বাংলায় হাবশী বা আবিসিনীয় শাসন

- April 24, 2019
ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান বরবক শাহ প্রচুর হাবশী (Habsi) বা আবিসিনীয় ক্রীতদাস আমদানি করেন এবং শাসনকার্য নিয়োগ করে। ১৪৮৭ সালে সুলতান জালালউদ্দিন ফতে শাহকে হত্যা করে বাংলায় ছয় বছর (১৪৮৭-১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দ) হাবশী বা আবিসিনীয় শাসন চলে। এই ছয় বছর মোট চারজন হাবসি সুলতান বাংলার সিংহাসনে বসেন। হাবসী শাসন কালকে বাংলার অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
Shamsuddin Muzaffar Coins
Image: World of Coins
শাহজাদা বারবক: হাবশী প্রসাদরক্ষী বা পাইকদের অধ্যক্ষ বারবক শাহ সুলতান শাহজাদা নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন। ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান জালাল উদ্দিন ফত-কে হত্যা করে ১৪৮৭ সালে ইলিয়াস শাহী শাসনের অবসান ঘটান। এবং বাংলাদেশে আবিসিনীয় শাসনের সূচনা করেন। তিনি মাত্র ৬ মাস শাসন করেন। ১৪৮৭ সালে মালিক আনদিল নামে এক হাবশী সেনাপতি সুলতান শাহজাদাকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসনে বসেন।

সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ: ইলিয়াস শাহী রাজবংশের প্রতি অনুগত মালিক আনদিল নামে এক হাবশী সেনাপতি সুলতান বারবক শাহ শাহজাদা-কে হত্যা করে ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান ফতে শাহ-র নাবালক পুত্রকে সিংহাসনে বসানোর উদ্যোগ নেন। ফতে শাহ-র বিধবা পত্নী এতে সম্মত না হওয়ায় তিনি নিজেই সাইফউদ্দিন ফিরোজ নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন (১৪৮৭-১৪৯০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি ৩ বছরের শাসনকালে কিছুটা আশার আলো দেখান। উত্তর ময়মনসিংহের শেরপুর নামক স্থানে প্রাপ্ত ফিরুজের মুদ্রা থেকে অনুমান করা হয় যে, ঐ অঞ্চলে তার আধিপত্য ছিল। তিনি গৌড়ে ফিরুজ মিনার নির্মাণ করেন। তিনি সুশাসক ও প্রজাদরদী ছিলেন। অল্পদিনের মধ্য সাইফউদ্দিন ফিরোজকে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় মাহমুদ শাহ: সাইফউদ্দিন ফিরোজের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় মাহমুদ শাহ (১৪৯০-১৪৯১ খ্রিস্টাব্দ) বাংলার সিংহাসনে বসেন। তবকাত ই আকবরীর মতে, তার রাজত্বকাল ছিল মাত্র ১ বছর। তিনি ছিলেন নাবালক সুলতান। দ্বিতীয় মাহমুদ শাহের সিংহাসনারােহণের সাথে সাথে বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্দিন ঘনিয়ে আসে। অল্পবয়স্ক হবার জন্য সুলতান হলেও প্রকৃত শাসনক্ষমতা তার হাতে ছিল না। মামুদের প্রতিনিধি স্বরূপ শাসন পরিচালনার দায়িত্ব ছিল হবস খান নামক জনৈক ব্যক্তির উপর। আরিফ কান্দহারীর মতে, হবস খান ছিলেন মাহমুদের গৃহশিক্ষক। যাই হােক্, হবস খান কিছুদিনের মধ্যেই অপর এক হাবসী আমীর সিদি বদর কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন। সিদি বদর ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বিকৃতমস্তিষ্ক। তিনি প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে নিজেই সিংহাসনে বসার পরিকল্পনা করেন এবং ক্ষমতালােভী, অস্থিরমতি পাইকদের হাত করে ১৪৯১ খ্রীষ্টাব্দে মাহমুদ শাহকে হত্যা করে সিংহাসনে আরােহণ করেন। বর্ধমান জেলার কালনায় প্রাপ্ত মুদ্রা থেকে মনে করা হয় যে, মামুদের স্বল্পকালীন রাজত্বেও উড়িষ্যার দিকে বিজয়-অভিযান ছিল।

শামসউদ্দিন মুজাফফর: সিদি বদর ১৪৯১ খ্রীষ্টাব্দে সামউদ্দিন মুজফফর নাম নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন। তার তিন বছরের রাজত্বকাল ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন, আবিসিনীয় শাসনের অন্ধকারময় সময়। তার রাজত্বের তিন বছর দেশে চলেছিল অবাধ হত্যা ও শােষণ। সিংহাসনকে বিপদমুক্ত করার মানসে তিনি নির্বিচারে প্রতিভাবান আমীর, কর্মচারী ও বিদগ্ধ ব্যক্তিদের হত্যা করেছিলেন। এক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলমান কোন সম্প্রদায়ের মানুষই রেহাই পায়নি। সাধারণ গরীব প্রজাদের উপর শুরু হয় অতিরিক্ত খাজনা। আদায়ের জুলুম। এমনকি সেনাবাহিনীর বেতনও তিনি অনেক হ্রাস করেছিলেন। এইভাবে একদিকে দেশের সমস্ত শ্রেণীর মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তােলেন এবং সেনাবাহিনীকে চটিয়ে নিজের শক্তি নিজেই ক্ষয় করেন।

একসময় তার অত্যাচার সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যায়। অবশ্য এসব কাজে সুলতানের প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন তার উজীর সৈয়দ হুসেন। কিন্তু দেশব্যাপী যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, তা হুসেনের দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই তিনি মুজফফরের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ দেশবাসীর নেতৃত্ব করাকেই শ্রেয় মনে করেন। এমতাবস্থায় মুজফফর তার অনুগামীদের নিয়ে এক সুরক্ষিত দুর্গে আত্মগােপন করেন। সৈয়দ হুসেনের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা সেই দুর্গ অবরােধ করে। এই অবরােধ ও সংঘর্ষ চলে প্রায় চার মাস ধরে। উভয়পক্ষে মিলিয়ে নিহত হয় প্রায় কুড়ি হাজার মানুষ। সৈয়দ হুসেন ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে মুজফফরকে নিহত করে হাবশী শাসনের অবসান ঘটান। সৈয়দ হুসেন বাংলার অভিজাত ও জনগণের অনুরোধে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ উপাধি নিয়ে বাংলার সিংহাসনে বসেন। বাংলার ইতিহাসে হোসেন শাহী বংশের শাসন শুরু হয়।