চোল বংশের শ্রেষ্ট রাজা প্রথম রাজেন্দ্র চোল

- March 09, 2019
প্রথম রাজেন্দ্র চোল কোদুম্বলুর রাজকন্যা থিরিপুবন মাদেবীয়ার পুত্র। প্রথম রাজেন্দ্র চোল ১০১৪ খ্রিস্টাব্দে পিতার সিংহাসনে বসেন। প্রথম রাজেন্দ্র চোল শৈব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। প্রথম রাজরাজের পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র চোল ছিলেন চোল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি। পিতার জীবদ্দশাতেই রাজপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি রাজ্যশাসন ও যুদ্ধবিদ্যায় বহুমুখী অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সামরিক কৃতিত্বের দিক থেকে তিনি পিতার চেয়েও শ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং তার রাজত্বকালে চোল গৌরব সর্বোচ্চ শিখরে আরােহণ করে। তার উপাধি ছিল মার্তণ্ড, উত্তম চোল ও গঙ্গইকোন্ডচোল। তিরুমালাই পর্বতলিপি ও তাঞ্জোর লিপি থেকে তাঁর কার্যকলাপের বিবরণ পাওয়া যায়।
sculpture Rajendra Chola I
প্রথম রাজেন্দ্র চোলের রাজত্বের পঞ্চম বর্ষের কয়েকটি লেখ থেকে জানা যায়, ১০১৭ খ্রিস্টাব্দে সিংহল রাজ পঞ্চম মহেন্দ্র-কে পরাজিত করে সমগ্র সিংহল জয় করেন। এছাড়া মহাবংশ থেকে সিংহল অভিযানের কথা জানা যায়। মহাবংশে দাবি করা হয় যে চোলরা শ্রীলঙ্কায় বিপুল সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল। রাজার হীরের তৈরি অলংকার চোলরা দখল করে নেয়। এমনকি বৌদ্ধ বিহারগুলিও তাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। মহাবংশ গ্রন্থে চোল সেনাবাহিনীকে রক্তপিপাসু মগ দস্যুদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রথম রাজেন্দ্র চোল সমগ্ৰ সিংহলকে (শ্রীলঙ্কা) চোল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত একটি প্রদেশে পরিণত করেন। তবে চোলরা সমগ্র সিংহলের উপর তাদের নিরঙ্কুশ অধিকার দীর্ঘকাল বজায় রাখতে পারেনি। মহাবংশে দাবি করা হয়েছে যে রাজা পঞ্চম মহেন্দ্রর মৃত্যুর পর তার পুত্র কশ্যপের নেতৃত্বে জাতীয় প্রতিরােধ তৈরি হয় এবং দীর্ঘ যুদ্ধের পর সিংহলের দক্ষিণভাগে তিনি নিজ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। প্রথম বিক্রমবাহু নাম নিয়ে তিনি বারাে বৎসর দক্ষিণ সিংহল শাসন করেন।

প্রথম রাজেন্দ্র চোল তার চতুর্দশ রাজ্যবর্ষে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শৈলেন্দ্র বংশীয় হিন্দু রাজ্য শ্রীবিজয় (কড়ারম্) রাজ্য অর্থাৎ মালব, সুমাত্রা ও জাভায় তার আধিপত্য স্থাপন হয়। চীন-ভারত বানিজ্য হস্তক্ষেপ করে শ্রীবিজয় রাজ্য নিজ সমৃদ্ধি চেষ্টা করলে রাজেন্দ্র চোল যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং শ্রীবিজয়-রাজ সংগ্রাম বিজয়ােতুঙ্গ বর্মনকে পরাজিত করে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য নিরাপদ হয়। শ্রীবিজয় ছিল একটি সামুদ্রিক রাষ্ট্র। মালয় উপদ্বীপ, যবদ্বীপ, সুমাত্রা এবং সন্নিহিত মােবিলিমবনগম, থলৈপ্পনদরু, তলৈটটকোল্লম, মাদমালিঙ্গম প্রভৃতি দ্বীপ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবশ্য বিজিত কোন অঞ্চলকেই তিনি চোল রাজ্যের অঙ্গীভূত করেননি।

পিতা রাজরাজ কর্তৃক বিজিত পান্ড্য ও চের রাজ্য বিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি কঠোর হাতে দমন করেন এবং পান্ড্য ও চের রাজ্যকে চোল রাজ্যর অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি নিজ পুত্রকে রাজ্যদুটির শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এছাড়া প্রথম রাজেন্দ্র চোল কল্যাণীর পশ্চিম চালুক্য রাজ জয়সিংহ এবং বেঙ্গীর পূর্ব চালুক্যদের বিরুদ্ধে একাধিক সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়ে তিনি জয়লাভ করে। তিনি মাস্কির যুদ্ধে জয়সিংহকে পরাজিত করে বেঙ্গীতে বিজয়াদিত্যকে সরিয়ে রাজরাজকে সিংহাসনে বসান। এরপর জয়সিংহকে সাহায্য করার অপরাধে কলিঙ্গ আক্রমণ করে জয় করেন। তিনি ব্রহ্মদেশের কতকাংশ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ জয় করেন।

রাজেন্দ্র চোলের অন্যতম প্রধান কীর্তি হল বাংলা অভিযান। এই অভিযানের কথা জানা যায় তিরুমলয় লেখ থেকে। এই অভিযানের উদ্দেশ্যে ছিল পবিত্র গঙ্গাজল সংগ্রহ করা। তিনি পূর্ববঙ্গের গোবিন্দচন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মহিপাল ও দক্ষিণ বঙ্গের রণসুর-কে পরাজিত করে গঙ্গইকোন্ডচোল বা গঙ্গা-বিজেতা চোল নৃপতি উপাধি ধারণ করেন। বঙ্গ বিজয়ের সামান্য পরেই কাবেরী নদীর তীরে তিনি চোল-দের এক নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার নাম দেন গঙ্গইকোন্ড চোলপুরম। বলা বাহুল্য, বাংলায় তার আধিপত্য স্থায়ী হয় নি। তার নৌশক্তির প্রভাবে বঙ্গোপসাগর চোল হ্রদে পরিণত হয়।

চোল বংশের শ্রেষ্ট নৃপতি প্রথম রাজেন্দ্র চোল অসাধারণ সামরিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। বাংলা জয় ও সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চোল আধিপত্য বিস্তার নি:সন্দেহে তার কীর্তি। চোল নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগর-কে চোল হ্রদে পরিণত করে। গঙ্গইকোন্ড চোলপুরম হল প্রথম রাজেন্দ্র চোলের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের নিদর্শন।