়া কথাটি ভুল। আরবী ব্যাকরণ অনুসারে 'সুলতানা' বলতে সুলতানের স্ত্রী-কে বোঝায়। রাজিয়া কোনও সুলতানের স্ত্রী ছিলেন না। তিনি নিজেই ছিলেন সার্বভৌম শক্তির অধিকারী এবং সুলতান। রাজিয়া তার মুদ্রায় তিনি 'সুলতান' বলেই অভিহিত করেন। রাজিয়ার মাতার নাম ছিল সুলতানা তুর্কমান খাতুন। সুলতান রাজিয়ার পিতার নাম ছিল ইলতুৎমিশ
razia sultan
রাজকর্মচারী ও দিল্লির সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে রাজিয়া ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে উত্তরাধিকার বিষয়ে জনসাধারণ এই প্রথম সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাজিয়ার মূল রাজনৈতিক শক্তি ছিল দিল্লির গণসমর্থন। ঐতিহাসিক ইসামী রচিত ফুতুহ-উস-সালাতিন গ্রন্থে জানা যায়, তিনি দিল্লির নাগরিকদের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণ করতে না পারলে তিনি সিংহাসন ত্যাগ করবেন। ফলে রাজার দৈবসত্ব তত্ত্ব খণ্ডিত হয়। রাজিয়া ছিলেন মধ্য যুগের ভারত ইতিহাসের প্রথম নারী শাসিকা। তার সিংহাসনারোহণ প্রমাণ করেন যে, কারো সিংহাসনে আরোহণের ব্যাপারে উলেমাদের মতামত প্রকাশ করার কোন অধিকার নেই।

সিংহাসনে বসে রাজিয়া একাধিক সমস্যার সমুক্ষীন হয়। রুকুনউদ্দিন ফিরোজের উজির বা প্রধানমন্ত্রী মালিক মহম্মদ জুনাইদির নেতৃত্বে দিল্লির কিছু আমির তার বিরোধিতা করতে থাকে। এছাড়া বদাউন, মুলতান, হানসি ও লাহোরের শাসনকর্তারা একযোগে দিল্লি আক্রমন করেন। রাজিয়া এদের বিরুদ্ধে ভেদনীতি গ্রহণ করে বিদ্রোহী আমির ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান। মালিক মহম্মদ সালারি, মালিক কবির খান, মালিক ইজ্জুদ্দিন-কে নিজ দলভুক্ত করেন। পলাতক অবস্থায় বিরোধী চক্রের প্রধান প্রাক্তন উজির মালিক মহম্মদ জুনাইদি নিহত হন।

প্রাথমিক বিদ্রোহ দমন করার পরে রাজিয়া নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হন। খাজা মুহজাবউদ্দিনকে উজীর পদে নিয়ােগ করেন এবং প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন মালিক সইফউদ্দিন। সইফউদ্দিনের আকস্মিক মৃত্যুর ফলে মালিক-ই-লস্কর পড়ে নিযুক্ত হন কুতুবউদ্দিন হাসান ঘুরী। কবীর খাঁকে লাহােরের ইক্তাদার নিযুক্ত করা হয়। মিনহাজ লিখেছেনঃ “ রাজিয়ার তীক্ষ রাজনৈতিক বুদ্ধির সূক্ষ্ম প্রয়ােগের ফলে লক্ষ্মণাবতী থেকে দেবল পর্যন্ত সমস্ত মালিক এবং আমীরগণ রাজিয়ার আনুগত্য স্বীকার করে নেন।”

রাজনৈতিক ক্ষমতা সুদৃঢ় করার পর রাজিয়া স্বাধীনতাকামী রাজপুত রাজ্য রণথম্ভোরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। কিন্তু তার এই অভিযান সফল হয় নি, এই সময় থেকে চৌহানরা মেওয়াটীদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে গরিলা পদ্ধতিতে বারবার দিল্লীর উপকণ্ঠে হানা দিয়ে সুলতানি প্রশাসনকে বিব্রত করতে থাকে। গােয়ালিয়রের বিরুদ্ধে তার অভিযানটি নিস্ফল থেকে যায়। রাজিয়ার মধ্যে বিচক্ষণতা, ন্যায়পরায়ণতা, রাষ্ট্রপ্রজ্ঞা ইত্যাদি রাজকীয় গুণের সমাবেশ ঘটলেও তার শাসনকাল স্থায়ী হয়েছিল মাত্র তিন বছর ছয়মাস ছয় দিন।

রাজিয়া অতি সুদক্ষ নারী ছিলেন। তিনি পুরুষের পোশাকে সজ্জিত হয়ে দরবারে উপস্থিত হতেন। মধ্য যুগের গোড়া মৌলবী এবং অভিজাতদের কাছে এসব ছিল ব্যাভিচারের সামিল। এই সব কারণে তারা রাজিয়াকে পদচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। ড: কে. এ. নিজামি বলেন, রাজিয়ার ব্যক্তিত্ব ও সাফল্য তুর্কি অভিজাতদের ক্ষোভের কারণ। রাজিয়ার আমলে সর্বপ্রথম রাজতন্ত্রের সঙ্গে তুর্কি অভিজাতদের ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। এই অভিজাতবর্গ চল্লিশ চক্র বা বন্দেগান ই চাহেলগান নামে পরিচিত। রাজিয়া এদের ক্ষমতা খর্ব করেন। জৈনিক হাবসী ক্রীতদাস জামালউদ্দিন ইয়াকুত এর উচ্চপদে নিয়োগকে মালিকরা ঘটনাকে বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ বলেছেন। মিনহাজউদ্দিন ও ইবন বতুতা-র মতে, ইয়াকুত এর সঙ্গে রাজিয়ার প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল।

Advertisement
তুর্কি আমিররা রাজিয়াকে উৎখাতের জন্য নেতৃত্ব দেন রাজপুরির অধ্যক্ষ আমির-ই-হাজিব ইখতিয়ারুদ্দীন আইতেগিন। এই গোষ্ঠীর অন্যান্য নেতারা হলেন ভাতিন্ডার শাসনকর্তা ইখতিয়ারুদ্দীন আলতুনিয়া এবং লাহোরের শাসনকর্তা কবির খান। কিন্তু দিল্লির জনগণ রাজিয়ার পক্ষে ছিল। কবির খান লাহোরে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এরপর ভাতিন্ডার শাসক মালিক আলতুনিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্য রাজিয়া ও তার সহচর ইয়াকুত সহ ভাতিন্ডার দিকে অগ্রসর হন। রাজিয়াকে মালিক আলতুনিয়া বন্দী করে ভাতিন্ডার দুর্গে বন্দী করে রাখেন এবং জামালউদ্দিন ইয়াকুৎকে হত্যা করা হয়। ইলতুৎমিশের তৃতীয় পুত্র মুইজউদ্দিন বাহরাম শাহ-কে সুলতান বলে ঘোষণা করা হয়।

ভাতিন্ডার শাসক আলতুনিয়া আশানুরূপ পদ না পাওয়ায়, তিনি রাজিয়া-কে মুক্ত করেন এবং রাজিয়া-কে বিবাহ করে দিল্লি দখলের জন্য অগ্রসর হন। সুলতান বাহরাম শাহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হলে, তারা ভাতিন্ডায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। পথিমধ্যে হরিয়ানার কায়থাল নামক স্থানে সম্ভবত হিন্দু উপজাতি-দের হাতে ১২৪০ সালে অক্টোবর মাসে নিহত হন।

রাজিয়া সুলতানার সমাধিস্থল নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। একটি মত অনুসারে রাজিয়ার দেহ হরিয়ানার কায়থালে সমাধিস্থ আছে, অপর মত অনুসারে তার সমাধি পুরোনো দিল্লীর বুলবুল-ই-খানা মহল্লায় আছে। পুরোনো দিল্লীর সমাধিটি বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ব দ্বারা সংরক্ষিত আছে তবে অত্যন্ত অবহেলিত ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় বিদ্যমান।

মধ্য যুগে ভারতের ইতিহাসে সুলতান রাজিয়া একমাত্র নারী যিনি দিল্লির সিংহাসনে বসেন। মাত্র তিন বছর ছয় মাস ছয় দিনের রাজত্বকালে সুলতান রাজিয়া রাজকীয় মহিমাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং তুর্কি আমির ওমরাহদের নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন আনেন। ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দিন সিরাজ এর মতে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ শাসক, বুদ্ধিমতী, দয়াশীল, সুবিচারক এবং অন্যান্য সকল প্রশংসনীয় গুণের অধিকারী। তুর্কি আমীরদের আমল না দিয়ে তিনি তার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হলে তারা রাজিয়ার বিরুদ্ধে যায় ও রাজিয়ার পতন হয়। ড: ত্রিপাঠী-র মতে তুর্কি অভিজাতগণ নিজেদের সুযোগ সুবিধা বজায় রাখার জন্য সুলতানা রাজিয়ার পতন ঘটায়।
Advertisement