শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ

author photo
- Thursday, April 25, 2019
advertise here

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ শাসন।

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলাকে এক শাসনাধীনে এনে দিল্লির নিয়ন্ত্রণমুক্ত এক স্বাধীন বাংলার প্রতিষ্ঠা করেন। শামস উদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রতিষ্ঠিত ইলিয়াস শাহী বংশ প্রায় ১৫০ বছর ধরে বাংলা শাসন করে। ১৩৪২ সালে তিনি লাখনৌতির সিংহাসনে বসেন। ১৩৪২ থেকে ১৫৭৬ সালে মোগল বাদশাহ আকবরের বঙ্গ বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা ছিল দিল্লির অধীনতামুক্ত একটি স্বাধীন রাজ্য।

স্যার যদুনাথ সরকার বলেন, ইলিয়াস শাহের লক্ষণাবতীর সিংহাসনে আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা হয়। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ইলিয়াস শাহ বংশ নামে পরিচিত। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের পত্নী ছিলেন ফুলমতি বেগম।

পূর্ব জীবন:

ইলিয়াস শাহের পূর্ব জীবন সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। আরবী ঐতিহাসিক ইবন হজর ও আল সখাই পন্ডিতদের মতে তার আদি নিবাস ছিল পূর্ব ইরানের সিজিস্থান। লাখনৌতির শাসনকর্তা আলী মুবারকের শাসনকালে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং তিনি ১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে আলি মুবারককে হত্যা করে লাখনৌতির সিংহাসনে বসেন। তার রাজত্বকাল সম্পর্কে জানা যায়, তারিখ-ই-ফিরোজশাহী, তবকাত-ই-আকবরী, তারিখ-ই-ফিরিশতা, সিরাত-ই-ফিরোজশাহী প্রভূতি গ্রন্থ থেকে।

রাজ্য বিস্তার:

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সাতগাঁও জয় করেন। ইকতিয়ারুদ্দিন গাজি শাহের কাছ থেকে ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও অধিকার করেন। ঐতিহাসিক আফিফ শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহকে শাহ-ই-বাঙ্গলা, শাহ-ই-বাঙ্গালীয়ান, সুলতান-ই-বাঙ্গালা উপাধিতে ভূষিত করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ উত্তর বিহার বা ত্রিহুত জয় করেন এবং হাজীপুর পর্যন্ত অগ্রসর হন। চম্পারণ, গোরক্ষপুর ও বারাণসী দখল করেন। ১৩৪৬ সালে তিনি নেপাল আক্রমণ করে কাঠমান্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হন। নেপালের বিখ্যাত পশুপতিনাথের মূর্তিটি তিন টুকরো করেন ১৩৫০ সালে। এরপর শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ উড়িষ্যা অভিযান করেন। উড়িষ্যার ভিতর দিয়ে তিনি চিল্কা হ্রদ পর্যন্ত অগ্রসর হন। ১৩৫৭ সালে কামরূপ রাজ্যর কিছু অংশ সুলতান ইলিয়াস শাহের অধিকারভুক্ত হয়।

রাজধানী স্থানান্তর:

বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের সময় থেকে লাখনৌতি ছিল মুসলিম বাংলার রাজধানী। ইলিয়াস শাহ লাখনৌতির কিছু দূরে মহানন্দা ও কালিন্দী নদীর সঙ্গমস্থলে পান্ডুয়াতে ইলিয়াস শাহ রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। নদীর গতিপথ পরিবর্তন ফলে নগরটি অস্বাস্থ্যকর ও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এইসব কারণে সুলতান ইলিয়াস শাহ রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।

দিল্লির সঙ্গে সংঘর্ষ:

ইলিয়াস শাহের শক্তি বৃদ্ধিতে ভীত হয়ে দিল্লির সুলতান ফিরোজ তুঘলক বিশাল বাহিনী নিয়ে ১৫৫৩ সালে বাংলাদেশ আক্রমণ করেন। ফিরোজ তুঘলক চম্পারণ, গোরক্ষপুর ও ত্রিহুত এর মধ্য দিয়ে কোশী নদী পার হয়ে বাংলায় প্রবেশ করে, এবং রাজধানী পান্ডুয়া দখল করেন। এই পরিস্থিতিতে ইলিয়াস শাহ পান্ডুয়া ছেড়ে 'একডালা দুর্গে' আশ্রয় নেন। ইতিমধ্য বর্ষা নামলে সুলতানী বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো ক্রমে ফিরোজ তুঘলক ইলিয়াস শাহকে পরাজিত করে দিল্লি ফিরে আসেন। ঐতিহাসিক আফিফ বলেন, "ফিরোজ দুর্গ আক্রমনের উদ্যোগ নিলে মুসলিম মহিলারা দুর্গের ছাদে উঠে মাথার কাপড় খুলে কাদতেঁ লাগলে ফিরোজ বিচলিত হয়। মুসলিম নিধন ও মহিলাদের অমর্যাদা করতে অনিচ্ছুক ফিরোজ তুঘলক দুর্গ অধিকারের পরিকল্পনা ত্যাগ করেন।" ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, এই সমস্ত কথা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নহে।" শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়। ইলিয়াস শাহ ১৩৫৮ সালে মৃত্যুবরণ করে।

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের কৃতিত্ব:

বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্য ইলিয়াস শাহ অন্যতম ছিল। তিনি প্রথম মুসলিম সুলতান সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি হিন্দু মুসলিম সবার জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। দিল্লির বেতনভোগী ঐতিহাসিকরা তাকে ভাংখোর ও কুষ্ঠরোগী রুপে চিহ্নিত করেছেন। পির ও দরবেশদের প্রতি তার প্রবল শ্রদ্ধা ছিল। তার আমলে শিল্প স্থাপত্য পান্ডুয়া খ্যাতি অর্জন করেন। বলা হয় যে, তিনি হাজিপুর নগর এবং ফিরোজাবাদ বা আদিনায় জলাশয় খনন করেন। বাংলার মুসলিম সুলতানদের মধ্য ইলিয়াস শাহ একজন শ্রেষ্ট নরপতি ছিলেন।
Advertisement advertise here