জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ

author photo
- Friday, April 26, 2019

বাংলার সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ।

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ (শাসনকাল ১৪১৮-১৪৩১) ছিলেন বাংলার সুলতান। রাজা গণেশের মৃত্যুর পর বাংলার সিংহাসনে বসেন ধর্মান্তরিত পুত্র যদু বা জালালউদ্দিন। তাঁর বাল্য নাম ছিল যদু, তিনি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে তাঁর নতুন নামকরণ করা হয় জালালউদ্দিন মুহাম্মদ। তিনি দু’পর্যায়ে ১৪১৫ থেকে ১৪১৬ এবং ১৪১৮ থেকে ১৪৩১ (হিজরি ৮১৮-৩৬) খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন। ১৪১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা গণেশ জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহকে সিংহাসনচ্যুত ও বন্দি করে পুনরায় হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের প্রকৃত শাসন শুরু হয় ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা গণেশ ও তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মহেন্দ্রের চূড়ান্ত উৎখাতের পর।

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ প্রায় দু’দশকের শান্তিপূর্ণ শাসনামলে পূর্ববঙ্গ (মুয়াজ্জমাবাদ) ও চট্টগ্রামসহ প্রায় সমগ্র বাংলার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ ফতেহাবাদ (ফরিদপুর) জয় করে দক্ষিণবঙ্গে রাজ্য সম্প্রসারণ করেন। তিনি ছিলেন ধার্মিক, ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু শাসক। একমাত্র ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের উপর তিনি চরম অত্যাচার করেন।

তিনি যোগ্যতাসম্পন্ন হিন্দুদের উচ্চপদে নিয়োগ করেন। তার সেনাপতি ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু রাজ্যধর। সংস্কৃত পণ্ডিত বৃহস্পতি মিশ্রকে তিনি যথেষ্ঠ সমাদর করতেন।

হানাফি মাযহাবের অনুসারী জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ উলামা ও শেখদের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেন। তিনি পিতা রাজা গণেশ কর্তৃক ধ্বংসাকৃত মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় ইমারত পুনঃনির্মাণ ও মেরামত করেন এবং পাশাপাশি নতুন ধর্মীয় ইমারত নির্মাণ করেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ তাঁর রাজধানী পান্ডুয়া থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন এবং সেখানে একটি মসজিদ, একটি পুকুর (জালালী পুকুর) ও একটি সরাইখানা নির্মাণ করেন। তিনি শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে সুতিয়ার প্রশাসক একটি জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করেন।

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ হিরাতের তৈমুরি শাসক শাহরুখ, চীনের ইয়াং-লো এবং মিশরের মামলুক সুলতান আল-আশরাফ বার্সবে-র সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি সুলতান ও আমীর উভয় উপাধি গ্রহণ করেন এবং আববাসীয় খলিফার নিকট থেকে সম্মানসূচক পোশাক খিলাত ও খেতাব লাভ করেন। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ খলিফাত-আল্লাহ উপাধি ধারণপূর্বক তিনি ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দে নতুন মুদ্রা চালু করেন। তিনি তাঁর মুদ্রায় কালিমা উৎকীর্ণ করেন।

সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের দু’টি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথমটি গোদাগারী রাজশাহী থেকে সুলতানগঞ্জ লিপি, এবং অপরটি ঢাকা থেকে মান্দ্রা লিপি। তার উভয় লিপিই দু’টি মসজিদ স্থাপনের স্মারক। তার লিপি দু’টির অস্তিত্ব প্রমান করে যে, উক্ত অঞ্চলে সুলতান কর্তৃক বিজিত হয় ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। কানিংহাম তার আমলে বাংলার স্থাপত্য শিল্পের প্রশংসা করেছেন। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ ১৪৩১-১৪৩২ সালে মারা যান। তাকে পান্ডুয়ার বিখ্যাত একলাখী সমাধিসৌধ করা হয়।

শামসুদ্দিন আহম্মদ শাহ:

জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র শামসুদ্দিন আহম্মদ শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। তিনি ঘোরতর অত্যাচারী ছিলেন। তার কুসাসনে অতিষ্ঠ হয়ে আমির ওমরাহ রা তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। ১৪৪২ সালে দুই ক্রীতদাস নাসির খান ও সাদি খান হত্যা করে। এর সঙ্গে সঙ্গে রাজা গণেশের বংশের পতন ঘটে (১৪৪২ খ্রিস্টাব্দ)।