গুর্জর প্রতিহার সাম্রাজ্য।

author photo
- Saturday, March 02, 2019
advertise here

প্রতিহার বংশ।

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে যে শূন্যতা দেখা দেয় তার ফলে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির উথান ঘটে। যে সমস্ত শক্তির উথান ঘটে তাদের মধ্য গুর্জর প্রতিহার (ইংরেজি: Gurjara Pratiharas) বংশ অন্যতম। প্রতিহার বংশ ছিল গুর্জর জাতির একটি শাখা। গুর্জর জাতি হুনদের সঙ্গে ভারতে প্রবেশ করে। আরব লেখক আবু জাইদ বলেন যে, গুর্জর জাতী আরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। কন্নড় লেখক পম্পা মহীপাল-কে গুর্জর বলেছেন। রাষ্ট্রকূট রাজাদের সামন্ত হিসেবে প্রতিহার রাজা কোন রাষ্ট্রকূট রাজার অনুষ্ঠানে যজ্ঞের সময় দ্বারপাল বা প্রতিহার হিসেবে কাজ করেন। তখুন থেকে এদের প্রতিহার উপাধি হয়। হরিচন্দ্র রাজা ছিল প্রতিহার বংশের প্রতিষ্ঠাতা। হরিচন্দ্রের রাজধানী ছিল ভিনমাল।


প্রথম নাগভট্ট:

হরিচন্দ্রের পর প্রথম নাগভট্ট সিন্ধু প্রদেশে থেকে আগত আরব আক্রমণকারীদের পরাজিত করেন। তিনি নন্দীকুনী ও যোধপুর অধিকার করেন। মালব, রাজপুতানা ও গুজরাটের কিছু অংশ দখল করেন। প্রথম নাগভট্টর সময় থেকে উত্তর ভারতে কনৌজকে কেন্দ্র করে ত্রিশক্তি সংঘর্ষ বা ত্রিশক্তির সংগ্রাম বাঁধে।

বৎসরাজ:

বৎসরাজ ছিলেন প্রতিহার বংশের শক্তিশালী রাজা। তিনি বাংলার পাল রাজা ধর্মপাল-কে পরাজিত করেন। তিনি ভান্দি গোষ্ঠীকে পরাজিত করেন। দক্ষিণের রাষ্ট্রকূট রাজ ধ্রুব বৎসরাজকে পরাজিত করে রাজপুতানার মরু অঞ্চলে বিতাড়িত করেন।

দ্বিতীয় নাগভট্ট:

তিনি সিন্ধু, অন্ধ্র, বিদর্ভ ও কলিঙ্গর উপর নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি কনৌজ আক্রমন করে ধর্মপালের প্রতিনিধি চক্রায়াধু-কে পরাজিত করে কনৌজ দখল করেন। তিনি মুঙ্গেরে-র নিকট এক যুদ্ধে ধর্মপাল কে পরাজিত করে। কিন্তু রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় গোবিন্দ তার বাহিনী নিয়ে দ্বিতীয় নাগভট্ট-কে বুন্দেলখন্ডের যুদ্ধে পরাজিত করেন। দ্বিতীয় নাগভট্টর পর তার পুত্র রামভদ্র সিংহাসনে বসেন।



মিহিরভোজ বা প্রথম ভোজ:

মিহিরভোজ ছিলেন প্রতিহার বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা। তিনি বুন্দেলখন্ডে এবং রাজপুতানায় প্রতিহার শক্তি বৃদ্ধি করে। দৌলতপুর তম্রশাসন থেকে জানা যায় তিনি কেন্দ্রীয় এবং রাজপুতানায় আধিপত্য বিস্তার করে। তিনি পাল রাজাদের কাছে পরাজিত হন। ৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নর্মদা পার হয়ে দাক্ষিণাত্য অভিযানের চেষ্টা করলে রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় ধ্রুবর কাছে পরাজিত হন। কিন্তু উজ্জয়নীর যুদ্ধে তিনি রাষ্ট্রকূট রাজা দ্বিতীয় কৃষ্ণকে পরাজিত করেন। তিনি গুজরাট ও মালব অধিকার করেন। প্রথম ভোজের সাম্রাজ্য কাশ্মীর, সিন্ধু, বিহার, বাংলা ও জব্বল্পুরের কলচুরি রাজ্য ব্যতীত সমগ্র উত্তর ভারত জুড়ে ছিল। প্রথম ভোজ তার রাজধানী কনৌজে পরিবর্তন করে। ৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে আরব পর্যটক সুলেমান প্রথম ভোজের রাজধানীতে আসেন। প্রথম ভোজের উপাধি ছিল মিহির এবং আদি বরাহ। ভোজ ছিল বিষ্ণুর উপাসক।

প্রথম মহেন্দ্রপাল:

তিনি পাল বংশের রাজা নারায়ণ পালকে পরাজিত করে মগধ ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ দখল করে নেন। তিনি শিক্ষা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। প্রথম মহেন্দ্রপালের সভাকবি ছিলেন রাজশেখর। রাজশেখর রচিত গ্রন্থগুলি হল কাব্য মীমাংসা, কর্পূর মঞ্জরী, বাল রামায়ণ, বাল ভারত।


মহীপাল:

প্রথম মহেন্দ্রপালের পর তার পুত্র দ্বিতীয় ভোজ সিংহাসনে বসেন। তিনি তার ভ্রাতা মহীপাল কর্তৃক সিংহাসচ্যুত হন। রাজশেখর তাকে আর্যাবর্তের মহারাজাধীরাজ বলে অভিহিত করেন। রাষ্ট্রকূট রাজ তৃতীয় ইন্দ্র মহীপাল-কে পরাজিত করে কনৌজ দখল করে নেন। আরব পর্যটক আল মাসুদি ৯১৫-৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আসেন। তার রচনা থেকে প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট দ্বন্দ্বের বিবরণ পাওয়া যায়।

মহীপালের পর দ্বিতীয় মহেন্দ্রপাল সিংহাসনে বসেন। এরপর দেবপালের সময় বুন্দেলখন্ডের চান্দেল্ল বংশ কার্যত স্বাধীন হয়ে যায়। এরপর সিংহাসনে বসেন বিজয়পাল। পরবর্তী রাজা রাজ্যপালের সময় ১০১৮ খ্রিস্টাব্দে সুলতান মামুদ কনৌজ আক্রমণ করলে প্রতিহার বংশের পতন শুরু হয়। চান্দেল্ল আক্রমণে রাজ্যপাল নিহত হন। প্রতিহার বংশের শেষ সম্রাট ছিলেন যশপাল। ১০৩৬ খ্রিস্টাব্দে লিখিত তার শিলালিপি পাওয়া গেছে।
Advertisement advertise here