গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাস

author photo
- Saturday, March 16, 2019
advertise here

গুপ্ত বংশের ইতিহাস।

প্রত্নতত্ত্ববিদ জন মার্শাল তার 'A Guide to Taxila' গ্রন্থে বলেছেন যে কুষাণ ও অন্ধ্র সাতবাহন রাজবংশের বিলুপ্তি এবং সাম্রাজ্য স্থাপনকারী গুপ্ত রাজবংশের উথানের মধ্যবর্তী কাল হল 'অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ'। দীর্ঘ ১০০ বছরের রাজনৈতিক অনৈক্যর পর গুপ্তযুগে উত্তর ভারতে এক বিশাল অংশে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করে, যা প্রায় দুই শতাব্দী স্থায়ী ছিল।

গুপ্তদের উৎপত্তি ও বাসস্থান:

অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন গুপ্তরা বৈশ্য ছিল। গুপ্তদের আদি বাসস্থান সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। ড: গয়াল বলেন, গুপ্ত রাজাদের অধিকাংশ মুদ্রা পাওয়া গেছে উত্তরপ্রদেশে এই কারণে তার মতে উত্তরপ্রদেশেই হল গুপ্তদের আদি বাসস্থান। বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ ও ভাগবতপুরাণ এর উপর ভিত্তি করে অনেকে বিহারের মগধ-কে গুপ্তদের আদি বাসস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। চৈনিক পরিব্রাজক ই-সিং এর বিবরণের উপর ভিত্তি করে রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন, গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল পূর্ব ভারতে বাংলার মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলা।

গুপ্ত বংশের প্রথম তিন জন রাজা হলেন মহারাজা শ্রীগুপ্ত(২৭৫-৩০০), মহারাজা ঘটোৎকচগুপ্ত(৩১৯-৩২০) ও মহারাজাধিরাজ প্রথম চন্দ্রগুপ্ত। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত বংশের প্রথম সার্বভৌম রাজা। চৈনিক পরিব্রাজক ই-সিং বিবরণ থেকে জানা যায়, তার ভারত পরিভ্রমনের ৫০০ বছর পূর্বে মহারাজা শ্রীগুপ্ত এক চৈনিক ধর্ম যাজকের জন্যে নালন্দায় ২৪০ মাইল পূর্ব দিকে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এটি চীনের মন্দির নামে পরিচিত। বিহার ও বাংলায় কিছু অংশ নিয়ে শ্রীগুপ্তের রাজ্য গঠিত ছিল।

গুপ্ত বংশের তালিকা:
শ্রীগুপ্ত, ঘটোৎকচগুপ্ত, প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত, রামগুপ্ত, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, প্রথম কুমারগুপ্ত, স্কন্দগুপ্ত, পুরুগুপ্ত, প্রথম কুমারগুপ্ত দ্বিতীয়, বুধগুপ্ত, নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য, প্রথম কুমারগুপ্ত তৃতীয়, বিষ্ণুগুপ্ত, বৈনগুপ্ত ও ভানুগুপ্ত।

প্রথম চন্দ্রগুপ্ত:
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ( আ: ৩২০-৩৩৫ খ্রি:) ছিল গুপ্ত বংশের প্রকৃত স্থাপিত। তিনি ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩২০ খ্রিষ্টাব্দে গুপ্তাব্দ নামে একটি অব্দ প্রচলন করেন। তিনি বৈশালীর লিচ্ছিবি বংশিয় রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করে শক্তি ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেন। প্রথম চন্দ্রগুপ্তের সময় মগধের রাজা ছিলেন সুন্দরবর্মন। এই বিবাহ ছিল গুরত্বপূর্ণ - গুপ্ত বংশের গৌরব ও মর্যাদা বৃদ্ধি প্যায়েছিল। বিহারের দক্ষিণাংশ লৌহ খনিগুলির উপর গুপ্তদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথম চন্দ্রগুপ্ত তার স্বর্ণমুদ্রার একদিকে নিজেকে ও তার মহিষী কুমারদেবীর প্রতিকৃতি এবং অপরদিকে সিংহাসনে উপবিষ্ট লক্ষ্মীর মূর্তি খোদায় করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি সমুদ্রগুপ্তকে উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করেন।

সমুদ্রগুপ্ত:
সমুদ্রগুপ্ত সম্পর্কে জানার জন্যে ক্লিক করুন (সমুদ্র গুপ্তের পরিচয়)।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত:
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে জানার জন্যে ক্লিক করুন ()।

প্রথম কুমারগুপ্ত:
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তার পত্নী ধ্রুবদেবীর পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত ৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। প্রথম কুমারগুপ্তের স্ত্রীর নাম ছিল অনন্তদেবী। প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য পূর্বে উত্তরবঙ্গ থেকে পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র এবং উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে নর্মদা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রথম কুমারগুপ্তের পুত্র ছিল স্কন্দগুপ্ত ও পুরুগুপ্ত। প্রথম কুমারগুপ্ত হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। প্রথম কুমারগুপ্তের আমলে সবচেয়ে বেশি পরিমানে লেখ উৎকীর্ণ করা হয়।

প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বকালের অন্তিম পর্বে পুষ্যমিত্র নামে এক উপজাতি গুপ্ত সাম্রাজ্য আক্রমণ করে। তাদের নেতা ছিলেন নরেন্দ্র সেন। প্রথম কুমারগুপ্তের উপাধি ছিল মহেন্দ্রদিত্য। প্রথম কুমারগুপ্ত অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। তিনি শিব ও কার্তিকের উপাসক ছিলেন। তিনি নিজেকে পরম ভাগবত বলে উল্লেখ করেন। তার আমলে কার্তিকেয়র মন্দির, জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ মন্দির, সূর্য মন্দির নির্মিত হয়।

স্কন্দগুপ্ত:
পিতা প্রথম কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫-৪৬৭ খ্রি:) বিক্রমাদিত্য নিয়ে সিংহাসনে বসেন। স্কন্দগুপ্ত দ্বারা খোদিত ভিটারি স্তম্ভলিপি থেকে তার সম্পর্কে জানা যায়। এছাড়া সোমদেব ভট্টর 'কথাসরিৎসাগর' থেকে তার সম্পর্কে জানা যায়।

স্কন্দগুপ্ত হুন আক্রমণ প্রতিহত করেন। এই সময় মধ্য এশিয়া থেকে আগত নিষ্ঠুর ও দুর্ধর্ষ হুনদের একটি শাখা হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রম করে গন্ধারে প্রবেশ করে। হুনদের পরাজিত করার জন্যে ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার স্কন্দগুপ্ত-কে 'ভারতের রক্ষাকর্তা' বলেছেন। উত্তরপ্রদেশের গাজীপুরে প্রাপ্ত তারিখবিহীন ভিটারি স্তম্ভলেখ থেকে একথা জানা যায়। স্কন্দগুপ্ত ছিল গুপ্ত বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জুনাগড় লিপি থেকে জানা যায় স্কন্দগুপ্ত সৌরাষ্ট্রের সুদর্শন হ্রদ সংস্কার করেন।

গুপ্ত পরবর্তী উত্তরাধিকারী:
স্কন্দগুপ্তর মৃত্যুর পর তার ভ্রাতা পুরুগুপ্ত (৪৬৭-৪৭৩ খ্রি:) সিংহাসনে বসেন। পুরুগুপ্তের দুই পুত্র ছিল বুধগুপ্ত এবং নরসিংহগুপ্ত। পুরুগুপ্তের পর তার পৌত্র দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত (৪৭৩-৪৭৭ খ্রি:) সিংহাসনে বসেন। দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের পর সিংহাসনে বসেন বুধগুপ্ত (৪৭৭-৪৯৫ খ্রি:)। দামোদরপুর, এরণ, সারনাথ ইত্যাদি স্থানে বুধগুপ্তের শিলালিপি পাওয়া যায়। বুধগুপ্তের পর সিংহাসনে বসেন নরসিংহগুপ্ত। এরপর আরও দুজন গুপ্ত রাজার নাম পাওয়া যায় তারা হলেন মালবের ভানুগুপ্ত ও বাংলার বৈনগুপ্ত। বাংলায় বৈনগুপ্তকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন বুধগুপ্ত। তিনি ৫০৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। গুপ্ত বংশের শেষ রাজা ছিলেন বিষ্ণুগুপ্ত বা দ্বিতীয় জীবিত গুপ্ত। তোরমান ও মিহিরকুলের নেতৃত্বে হুন আক্রমণ গুপ্ত সাম্রাজ্যর পতন ঘটে।

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা:

গুপ্ত সাম্রাজ্যর পতন:
Advertisement advertise here