বাংলার মাৎস্যন্যায় যুগ বলতে কী বোঝায়

- March 06, 2019
রাজা শশাঙ্কর ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর পর থেকে পাল বংশের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত সময়ে বাংলার রাজনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান করে। প্রায় সমসাময়িক লিপি, খালিমপুর তাম্রশাসন ও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে পাল বংশের উত্থানের পূর্ববর্তী সময়ের বাংলার নৈরাজ্যকর অবস্থাকে ‘মাৎস্যন্যায়ম্’ বলে উল্লেখ করা হয়।
Matsyanya Age of Bengal
শশাঙ্কের (৬০০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুর পর বাংলায় বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর (৬৪৬/ ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ) পর তাঁর সাম্রাজ্যে নৈরাজ্য ও সংশয় দেখা দিলে, মন্ত্রীরা বলপূর্বক রাজ্য দখল করতে থাকে। আনুমানিক ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এক শতক কালের বেশি সময় ধরে গৌড়ের ইতিহাস অস্পষ্ট ছিল। চৈনিক দূত ওয়াং-হিউয়েন্-সের হঠকারিতায় তিববতের ক্ষমতাধর রাজা শ্রং-ছান-গেমপো বাংলায় পরপর অভিযান পরিচালনা করেন। সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় দুটি নতুন রাজবংশ আত্মপ্রকাশ করে যথা - গৌড় ও মগধ (পশ্চিম বাংলা ও দক্ষিণ বিহার) পরবর্তী গুপ্তগণ এবং বঙ্গ ও সমতট (দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) খড়গ রাজবংশ। কিন্তু এই রাজবংশের কোনোটিই বাংলায় ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি।

খ্রিস্টীয় আট শতকের প্রথমার্ধে বারংবার বৈদেশিক আক্রমণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল কনৌজ রাজ যশোবর্মণের (৭২৫-৭৫২ খ্রিস্টাব্দ) আক্রমণ। গৌড়ের পাঁচ জন রাজা ললিতাদিত্য কর্তৃক পরাজিত হয়েছিলেন বলে কলহন রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থে উল্লেখ করেন। এ থেকে গৌড়ের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে স্থানীয় প্রধানগণ স্বাধীন হয়ে ওঠেন এবং নিজেদের মধ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লড়াই-এ লিপ্ত হয়। বারংবার বৈদেশিক আক্রমণ রাজনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে এবং তাতে বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। ফলে শশাঙ্কের মৃত্যুর পরবর্তী একশ বছর বাংলায় কোনো স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে নি বলা চলে। গোপালের উত্থানের আগে খ্রিস্টীয় আট শতকের মাঝামাঝি সময়ের রাজনৈতিক অবস্থাকে খালিমপুর তাম্রশাসনে মাৎস্যন্যায়ম যুগ বলে উল্লেখ করা হয়। তিব্বতীয় সন্ন্যাসী তারনাথ ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ’ভারতে বৌদ্ধধর্মের জন্ম’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি এই মত সমর্থন করে লিখেছেন: "প্রত্যেক ক্ষত্রিয়, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, ব্রাহ্মণবণিক স্বস্ব গৃহে ছিলেন এক এক জন রাজা, কিন্তু সমগ্র দেশে কোনো রাজা ছিল না।" এর ফলে বঙ্গ দেশের অনেক স্থানে "জোর যার মুল্লুক তার" রীতিতে দেশ চলতে থাকে। ফলে স্থানীয়ভাবে দুর্বলরা সবলদের দ্বারা অত্যাচারিত হতে থাকে।

সংস্কৃত শব্দ মাৎস্যন্যায়ম কৌটিল্যর অর্থশাস্ত্রে শব্দটির বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যখন দন্ডদানের আইন স্থগিত বা অকার্যকর থাকে তখন এমন অরাজকতা অবস্থার সৃষ্টি হয় যা মাছের রাজ্য সম্পর্কে প্রচলিত প্রবচনের মধ্যে পরিস্ফুট। অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত বড় মাছ ছোট মাছকে গ্রাস করে, কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অবর্তমানে সবল দুর্বলকে গ্রাস করবেই। সমসাময়িক পাল লিপিতে অর্থবহ শব্দটির প্রয়োগ করে বাংলার তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো শক্তিশালী শাসন ক্ষমতার অভাবে সম্পূর্ণ অরাজকতা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

উপরোক্ত বিবরণ থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, শশাঙ্কের রাজত্বের পরবর্তী শতকে বাংলায় শাসন খুব অল্প স্থিতিশীল ছিল। বঙ্গ দেশটি অনেক ছোট ছোট রাজ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের পারস্পরিক যুদ্ধ বিগ্রহের ফলে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়। আইন-শৃঙ্খলা বিধানে সক্ষম কোন শক্তির অনুপস্থিতির ফলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাই মাৎস্যন্যায়ম্। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল এই বিশৃঙ্খলা অবস্থায় রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন এবং মাৎস্যন্যায় অবসান ঘটায়।

গোপাল কিভাবে বাংলায় ক্ষমতায় আসেন তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, জনগণ গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন। তিনি কিছু সংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতার সমর্থন লাভ করে রাজা নির্বাচিত হন ও মাৎস্যন্যায়মের অবসান ঘটিয়ে জনসমর্থন লাভ করেন। পাল লিপিতে বলা হয়েছে, গোপাল ‘বেপরোয়া ও স্বেচ্ছাচারী লোকদের পরাভূত করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন’। এই নৈরাজ্যকর অবস্থার সামাজিক দিকগুলি নিরূপণের সহায়ক কোন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। তবে পরোক্ষ তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, শান্তি ও শৃঙ্খলার অভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। আট শতকের পর থেকে তাম্রলিপ্তি বন্দরের প্রাধান্য হ্রাস ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতির ইঙ্গিত বহন করে। মহাস্থানের ধ্বংসস্তূপ থেকে বোঝা যায় যে, পাল আমলের মন্দির ও আশ্রমগুলি নির্মিত হয়েছিল গুপ্তযুগ পূর্ববর্তী ও গুপ্তোত্তর যুগের ধ্বংসস্তুপগুলির উপর। তাই ধারণা করা হয়, নৈরাজ্যের যুগেই ওই ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছিল। সেই নৈরাজ্যের সঙ্গে সম্ভবত পূর্ববর্তী ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটা সম্পর্ক ছিল। শক্তিশালী কোন রাজার অনুপস্থিতিতে সামন্ত প্রভুরা ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম। তারা নৈরাজ্য সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছিল। তাদের মধ্যকার কয়েকজনের বিচক্ষণতার ফলে আইন-কানুনহীন নৈরাজ্য পরিস্থিতির অবসান ঘটে। তারা একত্রিত হয়ে গোপালকে বাংলার শাসন ক্ষমতায় বসায় ও মাৎস্যন্যায়ের বিলুপ্তি ঘটে।
Advertisement