PayPal

বাংলার হিন্দু রাজা গণেশ

author photo
- Friday, April 26, 2019
রাজা গণেশ (শাসনকাল: ১৪১৫-১৪১৮ খ্রিস্টাব্দ) উত্তরবঙ্গের ভাতুরিয়ার এক জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করে। সিংহাসনে বসার পূর্বে তিনি ছিলেন রাজশাহীর ভাতুরিয়ার জমিদার। রিয়াজ-উস-সালাতিন থেকে জানা যায়, রাজা গণেশ ভাতুরিয়ার জমিদার ছিলেন এবং ফ্রান্সিস বুচানন হ্যামিল্টনের মতে তিনি উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরের হাকিম (গভর্নর) ছিলেন। আইন-ই-আকবরীতে ভাতুরিয়া সরকার বাজুহার অন্তর্গত একটি পরগণা বলে নির্দিষ্ট করেছেন। কিন্তু রেনেল সাহেবের প্রাচীন মানচিত্রে ভাতুরিয়া ভূ-ভাগের যে স্থান নির্দিষ্ট হয়েছে তা বৰ্ত্তমান রাজশাহী বিভাগের অধিকাংশ স্থান বলে মনে করা হয়। উক্ত মানচিত্র অনুসারে গঙ্গাতীর নদীয়া জেলার উত্তরাংশ থেকে মালদহ জেলার প্রান্তভাগ পৰ্য্যন্ত ধরে নিতে হয় দিনাজপুর জেলা এটার বাইরে ছিল। এমতাবস্থায় ভাতুরিয়ার কোন স্থানে অথবা দিনাজপুরের কোন স্থানে রাজা গণেশের অভ্যুদয় হয় সেটা প্রশ্নাতীত।
Raja Ganesha in bangla
Image: Wikipedia
রাজা গণেশ ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানের অন্যতম আমীর হিসেবে চিহ্নিত ছিল। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, সাইফউদ্দিন হামজা শাহ, শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহের আমলে বাংলার রাজনীতিতে রাজা গণেশ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহের আমলে রাজা গণেশ প্রকৃত বাংলার শাসক হয়ে ওঠে। শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহ ছিলেন রাজা গণেশের হাতের পুতুল। রিয়াজ-উস-সালাতিন অনুযায়ী রাজা গণেশ শিহাবউদ্দিন বায়েজিদ শাহকে (শাসনকাল ১৪১২-১৪১৪ খ্রিস্টাব্দ) হত্যা করে বাংলার সিংহাসনে বসেন। কিছু মুদ্রায় প্রথম আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ নামে ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানের নাম পাওয়া যায়। রাজা গণেশ কয়েক মাসের মধ্যে হত্যা করে বাংলার প্রকৃত শাসক হয় এবং ১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ইলিয়াস শাহী বংশের অবসান ঘটে। ১৪১৫ সালে বাংলায় কিছু সময়ের জন্যে রাজা গণেশের হিন্দু রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়।

লৌকিক ও অলৌকিক কাহিনী, কিংবদন্তি এবং জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে রাজা গণেশের ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। আইন-ই-আকবরী, তবকাত-ই-নাসিরী, তারিখ-ই-ফিরিশতা, রিয়াজ-উস-সালাতিন, মাসির-ই-রহিম এবং বুকননের ডায়েরী থেকেরাজা গণেশের বংশের ইতিহাস জানা যায়।

রাজা গণেশের শাসনকাল ছিল মাত্র ৩ বছর। বাংলার দরবেশদের নেতৃত্বে মুসলমানদের একাংশ গণেশের বিরোধিতা করে। রাজা গণেশ কিছু দরবেশকে হত্যা করে। এমতাবস্থায় দরবেশদের নেতা নূর কুতব আলম জৌনপুরের শাসক ইব্রাহিম শর্কীর সাহায্যপার্থী হন। ইব্রাহিম শর্কী বাংলাদেশ আক্রমন করে। ইব্রাহিম শর্কীর আক্রমনে রাজা গণেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অপরদিকে বাংলার নদ নদী ও কাদা মাটিতে ইব্রাহিম শর্কী অসুবিধার সম্মুখীন হন। উভয় পক্ষের মধ্য সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী রাজা গণেশ জৌনপুর অধিপতি-কে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু অর্থ প্রদান করেন এবং নিজ পুত্র যদু বা জিৎমল-কে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে তাকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করতে রাজী হন। ধর্মান্তরিত যদুর নতুন নামকরণ হয় জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ

জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কী ফিরে গেলে রাজা গণেশ 'দনুজমর্দনদেব' নাম নিয়ে পুনরায় বাংলার সিংহাসনে বসেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ বা যদুকে পুনরায় হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনেন এবং কারারুদ্ধ করে রাখেন। দনুজমর্দনদেব নামে রাজা গণেশ সমগ্র ১৩৩৯ শকাব্দ (১৪১৭-১৪১৮ খ্রিস্টাব্দ) এবং ১৩৪০ শকাব্দের (১৪১৮-১৪১৯ খ্রিস্টাব্দ) কিছুকাল রাজত্ব করার পর রাজা গণেশের মৃত্যু হয়।

ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার রাজা গণেশ-কে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও কুশাগ্রবুদ্ধি ও কূটনৈতিক বলেছেন। ফেরিস্তার মতে, গণেশ ছিলেন দক্ষ শাসক। বাংলার বৃহত্তম অংশের উপর তার রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল। প্রায় সমগ্র উত্তরবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ এবং মধ্য, পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের কিছুটা নিয়ে রাজা গণেশের রাজ্য গঠিত। তিনি চণ্ডীবদেবীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নিজ মুদ্রায় চণ্ডীচরণপরায়ণস্য শব্দটি খোদিত করেন। তিনি কিছু মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেন। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় কারণ নয়। দরবেশরা গণেশের বিরুদ্ধে গিয়ে রোষের মুখে পড়ে। রাজা গণেশ হিন্দু মুসলিম সবার প্রতি সমদর্শী ছিলেন। তিনি কখনোই সাধরণ মুসলিমদের উপর কোন অত্যাচার করেন নি। রাজা গণেশ স্থাপত্য শিল্পের অনুরাগী ছিলেন। রাজা গণেশ গৌড়ের ফতে খানের সমাধি ভবন এবং পান্ডুয়ার একলাখি প্রসাদ নির্মাণ করেন। রাজা গণেশ পান্ডুয়ার বিখ্যাত আদিনা মসজিদের সংস্কার সাধন করেন।