গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাস

- March 16, 2019
প্রত্নতত্ত্ববিদ জন মার্শাল তার 'A Guide to Taxila' গ্রন্থে বলেছেন যে কুষাণ ও অন্ধ্র সাতবাহন রাজবংশের বিলুপ্তি এবং সাম্রাজ্য স্থাপনকারী গুপ্ত রাজবংশের উথানের মধ্যবর্তী কাল হল 'অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ'। সমগ্র ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য গঠনের স্বপ্ন ভারতীয় শক্তিগুলি মৌর্য যুগ থেকে লক্ষ করে আসছিল। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে প্রায় পাঁচশাে বছর ভারতবর্ষ ছিল একপ্রক নাবিকহীন নৌকার মতাে। তখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাকট্রিয় গ্রিক, শক ও কুষাণদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে অগণিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে পরিণত হয় ভারতবর্ষ। তারপর কুষাণ বংশের রাজত্ব শুরু হয় আনুমানিক ১৫ থেকে ৬৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। ঐতিহাসিকদের মতে, ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনিষ্ক রাজদণ্ড দৃঢ় হস্তে ধারণ করে ভারতবর্ষের উত্তর কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে সাচি এবং পূর্বে বারাণসী থেকে পশ্চিমে সিন্ধু নদ পর্যন্ত ভূভাগকে এক ছত্রতলে আনয়ন করেন। এদিকে ভারতবর্ষের দক্ষিণ অংশ অর্থাৎ সমগ্র দাক্ষিণাত্যসহ মধ্যভারতের একাংশও দখলে রাখেন সাতবাহন রাজারা। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে প্রায় তিনশাে বছর এই সাতবাহন বংশ ভারতের দক্ষিণ অংশে তাদের রাজকীয় প্রতিপত্তি বজায় রাখেন। কুষাণ ও সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণে ভারত আবার খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ে। তারপর ধীরে ধীরে মগধকে কেন্দ্র করে আর্যাবর্তের সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলে এক রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন গুপ্ত রাজবংশ।
Gupta Empire 320-600
গুপ্তদের উৎপত্তি ও বাসস্থান: গুপ্ত ও সাতবাহন আমলে গুপ্ত উপাধিধারী একাধিক আমলার উল্লেখ পাওয়া যায়। গুপ্ত রাজবংশের সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক ছিল কিনা তা বলা সম্ভব নয়। গুপ্তরা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য কোন বর্ণের লােক ছিলেন সম্পর্কেও নিঃসন্দেহে কিছু বলা সম্ভব নয়। অধিকাংশ পণ্ডিতই অবশ্য মনে করেন যে, তারা বৈশ্য ছিলেন তবে রাজত্ব করতেন বলে তারা ক্ষত্রিয়ত্ব দাবি করতে থাকেন। তাদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে পণ্ডিতরা একমত নন। চৈনিক পরিব্রাজক ইৎ-সিং এর বিবরণের উপর ভিত্তি করে ডঃ ডি. সি. গাঙ্গুলী ও ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল নালন্দার পূর্বদিকে অর্থাৎ বাংলার বরেন্দ্রভূমি বা মালদহে। বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ ও ভাগবতপুরাণ এর উপর ভিত্তিকরে অনেকে মগধকে তাদের আদি বাসস্থান বলে চিহ্নিত করেছেন। ডঃ এস. আর. গয়াল বলেন যে, গুপ্ত রাজাদের অধিকাংশ মুদ্রাই পাওয়া গেছে উত্তরপ্রদেশে। এ কারণে তার মতে উত্তরপ্রদেশই হল তাদের আদি বাসস্থান।

গুপ্ত রাজবংশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীগুপ্ত। এরপর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র ঘটোৎকচ (৩১৯-৩২০ খ্রিস্টাব্দ)। অনুমান করা হয় ৩২০ থেকে ৩৩৫ খ্রিস্টাব্দ সময়কাল থেকে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র সমুদ্রগুপ্ত সিংহাসন আরােহণ করেই দৃঢ়হস্তে রাজদণ্ড তুলে নেন। এবং তার অসামান্য সামরিক প্রতিভা দিয়ে এক সুবিশাল গৌরবােজ্জ্বল সাম্রাজ্য গড়ে তােলেন। সমুদ্রগুপ্ত উত্তর ভারতের ৯ জন রাজাকে পরাজিত করে আর্যাবর্তের উপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণ ভারত অভিযান করে তিনি দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের ১২ জন রাজাকে বশীভূত করেন। এবং কুটনৈতিক কৌশলে ওই বারােজন রাজাকে নিজের অনুগত করে করদ রাজ্যে পরিণত করেন। কোনাে কোনাে রাজার কন্যাকেও বিবাহ করে তিনি তার রাজ্যকে দৃঢ়বদ্ধ রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ভালােই বুঝেছিলেন যে, উত্তর ভারতে থেকে দক্ষিণাঞ্চল শাসন করা সম্ভব নয়।

সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তার পুত্র রামগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। রামগুপ্ত শক রাজার কাছে পরাজিত হন। এবং তার মহিষী ধ্রুবা দেবীকে শকরাজার হাতে তুলে দেন। এতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ক্রুধ হয়ে শকরাজ ও নিজ ভাই রামগুপ্তকে হত্যা করে ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। বিদেশি শকরাজ দ্বিতীয় রুদ্রসেনকে দমন করে ভারতের পশ্চিম অংশ দখল করেন। সমুদ্রগুপ্ত এবং তাঁর পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বাংলা সহ অসংখ্য অঞ্চল নিজেদের করায়ত্ত করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বের শেষ দিকে মধ্য এশিয়া থেকে আগত হুন শক্তি গুপ্তদের অস্তিত্বকে প্রায় বিপন্ন করে তােলে। স্কন্দগুপ্ত দঘিদিন তার বাহুবলে এই দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর হুন শক্তিকে দমন করে রাখলে ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যুর পর থেকেই গুপ্ত সাম্রাজ্যের অবসান সূচনা হয়।

গুপ্ত রাজাদের তালিকা: ১) শ্রীগুপ্ত, ২) ঘটোৎকচ, ৩) প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, ৪) সমুদ্রগুপ্ত, ৫) রামগুপ্ত, ৬) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, ৭) প্রথম কুমারগুপ্ত, ৮) স্কন্দগুপ্ত, ৯) পুরুগুপ্ত, ১০) প্রথম কুমারগুপ্ত দ্বিতীয়, ১১) বুধগুপ্ত, ১২) নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য, ১৩) প্রথম কুমারগুপ্ত তৃতীয়, ১৪) বিষ্ণুগুপ্ত, ১৫) বৈনগুপ্ত, ১৬) ভানুগুপ্ত।

গুপ্ত যুগের মুদ্রা: আজ পর্যন্ত গুপ্ত যুগের ১৬ টি মুদ্রা পাওয়া গেছে। এযুগে প্রচলিত স্বর্ণ, রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রাগুলি আর্থিক উন্নয়ন বিশেষত বাণিজ্যিক প্রয়ােজনে ব্যবহৃত হত। প্রথমদিককার গুপ্তমুদ্রায় কুষাণ প্রভাব থাকলেও মুদ্রাগুলি থেকে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি, আর্থিক উৎকর্ষতা, বৈদেশিক বাণিজ্য ও গুপ্তরাজাদের ধর্ম সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। বাংলার যশোরের মহম্মদপুরে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, প্রথম কুমারগুপ্ত এবং স্কন্ধগুপ্তের কিছু রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া যায়। চন্দ্রকেতুগড়-এ স্কন্ধগুপ্তের একটি রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে।

গুপ্ত যুগের শিল্পকলা: স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা ও ধাতুশিল্পের অপরূপ অভিব্যক্তি গুপ্তযুগে লক্ষিত হয়েছিল। গুপ্তযুগের ভাস্কর্যকে ভারতের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য বলা যেতে পারে। সারনাথে প্রাপ্ত ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ, মথুরায় প্রাপ্ত দণ্ডায়মান বুদ্ধ, সুলতানগঞ্জে প্রাপ্ত বুদ্ধের তাম্রমূর্তি বৌদ্ধ ভাস্কর্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। ভারতের কতকগুলি শ্রেষ্ঠ শিবমূর্তি এ যুগে নির্মিত হয়েছিল। পৌরাণিক আখ্যান অবলম্বনে রাম, কৃষ্ণ, শিব প্রভৃতি দেবতাদের মুর্তি গঠন এ যুগের ভাস্কর্যশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। গুপ্ত যুগের স্থাপত্য শিল্পের অধিকাংশ নিদর্শন মুসলমান আক্রমণের ফলে নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু উত্তর প্রদেশে অবস্থিত দেওগড়ের দশাবতার প্রস্তরনির্মিত মন্দির, গুপ্তযুগের স্থাপত্য শিল্পের চরম উৎকর্ষের সাক্ষ্য বহন করছে। গুপ্তযুগে ভারতীয় চিত্রশিল্পের অপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল। বিখ্যাত অজন্তা গুহাগাত্রের চিত্রাবলির অধিকাংশ গুপ্তযুগের অবদান। অজন্তা সত্যই ভারতের শিল্পতীর্থ। অজন্তার গুহাচিত্রগুলিতে সমাজের প্রতিটি নরনারীর জীবনের প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত রয়েছে। বুদ্ধের জীবনী অবলম্বনে বহু চিত্তাকর্ষক প্রাচীর চিত্রগুলি পরিকল্পনায়, বর্ণ সুষমায় আজও বিশ্বের বিস্ময় উৎপাদন করে। গুপ্তযুগে ধাতব শিল্পেরও অসামান্য বিকাশ ঘটেছিল। দিল্লিতে কুতুবমিনারের নিকট চন্দ্ৰরাজের লৌহস্তম্ভ এ যুগের ধাতবশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। দেড় হাজার বছর কেটে গেলেও ওই স্তম্ভটির লােহায় একটুও মরচে ধরেনি, মসৃণতাও কিছুমাত্র ক্ষুন্ন হয়নি। নালন্দায় প্রাপ্ত বুদ্ধের তাম্নমুর্তি ও সুলতানগঞ্জে প্রাপ্ত বুদ্ধের অপর একটি মূর্তি এ যুগের ধাতবশিল্পের চরম উৎকর্ষ বহন করে। গুপ্তযুগের মুদ্রাগুলি থেকে সে যুগের রাজাদের মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

গুপ্ত যুগের ধর্ম: ধর্মের ক্ষেত্রেও গুপ্তযুগে বিশেষ উন্নতি লক্ষ করা যায়। গুপ্তরাজাগণ বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন, অনেক ঐতিহাসিক এই মত পােষণ করেন। গুপ্তরাজাগণের মুদ্রায় বিপত্নী লক্ষ্মীর প্রতিচ্ছবি, বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের প্রতিচ্ছবি ও স্কন্দগুপ্তের জুনাগড় লিপিতে বিষ্ণুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রভৃতিতে তা প্রমাণিত হয়। আবার কতকগুলি মুদ্রায় শিবের বাহন বৃষের প্রতিচ্ছবিও দেখা যায়। এতে প্রমাণিত হয় যে তারা শিবেরও উপাসক ছিলেন। আবার কিছু মুদ্রায় ও লিপিতে পার্বতী ও কার্তিকেয় প্রভৃতি দেবদেবীর প্রতিচ্ছবি অঙ্কিত দেখা যায়। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, গুপ্তরাজগণ বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবীর উপাসক ছিলেন। গুপ্তযুগে পৌরাণিক বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সূর্য প্রভৃতি দেবদেবীর পূজা প্রচলিত হয়েছিল। এ যুগে ভক্তিমূলক ধর্ম প্রাধান্য লাভ করেছিল। এ যুগে শৈবধর্ম ও ভাগবত ধর্ম উভয়ই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। যুদ্ধযাত্রাকালে গুপ্তরাজাগণ শক্তিপূজা করতেন এরূপ বহু উল্লেখ আছে। গুপ্তরাজগণ সকল ধর্মের প্রতি উদার ও সহিষ্ণু ছিলেন। তারা ব্রাক্ষ্মণ্য ধর্মাবলম্বী হয়েও সকল ধর্মের প্রতি উদার মনােভাব পােষণ করতেন। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সদ্ভাব ও সম্প্রীতি বজায় ছিল। এ সময় ভারতের বৌদ্ধধর্মও জনপ্রিয় ছিল। দেশের শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যেই দেশ ও জাতি স্মরণীয় হয়ে থাকে। গুপ্তযুগের শিল্প, স্থাপত্য, দর্শন ও সাহিত্যের মধ্যেই গৌরবময় অতীত ভারতবর্ষে চিরন্তন হয়ে আছে।

গুপ্তযুগ ভারত ইতিহাসে সুবর্ণ যুগ: অনেক ঐতিহাসিক প্রাচীন ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই দুই শতাব্দীর অধিককাল স্থায়ী শাসনকালকে স্বর্ণ যুগ এবং হিন্দু নবজাগরণের যুগ নামে অভিহিত করেছেন। এ যুগের সর্বতােমুখী গরিনার কথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত আছে। শিক্ষা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প, ধর্ম, বাণিজ্যের বিস্তার সর্ববিধ ক্ষেত্রে তখন যেন নতুন জীবনের জোয়ার প্রবাহিত হয়েছিল। সেজন্য গুপ্তযুগকে ভারত ইতিহাসে সুবর্ণ যুগ বলে অভিহিত করা হয়। ঐতিহাসিক ৰার্নেট গুপ্তযুগকে এথেন্সের পেরিক্লিসের যুগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঐতিহাসিক স্মিথ গুপ্তযুগকে ইংল্যান্ডের এলিজাবেথ যুগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে পেরিক্লিসের সময় প্রাচীন গ্রিসে এথেন্স নগর রাষ্ট্রের স্বর্ণযুগ বলে খ্যাতি আছে। পেরিক্লিসের যুগে গ্রিস যেমন শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞান-ধর্ম-বাণিজ্য প্রভৃতি জীবনের সর্বক্ষেত্রে উন্নতি ও সমৃদ্ধির শীর্ষদেশে উন্নীত হয়েছিল, তেমনটি গুপ্তযুগেও ঘটেছিল। শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, ধর্ম, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, সংগীত, বাণিজ্য বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন প্রভৃতি গুপ্তযুগের বহুমুখী কৃতিত্বের কথা আলােচনা করে ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে গুপ্তযুগকে সবচেয়ে গৌরবমণ্ডিত যুগ বলে অভিহিত করা হয়।

গুপ্ত যুগের সাহিত্য: গুপ্তযুগ প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। গুপ্তযুগে সংস্কৃত সাহিত্যের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল। গুপ্ত রাজাদের আনুকূল্যে এ সময় সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের অসাধারণ উন্নতি দেখা যায়। সমুদ্রগুপ্ত স্বয়ং কবি ছিলেন, তার উপাধি ছিল কবিরাজ। তার সভাকবি হরিষেন এলাহাবাদ প্রশস্তি রচনা করে কবিপ্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত এবং কিংবদন্তির বিক্রমাদিত্য একই ব্যক্তি ছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী বীরসেনেরও কবিখ্যাতি ছিল। এ যুগে মহাকবি কালিদাস রচনা করেন মেঘদূত, রঘুবংশ, কুমারসম্ভব, ঋতুসংহার প্রভৃতি কাব্য, অভিজ্ঞানশকুন্তলম, মালবিকাগিমিত্রম প্রভৃতি নাটক রচনা করে সংস্কৃত সাহিত্যকে অমরত্ব দান করেছেন। এগুলি হল বিশ্ব সাহিত্যের অক্ষয় অমূল্য সম্পদ। মৃচ্ছকটিক নাটকের রচয়িতা শূদ্রক, মুদ্রারাক্ষস নাটকের রচয়িতা বিশাখদত্ত , অমরকোষ নামক বিখ্যাত অভিধানের লেখক অমরসিংহ, পঞ্চতন্ত্র নামক গল্পগুচ্ছের রচয়িতা বিষ্ণুশর্মা প্রমুখ ছিলেন গুপ্তযুগের অলংকার। বৌদ্ধদর্শনের উজ্জ্বলতম রত্ন অসঙ্গ ও বসুবন্ধু নামক ভ্রাতৃদ্বয় গুপ্তযুগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। এ যুগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন কবি ভবভূতি, বৈয়াকরণ ভর্তৃহরি, দার্শনিক কুমারিল ভট্ট, গৌড়পাদ, ভারবি প্রমুখ বিশ্ববন্দিত মনীষীগণ। হিন্দুদের দুটি শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত এ যুগে নতুন করে সংকলিত হয়ে বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করে বলে অনেকেই অনুমান করেন। পরাশর, মনুস্মৃতি ইত্যাদি ধর্মশাস্ত্র গুপ্তযুগে পূর্ণরূপ পরিগ্রহ করে। পুরাণ গ্রন্থসমূহ এ সময় পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হয়। ইংল্যান্ডের ইতিহাসে রানি এলিজাবেথের যুগ যেমন ইংরেজি সাহিত্যের এক সমৃদ্ধির যুগ, তেমনি ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে গুপ্তযুগও এক চরম উৎকর্ষের যুগ।

গুপ্ত যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুপ্তযুগ ভারতে এক গৌরবময় আসন লাভ করেছিল। এ যুগের বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে গর্গ, পাটলিপুত্রের প্রসিদ্ধ গণিত শাস্ত্রবিদ আর্যভট্ট, মালবের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত প্রমুখের নাম বিশেষ উল্লেখযােগ্য। আর্যভট্ট সূর্যসিদ্ধান্ত নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতি নির্ণয় করে প্রচার করেন। বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতা ও পঞ্চসিদ্ধান্ত নামক জ্যোতিষ গ্রন্থসমূহ বিজ্ঞান জগতের অমূল্য সম্পদ। ব্রহ্মগুপ্ত মাধ্যাকর্ষণ বিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছিলেন। এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা, দশমিক পদ্ধতি, ঘনমূল, বর্গমূল, শুন্য সংখ্যার সাহায্যে সমস্ত অঙ্ক লেখা প্রভৃতি এ যুগে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিদ্যা শাস্ত্রে ভারত ছিল গ্রিক ও আরবদের গুরু। গুপ্তযুগে এ শাস্ত্রের বহু উন্নতি হয়েছিল। ঔষধ প্রয়ােগের সঙ্গে সঙ্গে রােগ বিশেষে শল্যচিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের ব্যবহার এ যুগের চিকিৎসকরা জানতেন। পশু চিকিৎসার জন্য রসায়নশাস্ত্রে নাগার্জুনের মতাে প্রতিভার সাক্ষাৎ গুপ্ত যুগেই মিলেছিল। চিকিৎসক রূপে ধন্বন্তরির যশ ভারতে আজও অনন্য।

গুপ্তযুগ হিন্দুধর্মের নবজাগরণের যুগ: ঐতিহাসিকগণ গুপ্তযুগকে ভারতবর্ষের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ ও হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির নবজাগরণের যুগ নামে অভিহিত করেছেন। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এ যুগে বৌদ্ধধর্মের অবনতি ঘটে এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়। গুপ্তরাজগণ ছিলেন হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির পরম পৃষ্ঠপােষক। গুপ্ত রাজাদের পৃষ্ঠপােষকতায় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম নতুন শক্তি ও নতুন প্রেরণা লাভ করে। শুধু বৌদ্ধধর্ম নয়, জৈন ধর্মের প্রভাবও দ্রুত হ্রাস পায়। গুপ্ত রাজন্যবর্গের সহায়তায় সংস্কৃত ভাষা নতুন প্রাণশক্তি পায়। ব্রাহ্মণদের উদ্যোগে তৎকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রয়ােজন অনুসারে পুরাণে সংস্কার সাধিত হয়। গুপ্তযুগের হিন্দু দেবদেবীর রূপ কল্পনাতে এত সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল। রামায়ণ ও মহাভারতের সংস্কার ও নবতর প্রচলন এ যুগের বৈশিষ্ট্য। শিল্প এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ভারতীয় ঐতিহ্যের নবজাগরণ ঘটেছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তিমার্গের প্রাবল্য, সংস্কৃতি ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ও সমৃদ্ধি, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অবনতি, বৈদিক জীবন চর্চার নতুন পর্যায় প্রভৃতি লক্ষ করে এই যুগকে হিন্দু রেনেসাঁস বা নবজাগরণের কাল বলে অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাদের মত পরিপূর্ণভাবে গ্রহণযােগ্য নয়। কারণ গুপ্তযুগ ধর্মীয় সম্পূর্ণতা বা বিকাশের যুগ, পুনর্জাগরণের যুগ নয়। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকেই হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের সূচনা হয় এবং গুপ্তযুগে তা চরম পরিণতি লাভ করে। গুপ্তযুগ হিন্দুধর্মের রেনেসাঁস নয়, পরিণতি ও দীপ্তির যুগ। গুপ্তযুগকে হিন্দু রেনেসাঁসের গৌরবকাল বলে এককভাবে চিহ্নিত করা যায় না। কারণ গুপ্তযুগ শুরু হওয়ার বহু পূবেই হিন্দু সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছিল। গুপ্তরাজগণ হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির পরম পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। ফলে ব্রাহ্মণ্য হিন্দুধর্ম শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাই গুপ্তযুগকে হিন্দুধর্মের পুনর্জন্মের যুগ না বলে যদি হিন্দুধর্ম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নবজাগরণের যুগ বলা যায় তাহলে যুক্তিযুক্ত হয়। গুপ্তযুগে শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে সঞ্চারিত হয়েছিল বিপুল প্রাণবন্যা। গুপ্ত যুগ ভারত ইতিহাসে শিল্প, সংস্কৃতি, ব্যবসাবাণিজ্য, সাহিত্য, কাব্য, বিজ্ঞান ইত্যাদি নানা দিক থেকেই সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।

গুপ্ত শাসনব্যবস্থা: (মূল প্রবন্ধ - গুপ্ত যুগের শাসব্যবস্থা) গুপ্ত শাসব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সকলের শীর্ষে। রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক। রাজাকে সাহায্য করতেন মন্ত্রী, যুবরাজ ও কর্মচারী। এছাড়া যুবরাজ সামরিক ও বেসামরিক বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করত। শাসব্যবস্থাকে পরিচালনার জন্য সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল। আবার প্রদেশগুলিকে জেলায় বিভক্ত করা হয়েছিল। জেলার শাসনের দায়িত্ব ছিল বিষয়পতির উপর। বিষয়পতিদের সাহায্য করার জন্য প্রত্যেক জেলায় পুরোগ থাকতো। গ্রাম ছিল শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তর। গ্রামের শাসনভার ছিল গ্রামিক নামক কর্মচারীর উপর ন্যস্ত। বিচার বিভাগের প্রধান ছিল রাজা। গ্রামে পঞ্চায়েত বিচার করত। গুপ্ত যুগের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি। তবে জমির মালিক কে ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। গুপ্ত রাজাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল না।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন: (মূল প্রবন্ধ - গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কারণ) স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। গুপ্ত পরবর্তী শাসকগণ অযোগ্য ও হীনবল ছিল। এমনকি রাজপরিবারের মধ্য সিংহাসন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। স্কন্দগুপ্তর মৃত্যুর পর তার ভ্রাতা পুরুগুপ্ত (৪৬৭-৪৭৩ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। পুরুগুপ্তের দুই পুত্র ছিল বুধগুপ্ত এবং নরসিংহগুপ্ত। পুরুগুপ্তের পর তার পৌত্র দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত (৪৭৩-৪৭৭ খ্রি:) সিংহাসনে বসেন। দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের পর সিংহাসনে বসেন বুধগুপ্ত (৪৭৭-৪৯৫ খ্রি:)। দামোদরপুর, এরণ, সারনাথ ইত্যাদি স্থানে বুধগুপ্তের শিলালিপি পাওয়া যায়। বুধগুপ্তের পর সিংহাসনে বসেন নরসিংহগুপ্ত (৪৯৫-৫৩০ খ্রিস্টাব্দ)। এরপর আরও দুজন গুপ্ত রাজার নাম পাওয়া যায় তারা হলেন মালবের ভানুগুপ্ত ও বাংলার বৈনগুপ্ত। বাংলায় বৈনগুপ্তকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন বুধগুপ্ত। তিনি ৫০৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। গুপ্ত বংশের শেষ রাজা ছিলেন বিষ্ণুগুপ্ত। ৪৮০ খ্রিস্টাব্দে তোরমান ও মিহিরকুলের নেতৃত্বে হুন আক্রমণ ঘটে। গুপ্তদের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও তারা হুনদের প্রতিরোধ করে চলেছিল। হুন আক্রমণকারী তোরমান ৫১০ সালে ভানুগুপ্তের কাছে পরাজিত হন। এই আক্রমণের ফলে গুপ্তরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মালবের যশোধর্মন নামে প্রাদেশিক শাসকের উৎপত্তি হয়। ৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে যশোধর্মন হুনদের পরাজিত করে ভারত থেকে বিতাড়িত করে। এছাড়া বিভিন্ন সামন্ত রাজারা একে একে স্বাধীনতা ঘোষণা করে।