PayPal

ভক্তি আন্দোলন

author photo
- Tuesday, April 23, 2019

ভক্তি আন্দোলনের ইতিহাস।

ভক্তি শব্দের অর্থ হল ভজনা বা ঈশ্বরের নামগান করা। অন্তরের পবিত্রতা ও চিত্ত শুদ্ধির মাধ্যমে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটানো। এর মূল অর্থ হল ব্যক্তির সঙ্গে ঈশ্বরের অতীন্দ্রিয় যোগাযোগের প্রতিষ্ঠা। ভক্তি ও কর্মের মাধ্যমে মুক্তি লাভ।

ভক্তি আন্দোলনের উৎস বা কারণ:

ভক্তিবাদের মূল কথা হল আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের মিলন।
১) ওয়েবার, গ্রিয়েরসন প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে ভক্তির মাধ্যমে মুক্তির চিন্তা খ্রিষ্টধর্ম থেকে এসেছে। বার্নেট এবং অন্যান্য অনেকে এই বক্তব্যর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে বলেন যে এ দেশীয় উপাদানগুলোর মধ্যই ভক্তির উৎস নিহিত ছিল। বৈদিক সাহিত্য, গীতা, মহাভারত, পুরাণ ভক্তি আন্দোলনের উৎসভূমি।
২) ভক্তিবাদী আন্দোলনের একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল। হিন্দু সমাজের উচ্চবর্ণের লোকেরা ছিল খুৎ, মুকাদ্দম ও সামন্ত শ্রেণীর লোক। মুসলিম শাসকশ্রেণী ও ছিল সামন্ততান্ত্রিক। দরিদ্র কৃষক, নিম্নবর্ণের মানুষ এবং শহরের কারিগর শ্রেণী ছিল নিপীড়িত ও শোষিত। ভক্তিবাদ সামাজিক ন্যায়ের তত্ত্ব প্রচার করে এইসব মানুষকে আকৃষ্ট করে।
৩) সুফি সন্তরা আল্লাহের প্রতি ভক্তিকেই মুক্তির একমাত্র পথ বলে অভিহিত করেন। তারা অতীন্দ্রিয়, দিব্য উপলব্ধি, ভক্তিতত্ত্ব, নৈতিকতা এবং হিন্দু মুসলিম সমন্নয়ের উপর জোর দিতেন।
৪) খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্য দক্ষিণ ভারতে প্রকৃত পক্ষে ভক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়। শৈব নায়নার এবং বৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায় এই আন্দোলনের সূচনা করে। তারা জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তির আদর্শকে তুলে ধরেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম থেকে জনসাধারণকে সরিয়ে এনে সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতার পূজার প্রতি তাদের আকৃষ্ঠ করা। পরবর্তীকালে খ্রিস্টীয় চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে ভক্তিবাদ এক ব্যাপক আনদলনের রূপ ধারণ করে।
৫) ড: কুরেশি, ইউসুফ হুসেন প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে, ইসলাম থেকে হিন্দু ধর্মে ভক্তির প্রবেশ ঘটেছে। তাদের মতে ইসলামের একেশ্বরবাদ ও আল্লাহের প্রতি আত্মসমর্পণ ভক্তিবাদী প্রচারকদের প্রভাবিত করে।

ভক্তি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য:

ভারতের ভক্তি আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য হল - ১) একেশ্বরবাদ, ২) সামাজিক সাম্য ও ভাত্তৃত, ৩) গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ও গুরুবাদ, ৪) অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূরীকরণ, ৫) ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরের সন্ধান, ৬) মূর্তিপূজা, পুরোহিততন্ত্র ও জাতিভেদ প্রথার প্রতি ঘৃণা।

ভক্তি আন্দোলনের সাধক-গণ:

ভক্তিবাদ আন্দোলনে বল্লভাচার্য:

দক্ষিণ ভারতে বৈষ্ণব ধর্ম ও ভক্তিবাদ প্রচারে বৈষ্ণব গুরু বল্লভাচার্য (১৪৭৯-১৫৩১ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন অন্যতম। ১৪৭৯ সালে দাক্ষিণাত্যর এক তেলেগু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শ্রীকৃষ্ণের উপাসক বল্লভাচার্য জাতিভেদ মানতেন না। তার মতে সকল জীবই ঈশ্বরের সন্তান। তিনি মনে করেন, শ্রীকৃষ্ণের সেবা ও জীবের প্রতি প্রেম হল মোক্ষ লাভের উপায়। বল্লভাচার্য ভগবদগীতা ও ব্রহ্মসূত্রের টীকা এবং শুদ্ধ অদ্বৈত নামে একেশ্বরবাদ সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন।

ভক্তিবাদী আন্দোলনে শ্রী চৈতন্য:

শ্রী চৈতন্য বাংলার নবদ্বীপের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাল্যই ব্যাকরণ, ন্যায়, দর্শন প্রভূতি নানা শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করে। ২২ বছর বয়সে শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব গুরু ঈশ্বরপুরী-র কাছে কৃষ্ণ মন্ত্রে দীক্ষা লাভ করেন। ২৪ বছর বয়সে সন্ন্যাস গ্রহণ করে তিনি বৈষ্ণব ধর্মের মূলমন্ত্র বৈরাগ্য, বিশুদ্ধ, প্রেম, ভক্তি ও জীবের দয়ায় আদর্শ প্রচারে ব্রতী হন। শ্রী চৈতন্যর অনুগামীদের শ্রী চৈতন্য তৃণের মতো নম্র হবার নির্দেশ দেন। শ্রী চৈতন্য বলেন যে, ভক্তি ছাড়া জীবের মুক্তি নেই। বাংলায় প্রেম ও ভক্তি আন্দোলন বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন শ্রী চৈতন্য। তিনি জাতিভেদ অস্বীকার করেন। তিনি মনে করতেন, সকল মানুষই সমান আধ্যাতিক শক্তির অধিকারী এবং ভক্তিভাবের মাধ্যমে মুক্তিলাভ সম্ভব। উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করে সর্বত্র তিনি প্রেম ধর্মের বন্যা প্রবাহিত করেন। শ্রী চৈতন্য শিষ্যদের মধ্য উড়িষ্যা-রাজ প্রতাপরুদ্রদেব, নিত্যানন্দ, শ্রীবাস, জীবগোস্বামী, রূপ-সনাতন থেকে যবন হরিদাস সকলেই ছিলেন। শ্রী চৈতন্য প্রচারিত ধর্মমত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম নামে পরিচিত। তার অনুগামীদের কাছে তিনি বিষ্ণুর অবতার হিসেবে চিহ্নিত। শ্রী চৈতন্যর মতাদর্শ সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

ভক্তিবাদ আন্দোলনে গুরু নানক:

শিখ ধর্মের প্রবর্তক পাঞ্জাবের গুরু নানক ছিলেন মধ্য যুগের ধর্ম প্রচারক। ১৪৬৯ সালে পাঞ্জাবের লাহোর জেলায় রাভী নদীর তীরে তালবন্দি গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে গুরু নানক জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে, সত্যর সন্ধানে তিনি সুদূর মক্কা ও বাগদাদ ভ্রমণ করেন এবং কালক্রমে পরম সত্যর সন্ধান পান। গুরু নানক মূর্তি পূজা, তীর্থ যাত্রা, জাতিভেদ প্রথা নিন্দা করতেন। তার মতে ঈশ্বর লাভের জন্য কখনোই সন্ন্যাস অপরিহার্য নয়। ধর্মের জটিল ও বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত হয়ে সৎ-শ্রী-আকাল অর্থাৎ সত্য স্বরূপ ভগবানের আরাধনাই ছিল নানক প্রবর্তিত ধর্মের মূল মন্ত্র। তিনি মনে করতেন যে, নাম বা ঈশ্বরের গুণগান, দান বা জীবের সেবার মাধ্যমেই আধ্যাতিক উন্নতি সম্ভব। তার ধর্মের মূল কথা হল ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। তার শিষ্যরা শিখ নামে পরিচিত। শিখ কথাটি সংস্কৃত শিষ্য কথার অপভ্রংশ। শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হল গ্রন্থসাহেব।

ভক্তিবাদী আন্দোলনে কবীর:

রামানন্দের শিষ্য ছিলেন কবীর। কবীরের জন্ম-মৃত‍্যু ঠিক কবে তার সঠিক তথ্য জানা যায় নি। বারানসীর লহরতালাব নামক স্থানে কবীরের জন্ম হয়ে বলে অনেকে মনে করেন। তিনি মাতা কর্তৃক পরিত্যাক্ত হয়ে এক মুসলিম তাঁতির গৃহে লালিত-পালিত হন। তিনি সুলতান সিকন্দর লোদীর সমসাময়িক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শাস্ত্রীয় বিধান, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, তীর্থযাত্রা, শাস্ত্র পাঠ বা জাতিভেদ নয় - কেবলমাত্র মনের পবিত্রতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে প্রকৃত ধর্মলাভ সম্ভব। তার কাছে আল্লাহ ও রাম সমানভাবে পূজ্য এবং সকল মানুষই এক পরমেশ্বরের সৃষ্টি। হিন্দু মুসলিম উভয় মানুষই কবীরের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। তারা কবীরপন্থী নামে পরিচিত। কবীর হিন্দি ভাষায় সুন্দর সুন্দর দোঁহা রচনা করেন।

ভক্তিবাদী আন্দোলনে রামানুজ:

দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদ আন্দোলনের প্রবক্তা রামানুজ। ১০১৭ সালে দক্ষিণ ভারতের শ্রীপেরামপুদুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কাঞ্চি ও শ্রীরঙ্গম ছিল তার প্রচারকার্যের প্রধান কেন্দ্র। চোল রাজাদের বিরোধিতার ফলে তিনি হোয়েসল রাজ্য গমন করেন এবং সেখানে বৈষ্ণব ধর্মের ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কর্মের দ্বারা আসক্তি ও মায়ার উদ্ধব হয়। একমাত্র ভক্তিযোগের মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিলাভ সম্ভব। তিনি জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

ভক্তিবাদ আন্দোলনে রামানন্দ:

রামানন্দ মধ্য ভারতের প্ৰয়াগের কাছে মালকোটের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ ও পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে জীবিত ছিল। তিনি বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক রামানুজের শিষ্য ছিলেন এবং নিজে ছিলেন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রাম ও সিতার উপাসক করতেন। ভগবান রামচন্দ্র ও সীতার উপাসক হলেও তিনি ঈশ্বরের একত্ব প্রচার করেন এবং জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জন্যই ভক্তিবাদ প্রচার করেন। তিনি জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা অস্বীকার করেন। তিনি হিন্দি ভাষায় ধর্মপ্রচার করতেন এবং সকল বর্ণের এমনকি নিম্নজাতির লোকেদের শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। রামানন্দ শিষ্য রবিদাস ছিলেন মুচি, কবীর ছিলেন মুসলিম তাঁতি (জোলা), সোনা ছিলেন নাপিত এবং সাধন ছিলেন কসাই।

ভক্তি আন্দোলনে মীরাবাঈ:

মধ্য যুগের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে শিশোদিয়া রাজপরিবারের বধূ মীরাবাঈ (১৫০৩-১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দ) একটি উজ্জ্বল নাম। মেবারের রানা সঙ্গের পুত্রবধূ মীরাবাঈ অল্প বয়সেই কৃষ্ণ প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। গীরিধারীর প্রেমে বিভোর হয়ে তিনি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে মথুরা ও বৃন্দাবনে সাধুসঙ্গ কালাতিপাত করেন। তিনি মনে করতেন যে, ভক্তি ও ভালোবাসার দ্বারাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করা সম্ভব। তার প্রচারের ফলে রাজপুতানায় কৃষ্ণ প্রেমের প্লাবন প্রবাহিত হয়। সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ভক্তিবাদ নিবেদন করেন। মীরার ভজন নামে পরিচিত তার ভক্তিমুলুক গানগুলি আজও ভারতীয় সাহিত্যে ও সঙ্গীতের মূল্যবান সম্পদ।

ভক্তি আন্দোলনে নামদেব:

পশ্চিম ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন প্রচার করে মারাঠি নামদেব। হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের সেতুবন্ধনে তার অবদান অনেক বেশি। তিনি নীচ বংশ হলেও, ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের জনজীবনে তিনি ভক্তিবাদ আন্দোলনের প্লাবন এনে দেন। জাতিভেদ ও মূর্তিপূজার ঘোরতর বিরোধী নামদেব ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক ও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। তিনি মনে করতেন একমাত্র বিশুদ্ধ ভক্তিবাদের মাধ্যমে মুক্তিলাভ সম্ভব। তিনি প্রচার করেন হৃদয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ থেকে সর্বদা হরিনাম গান করো।

ভক্তি আন্দোলনের ফলাফল ও গুরত্ব:

১) ভক্তিবাদ আন্দোলন সমাজের অবহেলিত মানুষের মূলমন্ত্র।
২) ধর্মা চার্যগণ হিন্দুধর্মে নানা সংস্কার প্রবর্তন করে ইসলাম ধর্মের অগ্রগতি রোধ করতে সাহায্য করে।
৩) হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪) নামদেব মারাঠি ভাষা, কবিরের দোঁহা হিন্দি ভাষা ও নানক পাঞ্জাবি ভাষা গুরুমুখী লিপিকে উন্নত করে।
৫) আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্যর বিকাশ ঘটে।
৬) বাংলার বৈষ্ণব কবিরা বাংলা ভাষাকে নতুন রূপ দান করেন(The Sultanate of Delhi, A.L.Srivastava, P. 295.)।
৭) ভক্তিবাদ আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে জাতিভেদ ও উচ্চ-নীচ বৈষম্য এবং বর্ণাশ্রম ধর্মের কঠোরতা কিছুটা কমিয়ে আনে।

ড: নিমাই সাধন বসু মনে করেন, 'ভক্তিবাদী আন্দোলনের প্রভাবে শাসকগোষ্ঠী জনকল্যাণের আদর্শ অনুসরণ করেন।' ড: অমলেশ ত্রিপাঠী বলেন, 'ভক্তিবাদ হল বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ফলপ্রদ ঘটনা।'