চোল রাজবংশের শাসন ব্যবস্থা

- March 10, 2019
প্রাচীন ভারতে চোলরা একটি সুষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। বিভিন্ন চোল রাজাদের শিলালিপি — বিশেষ করে প্রথম পরান্তকের লিপি, রাজরাজের তাম্রশাস, সমসাময়িক মুদ্রা এবং বিভিন্ন চৈনিক ও আরব গ্রন্থকারদের রচনা থেকে চোল শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। চোল শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল দক্ষিণ ভারতে বিভিন্ন রাজবংশের শাসনব্যবস্থায় সামন্তদের প্রভাব ছিল যথেষ্ট, কিন্তু চোল শাসকরা সামন্তদের প্রভাব খর্ব করে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। চোল শাসনব্যবস্থায় রাজা অপ্রতিহত শক্তির অধিকারী হলেও, এখানে প্রাদেশিক শাসনের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত। এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রতিষ্ঠা। এই ব্যবস্থায় রাজা বা রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রজার সরাসরি যােগাযােগ ছিল — মাঝে কোনও মধ্যস্বত্বভােগী ছিল না।

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা

চোল শাসনব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বেসর্বা। রাজপদ ছিল বংশানুক্রমিক ক্ষেত্রবিশেষে ব্যতিক্রম হলেও সাধারণত জ্যেষ্ঠপুত্রই সিংহাসনে বসতেন। রাজারা একাধিক জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে বাস করতেন এবং আড়ম্বরপূর্ণ উপাধি গ্রহণ করতেন। এই উপাধিগুলি ছিল চোল মার্তণ্ড, পাণ্ড্যকুলাশনি, গঙ্গইকোণ্ড, কড়ারগােণ্ড ও চক্রবর্তীগণ প্রভৃতি। চোল রাজারা রাজার দৈৰস্বত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। অনেক সময় মৃত রাজার স্মরণে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তাতে রাজার মূর্তি স্থাপন করে পূজা করা হত।
Chola Dynasty Administration in South India
রাজা সর্বশক্তির আধার হলেও কখনােই স্বেচ্ছাচারী ছিলেন না। রাজদরবারে পুরোহিত, রাজগুরু ও ধর্মোপদেষ্টা উপস্থিত থাকতেন। একটি সুসংগঠিত আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালিত হত। আমলারা রাজা কর্তৃক নিযুক্ত হতেন। কর্মচারী নিয়ােগের পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানা না গলেও, তাঁরা যে যােগ্যতা, জন্ম, বংশকৌলিন্য ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে নিযুক্ত হতেন সে সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই। শাসন পরিচালনায় রাজাকে সাহায্য করার জন্য কোনও পরিষদ ছিল কিনা তা স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, তবে তাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য অবশ্যই একটি কর্মচারী পরিষদ ছিল। এই পরিষদের সদস্যরা রাজা কর্তৃক মনােনীত হতেন এবং তাদের উপদেশ গ্রহণ করা বা না করা সম্পূর্ণ রাজার স্বেচ্ছাধীন ছিল। রাজকর্মচারীরা বেতন হিসেবে জমি পেতেন। তবে এক্ষেত্রে জমির মালিকানা নয় — তাদের কেবলমাত্র রাজস্ব আদায়ের স্বত্ব প্রদান করা হত। কর্মদক্ষতার পুরস্কার হিসেবে তাদের উপাধি দেওয়া হত। কর্মচারীদের কাজ পরিদর্শনের জন্য রাজা মাঝে মাঝে ভ্রমণে বের হতেন।

সমগ্ৰ চোল রাজ্যকে বলা হত চোলমণ্ডলম। চোলরাজ্য দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল — (ক) সামস্তশাসিত অঞ্চল - যেখানে সামন্তরাজারা কর দিতেন ও যুদ্ধকালে রাজাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতেন এবং (খ) চোল রাজার প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চল। রাজার প্রত্যক্ষ শাসনাধীন অঞ্চল কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। প্রদেশগুলিকে বলা হত মণ্ডলম। প্রদেশগুলির কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। রাজ্যবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রদেশের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেত। প্রদেশ বা মণ্ডলমগুলি কয়েকটি কোট্রাম বা জেলায় বিভক্ত ছিল। কোট্টামগুলি নাডু বা অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। নাডুর অধীনে ছিল কুররম বা কিছু সংখ্যক গ্রামের সমষ্টি বা গ্রাম সমবায়। সাধারণত রাজপুত্ররাই মণ্ডল এর শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তাদের বলা হত মণ্ডলেশ্বর।

ভূমিরাজত্ব ছিল সরকারি আয়ের প্রধান উৎস। এই কর নগদ অর্থে বা উৎপাদিত শস্যে দেওয়া যেত। করের হার সাধারণত উৎপাদিত শস্যের এক তৃতীয়াংশ থেকে এক ষষ্ঠাংশের মধ্যে ওঠা নামা করত। চোল সাম্রাজ্যে প্রায়ই জমি জরিপ করা হত এবং জমির উৎপাদিকা শক্তি অনুসারে কর ধার্য করা হত। কৃষির উন্নতির জন্য সেচের উপর খুব গুরুত্ব আরােপিত হয়। যুদ্ধ, বন্যা প্রতিরােধ, বাঁধ সংস্কার ও মন্দির নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত কর আদায় করা হত। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আবার আংশিক বা পুরােপুরিভাবে কর মকুব করা হত। ভূমিকর ছাড়াও লবণ, বনসম্পদ, বাণিজ্য, খনি, তেলকল, পশু, বাজার প্রভৃতি থেকেও কর আদায় করা হত। বৈদেশিক বাণিজ্যের দিকে রাজাদের যথেষ্ট নজর ছিল। জরিমানা থেকেও প্রচুর আয় হত। আবাদি জমি, মন্দির, পুষ্করিণী, সেচখাল প্রভৃতি করমুক্ত ছিল।

বিচারের কাজ স্থানীয়ভাবেই পরিচালিত হত। গ্রামের বিচার চলত পঞ্চায়েতের মাধ্যমে। রাজকীয় আদালতকে বলা হত ধর্মাসন। পঞ্চায়েতের রায়ের বিরুদ্ধে নাড়ুর বিচারকের কাছে আপিল করা যেত। এই যুগে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার একই স্থানে হত। রাজা নিজে রাজদ্রোহের বিচার করতেন। শাস্তি হিসেবে জরিমানা, কারাদণ্ড, বেত্রদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড, হাতির পায়ের নীচে পিষে মারা প্রভৃতি প্রচলিত ছিল। চোলদের একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনী ছিল এবং এর প্রধান ছিলেন রাজা। সেনাবাহিনী চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল — পদাতিক বাহিনী, অশ্বারােহী বাহিনী, হস্তিবাহিনী এবং নৌবাহিনী। একটি চোল শিলালিপি থেকে জানা যায় যে ৭০টি রেজিমেন্ট নিয়ে চোলবাহিনী গঠিত ছিল এবং চোলদের সমগ্র সৈন্যসংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার। তাদের হস্তিবাহিনীর সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। উপকূল রক্ষা এবং সামুদ্রিক কাজকর্মের ব্যাপারে চোলদের সুদক্ষ নৌবাহিনী যথেষ্ট সহায়ক ছিল। রাজা ও রাজপুত্ররা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পরিচালনা করতেন। রাজাদিত্য ও রাজাধিরাজ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। চোল রাজারা জনহিতকর কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। প্রজাদের সুবিধার্থে জনহিতকর কার্যাবলী রাস্তাঘাট নির্মাণ, কৃষিকাজের উন্য জলসেচ, বাঁধ নির্মাণ, সেচখাল খনন এবং চিকিৎসালয়, বিদ্যালয় ও দেবমন্দির নির্মাণ প্রভৃতি কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন।

স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা

চোল শাসনব্যবস্থায় সর্বনিম্ন একক ছিল গ্রাম। চোল শাসনব্যবস্থায় গ্রামগুলির শাসনতান্ত্রিক স্বাধীনতা ছিল দেখার মত। চোল রাজকর্মচারীরা গ্রামীণ শাসনের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেন না। তারা মুলত পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করতেন। রােমিলা থাপারের মতে, উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় তামিলদে যে অনেক বেশি সাংস্কৃতিক অবিচ্ছিন্নতা লক্ষ্য করা যায়, তার মূলেও হয়ত রয়েছে চোলদের গ্রামশাসন পদ্ধতি। একটি অতি উন্নত সমিতি ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় শাসন পরিচালনা করা হত। উত্তরমেরুর সভা অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজা প্রথম পরন্তকের আমলে দুবার সংবিধান সংশােধনের মাধ্যমে গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাকে পরিশীলিত করে তােলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

চোল আমলে গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল গ্রামবাসীকে স্বনির্ভর করে তােলা। এই উদ্দেশ্যে একটি গ্রাম পরিষদ গঠন করে তার হাতে গ্রামের সম্পূর্ণ শাসনদায়িত্ব অর্পণ করা হয়। মূল সমিতি ছাড়াও অনেকগুলি সামাজিক, অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় গােষ্ঠী এক একটি নির্দিষ্ট বিভাগ বা কাজের তত্ত্বাবধান করত। গােষ্ঠীগুলি কোন দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা সমস্যার সম্মুখীন হলে পরিষদের কাছে আবেদন করতে পারত। গােষ্ঠীর সদস্যরাই মূল পরিষদের সদস্য হতেন। ফলে পরিষদের সাথে গােষ্ঠী সংগঠনের সংঘাতের সম্ভাবনা ছিল না। বড় বড় গ্রামগুলিতে সুশাসনের প্রয়ােজনে একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকত। গ্রামগুলি বিভিন্ন পাড়ায় বিভক্ত ছিল। এক একটি পাড়ায় ভিন্ন ভিন্ন পেশাজীবি মানুষ নিজ নিজ গােষ্ঠী গঠন করত, যেমন সূত্রধর, কর্মকার, স্বর্ণকার প্রভৃতি। বিভিন্ন সামাজিক গােষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল গ্রামের সমাজ জীবনের মূল ভিত্তি।

সাধারণ পরিষদে স্থানীয় অধিবাসীরাই সদস্য হতে পারতেন। পরিষদ ছিল তিন ধরনের — উর, সভা ও নগরম। যেসব গ্রামবাসী কর প্রদান করে তাদের নিয়ে গঠিত সমিতির নাম ছিল উর। ব্রাহ্মণদের দান করা গ্রাম অথবা গ্রামের ব্রাহ্মণদের নিয়ে গঠিত হত সভা। ব্যবসা কেন্দ্রগুলির তত্ত্বাবধানের জন্য বণিকদের নিয়ে গঠিত হত নগরম। কোন কোন সময় স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে ব্রাহ্মণদের জন্য নতুন বসতি গড়ে তােলা হত। সেক্ষেত্রে একই গ্রামে উর ও সভা দুইই থাকত। আবার বড় বড় গ্রামে কাজের সুবিধার জন্য প্রয়ােজন হলে একই সাথে দুটি উর গঠন করা হত।

স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সকল সমিতির কাজকর্ম ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হত। গ্রামের সকল প্রাপ্ত বয়স্ক করদাতা উরের সদস্য হতে পারতেন তবে উর এর কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রবীণদেরই প্রাধান্য ছিল। দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনার জন্য প্রবীণরা কার্যকরী সমিতি গঠন করতেন। কার্যনিবাহী সমিতিগুলির পূর্ব ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয়। সম্ভবত পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এগুলির রূপদান করা হয়েছে। চোল আমলের প্রথম দিকের লেখগুলিতে নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য অস্থায়ী সমিতি গঠনের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন পরিষদে সমিতির সংখ্যা ও তাদের সদস্য সংখ্যার উল্লেখও এগুলিতে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে চিঙ্গেলপুট জেলার উওরামেরুর গ্রামে প্রথম পরন্তকের রাজত্বকালের দুটি লেখ গুরুত্বপূর্ণ। ৯১৯ ও ৯২১ খ্রিস্টাব্দের এই দুটি লেখতে বিভিন্ন কার্য নির্বাহী সমিতি গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে।

উত্তর মেরুর এই গ্রামটি ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত। দশম শতকের শেষ লেখটি অনুসারে উত্তর মেরুর গ্রামের ত্রিশটি পাড়া বা কুড়ম্ব থেকে কার্যনির্বাহী সমিতিগুলিতে নির্বাচনের জন্য যােগ্য ব্যক্তিদের প্রথমে বেছে নেওয়া হত। এই ত্রিশটি পাড়ার অধিবাসীরা মিলিত হয়ে লটারী দ্বারা নির্বাচনের জন্য একজন করে প্রার্থী স্থির করতেন। নির্বাচনে নামার জন্য যােগ্যতা বিচার করা হত কঠোরভাবে। লেখটিতে প্রার্থীদের যােগ্যতা ও অযােগ্যতার বিবরণ দেওয়া আছে। নির্বাচন প্রার্থীকে কাদায়ী জমির ২৫ শতাংশের বেশি মালিক হতে হবে। তার নিজস্ব বাসগৃহ থাকবে এবং বয়স হবে ৩৫ বছরের বেশি কিন্তু ৭০ এর কম। শাস্ত্রজ্ঞানকে বিশেষ গুণ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রার্থীকে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণগুলি সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। কোন ব্যক্তির যদি উল্লেখিত পরিমাণ জমি না থাকে, কিন্তু অন্তত একটি বেদ ও চারটি ভাষ্যের মধ্যে অন্তত একটি ভাষ্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকে তাহলে তিনিও নির্বাচন প্রার্থী হতে পারবেন। যাদের এইসব গুণাবলী আছে তাদের মধ্যে যারা বাণিজ্যে দক্ষ এবং যাদের নৈতিক চরিত্র উন্নত, তাদের নির্বাচনের জন্য বিবেচনা করা যাবে।

অনুরূপভাবে অযােগ্যতার দিকটিও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, যারা বিগত বছরে কোনাে পরিষদের সদস্য ছিলেন কিন্তু আয় ব্যয়ের হিসেব দাখিল করেননি তারা এবং তাদের নিকট আত্মীয়রা প্রার্থী হতে পারবেন না। যিনি অনাচারে লিপ্ত হয়েছেন তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না। ব্রাহ্মণ হত্যা, মদ্যপান, চুরি, ব্যভিচারিতা ও অপরাধীর সাথে সংযােগ রক্ষা করেন তিনি বা তার নিকট আত্মীয়রা প্রার্থী পদে অযােগ্য বিবেচিত হবেন। যিনি হঠকারী, যিনি অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছেন, যিনি নিষিদ্ধ মাংস ভক্ষণ করেন তিনি বা তার নিকট আত্মীয়দের অযােগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। নিকট আত্মীয় হিসেবে পিতা বা পুত্র, কাকা, মামা, মাসতুতাে ভাই, পিসতুতাে ভাই, জামাই, ভাই, শ্যালক, ভগ্নিপতি, ভাগ্না প্রমুখের কথা বলা হয়েছে।

এই যােগ্যতার ভিত্তিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের নাম কাগজে লিখে একটি পাত্রে রাখা হত। গ্রামের সকল বয়স্ক ব্যক্তি ও তরুণদের উপস্থিতিতে লটারীর মাধ্যমে ত্রিশটি পাড়া থেকে একজন করে ত্রিশজন নির্বাচিত হতেন। এই ত্রিশজনের মধ্যে যারা ইতিপূর্বে উদ্যান সমিতি ও পুষ্কুরিণী সমিতিতে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং বয়সে প্রবীণ ও জ্ঞানী এমন বারাে জনকে নিয়ে বাৎসরিক সমিতি গঠন করা হত। অবশিষ্ট বারাে জনকে নিয়ে উদ্যান সমিতি এবং ছয় জনকে নিয়ে পুষ্কুরিণী সমিতি গঠন করা যেত। এছাড়া আগের পদ্ধতিতে ত্রিশটি পাড়ায় লটারী দ্বারা সদস্য নির্বাচিত করে স্বর্ণ সমিতি, পঞ্চমুখী সমিতি গঠন করা হত। ঢােল বাজিয়ে সভা বা মহাসভার অধিবেশন ডাকা হােত। বিভিন্ন গ্রামসভার মধ্যে মতবিনিময় ও সহযােগিতা ছিল সেকালের স্মরণীয় বৈশিষ্ট্য। উল্লেখিত তিনিটি সমিতি ৩৬০ দিনের জন্য কার্যভার পেতেন। কোন সদস্য কর্মকালের মাঝে অপরাধী সাব্যস্ত হলে তাকে তৎক্ষণাৎ অপসারণ করা হয়

গ্রাম সম্প্রদায়ের জমির উপর সভার মালিকানাস্বত্ব ছিল। ব্যক্তি মালিকানা ধনী সম্পত্তির উপরেও সভার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল। উৎপন্ন ফসলের পরিমাপ, জমির জরিপ এবং রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণের কাজে সভা রাজকর্মচারীদের সহায়তা করত। পতিত জমি উদ্ধার করে কৃষি এলাকা বাড়ানাের দায়িত্ব সভা পালন করত। রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করত সভা। রাজস্ব অনাদায়ী হলে উক্ত জমি নীলামে হস্তান্তরের অধিকার সভার হাতেই ছিল। জমির অধিকার সংক্রান্ত বিরােধ বা জলসেচ বিষয়ক সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও সভার হাতে ন্যস্তু ছিল। কোন বিশেষ উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সভা আলাদা খাজনা আদায় করতে পারত, যেমন — পুষ্করিণী খনন, নতুন রাস্তা নির্মাণ, বাঁধ দেওয়া ইত্যাদি। মহাসভাগুলি এই সকল কাজের জন্য কর্মচারী নিয়ােগ করত। তবে ছােট ছোট গ্রামের অধিবাসীরা বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করে দিত।

উর ও সভার মত আর একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ছিল নগরম। সাধারণভাবে এটি ছিল স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমবায় সংঘ। অধিকাংশ শহরে এগুলির অস্থিত্ব ছিল। অনেক সময় উর ও নগরম পাশাপাশি থেকে কাজ করত। বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করাই ছিল নগরম এর প্রধান কাজ। অনেকে নগরকে ব্যবসায়ীদের সংঘ বা গিল্ড হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাজকীয় পৃষ্ঠপােষকতায় এই সংগঠন বাণিজ্যকর্ম তত্ত্ববধান করত।