দক্ষিণ ভারতের সাতবাহন রাজবংশ - Satavahana Dynasty

- March 12, 2019
মৌর্য সম্রাট অশােকের মৃত্যুর পর দাক্ষিণাত্যে মৌর্য আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে মৌর্য সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তুপের উপর সাতবাহন সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। সাতবাহনদের রাজধানী ছিল পৈঠান ও অমরাবতী। সাতবাহন ইতিহাসের সাহিত্যিক উপাদান হিসেবে পুরাণ বিশেষ করে মৎস্য ও বায়ুপুরাণ, টলেমির ভূগােল এবং গুণাঢ্য রচিত বৃহৎকথা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই যুগের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মাতা গৌতমী বলশ্রী রচিত নাসিক প্রশস্তি, কলিঙ্গ রাজ খারবেলের হস্তিগুম্ফা শিলালিপি, শক রাজা রুদ্রদামনের জুনাগড় লিপি এবং রাজমাতা নায়নিকার নানাঘাট লিপি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও কানহেরি, কার্লে, অমরাবতী প্রভৃতি স্থানে প্রাপ্ত শিলালিপিগুলি থেকে এই যুগের নানা তথ্যাদি পাওয়া যায়। সােপারা, জোগালথেম্বি, অকোলা ও বেরারে প্রাপ্ত মুদ্রাগুলিও সাতবাহন ইতিহাস সম্পর্কে আলােকপাত করে। সাতবাহনদের বংশ পরিচয়, আদি বাসস্থান ও রাজত্বকাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। মুদ্রা ও শিলালিপিতে তাদের সাতবাহন বলে উল্লেখ করা হলেও পুরাণে তাদের বলা হয়েছে অন্ধ্র ও অন্ধ্রভৃত্য। ডঃ ভাণ্ডারকর, নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, সাতবাহনদের আদি বাসস্থান ছিল উড়িষ্যার দক্ষিণ পূর্ব উপকুলের তেলেগু-ভাষী অন্ধ্র অঞ্চলে এবং এ জন্যই তাদের অন্ধ্র বলা হয়েছে। ডঃ শাস্ত্রী বলেন যে , সাতবাহন বা অন্ধ্ররা প্রথমে ছিল মৌর্যদের ভৃত্য। এ কারণে তাদের অন্ধ্রভৃত্য বলে অভিহিত করা হয়েছে।
Inscription of Gautamiputra Satakarni Nasik Caves
আদি বাসস্থান: সাতবাহনরা অন্ধ বা অন্ধ্রভৃত্য নামে পরিচিত হলেও তাদের প্রাথমিক পর্বের কোনও শিলালিপি অন্ধ্র অঞ্চল বা পূর্ব দাক্ষিণাত্যে পাওয়া যায় নি। এগুলি সবই মিলেছে পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের নাসিক, নানঘাট প্রভৃতি অঞ্চলে। আদি সাতবাহনদের মুদ্রাগুলিও মিলেছে মহারাষ্ট্রে। সাতবাহনদের আদি রাজধানী প্রতিষ্ঠান বা পৈঠান নগরী মহারাষ্ট্রের কাছাকাছি অবস্থিত। এছাড়া, অন্ধ্রদেশ গৌতমীপুত্র সাতকণির রাজ্যভুক্ত ছিল না। বলা হয় যে, মৌর্য সম্রাটের অধীনস্থ অভৃত্যরা কর্মসূত্রে পশ্চিম দাক্ষিণাত্য বা মহারাষ্ট্রে যায়। মৌর্যদের পতন হলে সেখানে তারা স্বাধীনতা ঘােষণা করে এবং পরে ধীরে ধীরে তারা পূর্ব দাক্ষিণাত্যে অন্ধ্র অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়। ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী-র মতে, পশ্চিম দাক্ষিণাত্যই তাদের আদি বাসস্থান।

সাতবাহন রাজাদের তালিকা: একাধিক পুরাণে সাতবাহন রাজাদের কালানুক্রম রয়েছে। তবে, সাতবাহন রাজবংশের রাজার সংখ্যা, রাজাদের নাম এবং তাদের শাসনের দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভিন্ন পুরাণের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। এছাড়াও, পুরাণে তালিকাভুক্ত কিছু রাজা প্রত্নতাত্ত্বিক এবং সংখ্যাগত প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়। একইভাবে মুদ্রা এবং শিলালিপি থেকে কিছু রাজা পরিচিত, যাদের নাম পুরাণ তালিকা গুলিতে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন পুরাণ সাতবাহন শাসকদের বিভিন্ন তালিকা দেয়। মৎস্য পুরাণে বলা হয়েছে যে ৩০ অন্ধ্র রাজা ৪৬০ বছর রাজত্ব করেছিলেন, তবে এর কয়েকটি পাণ্ডুলিপিতে কেবল ১৯ জন রাজার নাম রয়েছে যাদের রাজত্বকাল ৪৪৮ বছর অবধি পর্যন্ত। বায়ু পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে যে সেখানে ৩০ অন্ধ্র রাজা ছিল, তবে এর বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিগুলির যথাক্রমে কেবলমাত্র ১৭, ১৮ এবং ১৯ রাজার নাম রয়েছে, তাদের রাজত্বকাল উল্লেখ করা হয়েছে ২৭২, ৩০০ এবং ৪১১ বছর। অন্যদিকে, কিছু সাতবাহন রাজা সংখ্যাতাত্ত্বিক প্রমাণ দ্বারা প্রমাণিত যেমন রুদ্র সাতকর্ণি পুরাণে উল্লেখ নেই।

আর. জি. ভান্ডারকার, ডি. সি. সিরিকার এবং এইচ. সি. রায়চৌধুরী মত পণ্ডিতেরা তাত্ত্বিকভাবে বলেছিলেন যে বায়ু পুরাণে কেবল রাজবংশের প্রধান শাখার উল্লেখ করা হয়েছে, আর মৎস্য পুরাণ তার সমস্ত শাখার রাজকুমারকে একত্রিত করেছে। এই নামগুলি হল - ১) সিমুকা, ২) কৃষ্ণ, ৩) প্রথম সাতকর্ণী, ৪) পূর্ণোৎসঙ্গ, ৫) স্কন্দস্তম্ভি, ৬) দ্বিতীয় সাতকর্ণী, ৭) লম্বোদর, ৮) অপিলক, ৯) মেঘস্বাতী, ১০) স্বাতী, ১১) স্কন্দস্বাতী, ১২) মহেন্দ্র সাতকর্ণী, ১৩) কুনতলা সাতকর্ণী, ১৪) তৃতীয় সাতকর্ণী, ১৫) প্রথম পুলমায়ী, ১৬) গৌরা কৃষ্ণ, ১৭) হালা, ১৮) মণ্ডলাকা, ১৯) পুরেন্দ্রসেনা, ২০) সুন্দর সাতকর্ণী, ২১) চক্র সাতকর্ণী, ২২) শিবস্বতী, ২৩) গৌতমীপুত্র সাতকর্ণী, ২৪) বশিষ্ঠীপুত্র দ্বিতীয় পুলমায়ী, ২৫) শিবশ্রী সাতকর্ণী, ২৬) শিবস্কন্দ সাতকর্ণী, ২৭) যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণী, ২৮) বিজয়া সাতকর্ণী, ২৯) চন্দ্রশ্রী সাতকর্ণী, ৩০) তৃতীয় পুলমায়ী।

সিমুক: সাতবাহন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সিমুক। পুরাণের বিবরণ অনুসারে কাণ্ব ও শুঙ্গ বংশকে ধ্বংস করে তিনি নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিদিশা জয় করেছিলেন। জৈন কিংবদন্তি অনুসারে তিনি বৌদ্ধ ও জৈনদের জন্য মন্দির তৈরি করেন। তার রাজত্বের শেষ দিকে তিনি অত্যাচারী হয়ে ওঠেন। এর ফলে তাকে সিংহাসন ও প্রাণ দুইই হারাতে হয়। পুরাণ অনুসারে তিনি ২৩ বছর রাজত্ব করেন। পরবর্তী রাজা ছিলেন সিমুকের ভ্রাতা কৃষ্ণ। তার আমলে সাতবাহন রাজ্যের সীমানা পশ্চিমে নাসিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তার রাজত্বকালে নাসিকে বৌদ্ধ শ্ৰমণদের বসবাসের জন্য একটি গুহা নির্মিত হয়। মৎস পুরাণ অনুসারে তিনি ১৮ বছর রাজত্ব করেন।

প্রথম সাতকর্ণী: সাতবাহন বংশের তৃতীয় রাজা প্রথম সাতকর্ণীর ১০ বছরের রাজত্বকাল সাতবাহন ইতিহাসে এক উল্লেখযােগ্য অধ্যায়। তিনি এই বংশের প্রথম পরাক্রান্ত নরপতি হিসেবে গণ্য হন। তার রাণী নায়নিকা নানাঘাট শিলালিপি থেকে তার সম্পর্কে তথ্যাদি পাওয়া যায়। নর্মদা উপত্যকা, বিদর্ভ ও পশ্চিম মালব জয় করে তিনি সাতবাহনদের গৌরব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেন। মধ্যপ্রদেশের সাঁচি ও সন্নিহিত অঞ্চল এবং কোঙ্কন ও কাথিয়াওয়াড় তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল বলে অনেকে মনে করেন। হস্তিগুম্ফা লিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি কলিঙ্গ-রাজ খারবেল কর্তৃক পরাজিত হন। পশ্চিম মালব জয়ের পর তিনি দুটি অশ্বমেধ ও একটি রাজসূয় যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। তিনি দক্ষিণাপথপতি ও অপ্রতিহতচক্র উপাধি ধারণ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানপুর বা বর্তমান পৈঠানে তার রাজধানী স্থাপন করেন। তার মৃত্যুর পর সাতবাহন সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী শাসকগণের কৃতিত্ব সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না।

গৌতমী পুত্র সাতকর্ণী: প্রথম সাতকর্ণীর মৃত্যুর ১০০ বছর পর গৌতমী পুত্র সাতকর্ণি সিংহাসনে বসেন। গৌতমী পুত্র সাতকর্ণির মৃত্যুর পর তার মা গৌতমী বলশ্রী নাসিক প্রশস্তি রচনা করেন। গৌতমী পুত্র সাতকর্ণি ছিলেন সাতবাহন বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। নাসিক প্রশস্তি-তে তাকে "সাতবাহন-কুল-যশ: প্রতিষ্ঠানকর" এবং "শক-যবন-পহ্লব-নিসুদন" বলা হয়েছে। তিনি মহারাষ্ট্র জয় করেন। যবন ও পহ্লব অর্থ হল যথাক্রমে গ্রীক ও পার্থিয়ান। গৌতমী পুত্র সাতকর্ণি শকদের রাজা নহপানকে পরাজিত করে তিনি গুজরাট, সৌরাষ্ট্র, মালব, বেরার ও উত্তর কোঙ্কন দখল করেন। শকদের অন্য একটি শাখার অধিপতি রুদ্রদামন গৌতমী পুত্র সাতকর্ণিকে পরাজিত করে। শক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তিনি নিজ পুত্র বশিষ্ঠী পুত্র পুলমায়ীর সঙ্গে রুদ্রদামনের কন্যার বিবাহ দেন। নাসিক প্রশস্তিতে গৌতমী পুত্র সাতকর্ণিকে বিন্ধ্য পর্বত থেকে মলয় পর্বত এবং পূর্বঘাট থেকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত স্থানের অধিপতি বলা হয়েছে। গৌতমী পুত্র সাতকর্ণি "বর-বরণ-বিক্রমচারু-বিক্রম" উপাধি ধারণ করেন।

Advertisement
বশিষ্ঠীপুত্র দ্বিতীয় পুলমায়ী: গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর মৃত্যুর পর তার পুত্র বশিষ্ঠীপুত্র দ্বিতীয় পুলমারী সিংহাসনে বসেন। নাসিক, কার্লে, অমরাবতী প্রভৃতি স্থানে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে তাঁর রাজত্বকাল সম্পর্কে জানা যায়। তিনিই সর্বপ্রথম কৃষ্ণা নদীর মােহনা পর্যন্ত অর্থাৎ অন্ধ্রদেশে রাজ্যবিস্তার করেন। আত্মীয়তা সত্ত্বেও শক-রাজা রুদ্রদামনের সঙ্গে তার সংঘর্ষ চলতে থাকে। তিনি দুবার রুদ্রদামনের কাছে পরাজিত হন এবং মালব ও কাথিয়াওয়াড় শক রাজ্যভুক্ত হয়, কিন্তু কেবলমাত্র আত্মীয়তার খাতিরে শক-রাজা তাকে ধ্বংস করেনি।

যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি: বশিষ্ঠীপুত্র দ্বিতীয় পুলমায়ীর পর শিবশ্রী সাতকর্ণি ও শিবস্কন্দ সাতকর্ণি সিংহাসনে বসেন। যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণি ছিলেন সাতবাহন বংশের শেষ উল্লেখযােগ্য রাজা। নাসিক, কানহেরি ও কৃষ্ণা জেলায় তার শিলালিপিগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে। মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্র — দুই স্থানই তার অধিকারভুক্ত ছিল। শক-রাজ রুদ্রদামনের মৃত্যুর পর তিনি শকদের হাত থেকে পশ্চিম ভারত ও নর্মদা উপত্যকা পুনরুদ্ধার করেন। বঙ্গোপসাগর থেকে আরব সাগর পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিল। তিনি সমুদ্রযাত্রা ও ব্যবসা বাণিজ্যে উৎসাহ দিতেন। তার মুদ্রায় জাহাজের চিত্র খােদিত ছিল। তার সামুদ্রিক কার্যকলাপ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের পৃষ্ঠপােষকতার জন্য বাণভট্ট তাকে ত্রিসমুদ্ৰাধিপতি অর্থাৎ তিন সমুদ্রের অধিপতি বলে বর্ণনা করেছেন। ঐতিহাসিক পারগিটার এর মতে তার আমলে পুরাণের সম্পাদনা করা হয়। তিনি দার্শনিক নাগার্জনের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন।

সাতবাহনদের সাম্রাজ্যর পতন

যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণির রাজত্বের শেষ দিকে সাতবাহন রাজ্যর পতন শুরু হয়। যজ্ঞশ্রী সাতকর্ণীর পরবর্তী রাজা বিজয়া সাতকর্ণী ৬ বছর রাজত্ব করেছিল। তাঁর পুত্র চন্দ্রশ্রী সাতকর্ণী ১০ বছর রাজত্ব করেছিল। সাতবাহন বংশের শেষ রাজা ছিলেন তৃতীয় পুলমায়ী। তিনি ৭ বছর রাজত্ব করেন। তাকে বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন নামে উল্লেখ করেছে, যেমন - সুলোমাধী (ভাগবত), পুলোমাভিত (মৎস্য), পুলোমারচিস (বিষ্ণু)। তাঁর রাজত্বকালে নাগারর্জুনাকোন্ডা ও অমরাবতীতে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছিল। মধ্যপ্রদেশ তাঁর রাজ্যের অংশ ছিল। তৃতীয় পুলমায়ীর মৃত্যুর পরে সাতবাহন সাম্রাজ্য পাঁচটি ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত। (১) উত্তর অংশ সমান্তরাল শাখা দ্বারা শাসিত, (২) পশ্চিম অংশ নাসিক অভিরাশ দ্বারা শাসিত, (৩) পূর্ব অংশ কৃষ্ণা-গুন্টুর অঞ্চল অন্ধ্র ইক্ষক্কাস দ্বারা শাসিত, (৪) দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ উত্তর কর্ণাটক, বনভাসীর চুতুস দ্বারা শাসিত, (৫) দক্ষিণ-পূর্ব অংশ পল্লব দ্বারা শাসিত।
Advertisement