PayPal

গুপ্ত শাসনের ইতিহাস।

author photo
- Friday, March 15, 2019

গুপ্ত যুগের শাসন ব্যবস্থা।

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য প্রধান উপাদান হল প্রত্নতাত্ত্বিক। এলাহাবাদ প্রশস্তি , দামোদরপুর লিপি, বসরাসিল লিপি থেকে গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। এছাড়া নাট্যকার শূদ্রকের মৃচ্ছকটিক, কালিদাসের মালবিকাগ্নিমিত্রম নাটক, কামন্দক-এর নীতিসার। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রগুলি যথা কাত্যায়ন-স্মৃতি, মনু-স্মৃতি, নারদ-স্মৃতি থেকে গুপ্ত শাসন ব্যবস্থা জানা যায়।

গুপ্ত শাসন ব্যবস্থার শীর্ষে ছিলেন রাজা এবং রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক। গুপ্ত রাজারা দৈবসত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। গুপ্ত রাজারা নিজেদের দেবতার সমকক্ষ বলে দাবি করতেন। গুপ্ত রাজারা অচিন্ত্যপুরুষ, লোকধামদেব, পরম দৈবত, মহারাজাধীরাজ, পরমরাজাধীরাজ, পরমেশ্বর প্রভুতি উপাধি ধারণ করত। এলাহাবাদ প্রশস্তি-তে সমুদ্রগুপ্তকে "মর্তলোকের ঈশ্বর" বলা হয়েছে। তাকে কৃতন্তেরে (যম) যুদ্ধ-কুঠার রুপে বর্ণনা করা হয়েছে।

রাজা রাজ্যর সর্বেসর্বা ছিল। সমরবিভাগ, বিচারবিভাগ পরিচালনা, রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণ, প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও অন্যান্য গুরত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রভুতি ব্যাপারে রাজাই ছিলেন সর্বেসর্বা। তিনি ছিলেন দেশের সব জমির মালিক। তিনি স্বৈরাচারী ছিলেন না।

যুবরাজ:

রাজার পরে ছিল যুবরাজের স্থান। সাধারণত বড়ো ছেলে রাজা মনোনীত হতেন। যুবরাজরা সম্রাটকে সাহায্য করতেন। তাকে সামরিক ও বেসামরিক দুটি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হত।

রাজকর্মচারী:

কেন্দ্রে রাজাকে সাহায্যর জন্য মন্ত্রী, যুবরাজ ও উচ্চ রাজকর্মচারীরা নিযুক্ত হতেন। মন্ত্রীরা রাজাকে পরামর্শ দিতেন। মন্ত্রীপদ ছিল বংশানুক্রমিক। মন্ত্রীরা ছিলেন সর্বোচ্চ রাজকর্মচারী। অন্যান্য উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের মধ্যে ছিলেন - মহাবলাধিকৃত (প্রধান সেনাপতি), মহাদণ্ডনায়ক (সেনাপতি), মহাপ্রতিহার (প্রধান দ্বাররক্ষক), সন্ধিবিগ্রহিক (বৈদেশিক বিষয়ক, যুদ্ধ ও শান্তির ভারপ্রাপ্ত), অক্ষপটলাধিকৃত (সরকারি দলিলপত্র রচনা ও রক্ষার ভারপ্রাপ্ত)।

গুপ্তযুগের প্রাদেশিক শাসন:

শাসনকার্যের সুষ্ঠ পরিচালনার জন্যে সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা হয়েছিল। এই যুগে প্রদেশ গুলিকে বলা হত ভুক্তি, দেশ, প্রদেশ ও ভোগ। উদাহরণ হিসেবে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি (উত্তরবঙ্গ), তীরভুক্তি ( উত্তর বিহার), সৌরাষ্ট্রদেশ, সুকুলিদেশ প্রভুতি প্রদেশের নাম করা যায়। ভুক্তিগুলি গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত ছিল। দেশ-এর শাসনকর্তাদের গোপতি এবং ভোগ-এর শাসনকর্তাদের ভোগপতি বা ভোগিকা বলা হত।

প্রদেশগুলি বিষয় বা জেলায় বিভক্ত ছিল। বিষয় শাসনের দায়িত্ব ছিল বিষয়পতি কর্মচারীর উপর। জেলা শাসককে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করবার জন্যে নানা কর্মচারী ছিলেন। শাসনব্যবস্থার সর্বনিম্ন একক ছিল গ্রাম। গ্রামিকরা গ্রাম শাসনের দায়িত্ব ছিল।

গুপ্ত যুগের নগর শাসন:

নাগরিক জীবন গুপ্ত যুগে ছিল উন্নত। বৃহদনগরগুলি নিগম সভা নামক একধরনের স্থানীয় প্রতিনিধি সভা মারফত শাসন পরিচালনা করত। নাগরিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যর দিকে লক্ষ্য রাখায় ছিল সভার কাজ। শহরে গুরত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সভার প্রতিনিধিত্ব করতেন। সভার পরামর্শ ক্রমে পুরপাল নগর শাসন পরিচালনা করতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে পুরপাল উপরিক নামক কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। অবস্থিক নামক কর্মচারীরা নগরের ধর্মশালাগুলি তত্ত্বাবধান করতেন। কোশাম্বী ও শর্মার মতে গুপ্ত ভূমিদান ব্যাবস্থা ছিল পুরোপুরি সামন্ততান্ত্রিক।

গুপ্ত যুগের রাজস্ব ব্যবস্থা:

গুপ্ত যুগে রাজস্বের প্রধান উৎস ছিল ভূমি। উৎপন্ন ফসলের ১/৬ বা ১/৪ ছিল ভূমিকর। একে বলা হত ভাগ। কর্মচারীদের বেতনের উপর কর ধার্য করা হত। একে বলা হত ভোগ। এছাড়া বানিজ্য ও শিল্প দ্রব্য থেকে শুল্ক, খনি, লবণ, জঙ্গল, ফেরিঘাট, বাজার প্রভুতি থেকে কর আদায় করা হত। বৈদেশিক আক্রমণ কালে মল্লকর নামে একপ্রকার কর আরোপ করা হত। সরকারি কাজে বিনা পারিশ্রমিক শ্রমদান করতে হত। একে বলা হত বিস্টি। গুপ্ত যুগে জমির মালিকানা নিয়ে বিতর্ক আছে। ড: ইউ. এন. ঘোষাল বলেন যে, গুপ্ত যুগে কৃষক জমি চাষ করলেও জমির মালিকানা ছিল রাজার। জমি দান বা বিক্রয় করতে গেলে রাজার অনুমতি লাগতো।

গুপ্ত শাসব্যবস্থার প্রকৃতি:

গুপ্ত শাসকরা ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী হলেও স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না। শাসন ব্যবস্থা কেন্দ্রীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ ছিল। এখানে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রচলিত ছিল। গুপ্ত শাসব্যবস্থা ছিল সামন্ততান্ত্রিক। গুপ্তরা ব্রাহ্মণদের ভুমিদান করতেন। সরকারি কর্মচারীদের বেতনের পরিবর্তে জমি দেওয়া হত, যার শাসনভার ছিল জমিগ্রহিতার উপর।

Tag: