দক্ষিণ ভারতের চালুক্য রাজবংশ

- March 10, 2019
ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে দাক্ষিণাত্য চালুক্য বংশ (ইংরেজি: Chalukya dynasty) উত্থান ঘটে। উত্তর কর্ণাটকের বিজাপুর জেলার বাতাপি বা বাদামি-কে কেন্দ্র করে চালুক্য রাজবংশ ক্ষমতা বিস্তার করে। বাতাপি বা বাদামি ছিল চালুক্য বংশের রাজধানী। এজন্য এই চালুক্যদের বাতাপি বা বাদামি চালুক্য বলা হয়। এরা পশ্চিমি চালুক্য (Western Chalukyas) নামেও পরিচিত। প্রায় দুশাে বছর রাজত্ব করার পর রাষ্ট্রকুট শক্তির হাতে তারা বিপর্যস্ত হয়। রাষ্ট্রকূটদের আমলে চালুক্য শক্তি স্তিমিত হয়ে পড়লেও পরবর্তীকালে কল্যাণী ও বেঙ্গিকে কেন্দ্র করে তাদের দুটি শাখা উল্লেখযােগ্য হয়ে ওঠে। রাজধানীর নাম অনুসারে তাদের বলা হয় কল্যাণীর চালুক্য এবং বেঙ্গীর চালুক্য। কল্যাণী ও বেঙ্গীর চালুক্যরা অবশ্য নিজেদের বাতাপি চালুক্যদের শাখা বলে মনে করত।
Badami Chalukya Empire in South India
চালুক্যদের উৎপত্তি, আদি পরিচয় বা বংশপরিচয় নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মত আছে। স্মিথের এর মতে চালুক্যরা হল বহিরাগত গুর্জরদের বংশধর। তারা রাজপুতানা থেকে দাক্ষিণাত্যে এসে বসবাস করতে থাকে। একটি কিংবদন্তি অনুসারে তারা মানব্য গোত্রজাত ও হারিতিপুত্র বংশ। অপর একটি কিংবদন্তি অনুসারে তারা মনুর বংশধর। তারা ব্রহ্মার চুলুক বা হাতের তালু থেকে উদ্ভূত। চালুক্য রাজাদের সভাপণ্ডিতরা কোনও দেবতার চুলুক বা কমণ্ডলু থেকে এই রাজবংশের উৎপত্তি কল্পনা করেন। ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার এইসব কিংবদন্তি ও স্মিথ এর বক্তব্যকে অস্বীকার করে বলেন যে, চালুক্যরা হল দাক্ষিণাত্যের স্থানীয় অধিবাসী। তারা চালুক উপজাতি থেকে উদ্ভূত হয় এবং চালুক্য নামে পরিচিত হয়। কৃষ্ণা নদীর তীরে হিরণ্য রাষ্ট্রে তাদের পূর্বপুরুষদের বাস ছিল।

বাতাপির চালুক্য বংশ

চালুক্য বংশের প্রথম রাজা ছিলেন জয়সিংহ। তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। পরবর্তীকালের একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি রাষ্ট্রকূটদের পরাজিত করে স্বাধীন চালুক্য রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার পর সিংহাসনে বসেন রণরাজ। রণরাজের পুত্র প্রথম পুলকেশী (আনুমানিক ৫৩৫-৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ) চালুক্য বংশের প্রথম স্বাধীন নরপতি। তিনি বাতাপিতে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। তাকে চালুক্য বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। এরপর প্রথম পুলকেশীর পুত্র প্রথম কীর্তিবৰ্মন (আনুমানিক ৫৬৬-৫৯৭ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। তিনি কোঙ্কনের মৌর্যবংশ, বৈজয়ন্তীর কদম্ব বংশ এবং মহারাষ্ট্র ও মালবের কলচুরি বংশের রাজাদের পরাজিত করে তাদের রাজ্য অধিকার করেন। জানা যায় যে, তিনি উত্তরে বাংলা ও বিহার পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং চোল, পাণ্ড্য প্রভৃতি তামিল রাজ্যে সেনাবাহিনী পাঠান।

মঙ্গলেশ (৫৯৭-৬১০ খ্রিস্টাব্দ): প্রথম কীর্তিবর্মনের মৃত্যুর সময় তার পুত্ররা নাবালক থাকায় প্রথম কীর্তিবর্মনের ভ্রাতা মঙ্গলেশ সিংহাসনে বসেন। তিনি কলচুরিদের পরাজিত করে উত্তর ও মধ্য মহারাষ্ট্র জয় করেন। তিনি বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। তিনি রণবিক্রান্ত, পৃথিবী বল্লভ প্রভৃতি উপাধি ধারণ করেন। তিনি নিজ পুত্রকে সিংহাসনে বসাবার চেষ্টা করলে কীর্তিবর্মনের পুত্র দ্বিতীয় পুলকেশীর সঙ্গে বিবাদ বাঁধে। এই গৃহযুদ্ধে মঙ্গলেশ নিহত হন।

দ্বিতীয় পুলকেশী (৬১০-৬৪২): দ্বিতীয় পুলকেশী ছিলেন বাতাপির চালুক্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি। দ্বিতীয় পুলকেশী ও তার কাকা মঙ্গলেশ-এর সঙ্গে সিংহাসন নিয়ে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল। দ্বিতীয় পুলকেশীর সভাকবি রবিকীর্তির আইহোল শিলালিপি থেকে দ্বিতীয় পুলকেশীর সমন্ধে জানা যায়। তিনি মহীশূরের গঙ্গরাজ্য, মালাবারের অলুপ অঞ্চল ও গুজরাট জয় করেন। মালব রাজ্য তার আনুগত্য মেনে নেন। কনৌজ রাজ হর্ষবর্ধন দক্ষিণ ভারত জয়ে অগ্রসর হলে দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে পরাজিত হন। তিনি পল্লব রাজ প্রথম মহেন্দ্রবর্মনকে পরাস্ত করে তার রাজধানী কাঞ্চি দখল করেন। মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মন পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে চালুক্য রাজধানী বাতাপি আক্রমণ করেন এবং দ্বিতীয় পুলকেশী নিহত হন। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ তাকে 'দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাট' বলেছেন।

প্রথম বিক্রমাদিত্য (৬৫৫-৬৮১ খ্রিস্টাব্দ): দ্বিতীয় পুলকেশীর মৃত্যুর পর চালুক্য রাজ্যে প্রবল নৈরাজ্য দেখা দেয়। রাজধানী বাতাপি এবং তার সন্নিহিত কিছু অঞ্চল পল্লব অধিকারভুক্ত থাকে। চালুক্য সিংহাসনের অধিকার নিয়ে দ্বিতীয় পুলকেশীর পুত্রদের মধ্যে প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর ফলে ৬৪২ থেকে ৬৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ তেরাে বছর চালুক্য সিংহাসন শূন্য ছিল। এই অবস্থায় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে দ্বিতীয় পুলকেশীর পুত্র প্রথম বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসেন। তিনি চালুক্য রাজ্য থেকে পল্লবদের বিতাড়িত করেন। তিনি তুঙ্গভদ্রা অতিক্রম করে পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেন এবং পল্লব রাজধানী কাঞ্চি লুণ্ঠন করেন। শেষ পর্যন্ত তুঙ্গভদ্রা নদী দুই রাজ্যের সীমানা বলে চিহ্নিত হয়। এতেও কিন্তু পল্লবদের সঙ্গে সংঘর্ষের অবসান হয় নি তার উত্তরাধিকারীদের আমলেও এই সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। তিনি চোল, পাণ্ড্য ও কেরল-দের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।

বিনয়াদিত্য (৬৮১-৬৯৬ খ্রিস্টাব্দ): প্রথম বিক্রমাদিত্যর পুত্র বিনয়াদিত্য সিংহাসনে বসে পল্লব, চোল, কেরল প্রভূতি বিরুদ্ধে অবিরাম সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তার সারা জিবন যুদ্ধে অতিবাহিত হয়। কথিত আছে যে, তিনি পারসিক ও সিংহলের রাজাদের কাছ থেকে কর আদায় করতেন।

বিজয়াদিত্য (৬৯৬-৭৩৩ খ্রিঃ): বিনয়াদিত্যের পর বিজয়াদিত্য সিংহাসনে বসেন। তিনি পল্লব-রাজ দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মনকে পরাজিত করে কাঞ্চি দখল করেন এবং পল্লব রাজকে কর প্রদানে বাধ্য করেন। তিনি বিজাপুরের শিবমন্দিরটি তৈরি করেন। তিনি পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। তার রাজ্যের জৈনদের প্রতি তিনি যথেষ্ট সহনশীলতা দেখান।

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য (৭৩৩-৭৪৬ খ্রিঃ): বিজয়াদিত্যের পর তার পুত্র দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসেন। তার আমলেও চালুক্য-পল্লব দ্বন্দ্ব অব্যাহত ছিল। তিনি পল্লব রাজ নন্দীবর্মনকে পরাজিত করে সাময়িকভাবে কাঞ্চি দখল করেন। তার শক্তিবৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে চোল, পাণ্ড্য, কেরল প্রভৃতি শক্তিবর্গ তার বশ্যতা স্বীকার করে। এইসব সাফল্যের স্মারক হিসেবে তিনি সুদূর দক্ষিণের সাগরতীরে একটি বিজয়স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় সিন্ধুদেশ থেকে গুজরাটের উপর আরব আক্রমণ শুরু হলে তিনি তা প্রতিহত করেন। তিনি সাহিত্য ও শিল্পের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তিনি ছিলেন বাতাপির চালুক্য বংশের শেষ শ্রেষ্ঠ নরপতি।

দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন (৭৪৬-৭৫৭ খ্রিঃ): দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্যর পুত্র দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন ৭৪৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। চালুক্য-পল্লব দ্বন্দ্বের ফলে চালুক্যরা ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই সুযােগে চালুক্যদের সামন্ত রাষ্ট্রকুট বংশীয় দন্তিদুর্গ কীর্তিবর্মনকে পরাজিত করে চালুক্য বংশের উচ্ছেদ সাধন করেন। মহারাষ্ট্রে রাষ্ট্রকুট বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বেঙ্গির চালুক্য বংশ

বাতাপির চালুক্য নৃপতি দ্বিতীয় পুলকেশী কৃষ্ণা-গােদাবরী নদীর মােহনা অঞ্চলে অবস্থিত বেঙ্গি (অন্ধ্রপ্রদেশ) জয় করেন এবং নিজ ভ্রাতা কুঞ্জবিষ্ণুবর্ধন-কে (৬২৪-৬৪১ খ্রিস্টাব্দ) সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বাতাপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে স্বাধীন হয়ে যান। বেঙ্গির এই স্বাধীন চালুক্যরা বেঙ্গির চালুক্য বা পূর্বাঞ্চলীয় চালুক্য (Eastem Chalukyas) নামে পরিচিত। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে বেঙ্গির চালুক্যদের সঙ্গে রাষ্ট্রকুটদের বিবাদ শুরু হয়, যা দীর্ঘকাল অব্যাহত থাকে। চোলদের সঙ্গে বেঙ্গির চালুক্যরা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত বেঙ্গির চালুক্যরা ১০৭০ খ্রিস্টাব্দে চোলবংশে বিলীন হয়ে যায়।

কল্যাণীর চালুক্য বংশ

কল্যাণীর চালুক্যরা হল বাতাপি চালুক্য বংশের একটি শাখা। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বাতাপি চালুক্যদের বংশধর দ্বিতীয় তৈল (৯৭৩-৯৯৭ খ্রিস্টাব্দ) রাষ্ট্রকুট-রাজ কার্ক-কে পরাজিত করে দাক্ষিণাত্যের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে (বিজাপুর জেলা) কল্যাণীর চালুক্য বংশের প্রতিষ্ঠা করে। হায়দ্রাবাদ রাজ্যর অন্তর্গত কল্যাণী ছিল চালুক্য রাজ্যর রাজধানী। দ্বিতীয় তৈল বাতাপির চালুক্য রাজ্যের কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করে মহারাজাধিরাজ ও চক্রবর্তী উপাধি ধারণ করেন। দ্বিতীয় তৈল-র পুত্র সত্যাশ্রয় (৯৯৭-১০০৮ খ্রিস্টাব্দ) কুর্নুল ও গুন্টুর পর্যন্ত রাজ্যবিস্তার করেন। এই সময় দাক্ষিণাত্যে চোল শক্তির উত্থান ঘটে এবং দাক্ষিণাত্যে প্রভুত্ব স্থাপনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী চোল-চালুক্য সংগ্রামের সুত্রপাত হয়। সত্যাশ্রয়ের পুত্র দ্বিতীয় জয়সিংহ-র (১০১৫-১০৪২ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্বকালে কলচুরি-রাজ গাঙ্গেয়দেব, পারমার-রাজ ভােজ এবং চোল-রাজ রাজেন্দ্ৰ চোল সম্মিলিতভাবে চালুক্য রাজ্য আক্রমণ করেন। জয়সিংহ এই আক্রমণ প্রতিহত করে চালুক্য রাজ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখেন। দ্বিতীয় জয়সিংহের পুত্র প্রথম সােমেশ্বর-এর (১০৪২-১০৬৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলেও চোল-চালুক্য যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। প্রথম সােমেশ্বর চেদি, পারমার, চৌলুক্য ও কলচুরি বংশীয় রাজাদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করেন। কোশল ও কলিঙ্গ তার রাজ্যভুক্ত ছিল।

প্রথম সােমেশ্বরের কনিষ্ঠ পুত্র ত্রিভুবনমল্ল বিক্রমাদিত্য বা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য (১০৭৬-১১২৮ খ্রিস্টাব্দ) কল্যাণীর চালুক্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি ছিলেন। ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দে তার সিংহাসনারােহণের সময় থেকে তিনি চালুক্য বিক্রমাদিত্য অব্দ প্রবর্তন করেন। তার সভাকবি বিলহুন-এর বিক্রমাঙ্কদেবচরিত গ্রন্থ থেকে তার সামরিক প্রতিভা ও কৃতিত্বের কথা জানা যায়। তিনি চোল-রাজ কুলােতুঙ্গকে পরাজিত করে চোল রাজধানী দখল করেন এবং হােয়েসল-রাজ বিষ্ণুবর্ধনকে পরাজিত করে মহীশূরের একাংশ অধিকার করেন। তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তিনি স্বয়ং রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিচারব্যবস্থা, জ্যোতিষ, চিকিৎসাশাস্ত্র, অলঙ্কারশাস্ত্র, রসায়ন প্রভৃতি নানা বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। বিলহুন ছাড়াও মিতাক্ষরা গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানেশ্বর তাঁর রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন। যষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের পর কল্যাণীর চালুক্যদের পতন শুরু হয়। একের পর এক অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ চালুক্য সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়। এরপর দ্বাদশ শতকের শেষভাগে মহীশূরের হােয়েসল ও মহারাষ্ট্রের যাদববংশীয় রাজারা এই রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দখল করে নিলে কল্যাণীর চালুক্যদের বিলুপ্তি ঘটে।

চালুক্য রাজাদের ধর্ম

চালুক্য রাজারা ব্রাহ্মণ্য হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তাদের আমলে বৈদিক যাগযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় এবং বেশ কিছু ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়। তাদের আনুকুল্য রাজ্যর অভ্যন্তরে বহু বিষ্ণু ও শিবমন্দির নির্মিত হয়। চালুক্য রাজারা অন্য ধর্মের প্রতি যথেষ্ট সহনশীল ছিলেন। বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম তাদের পৃষ্ঠপােষকতা লাভ করে। আইহােল প্রশক্তির রচয়িতা রবিকীর্তি জৈন ছিলেন। চালুক্য রাজাদের কাছ থেকে তিনি প্রচুর সম্মানে ভূষিত হন। বিজয়াদিত্য ও দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য জৈন পণ্ডিতদের বহু গ্রাম দান করেন। এই যুগে বেশ কিছু জৈন মন্দির নির্মিত হয়। চালুক্য সাম্রাজ্যে বহু বৌদ্ধ মঠ ও বিহারের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। হিউয়েন সাঙ তার ভ্রমণকালে চালুক্য সাম্রাজ্যে ১০০টি বিহার এবং সেখানে বসবাসকারী ৫০০০ ভিক্ষুর কথা উল্লেখ করেছেন। চালুক্য রাজারা এতই ধর্মসহিষ্ণু ছিলেন যে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে তারা অগ্নি উপাসক পারসি-দের নানা জেলায় বসবাস ও মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেন।

স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা

স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ক্ষেত্রেও চালুক্য আমল এক উল্লেখযােগ্য অধ্যায়। বাতাপি, আইহােল, মেগুটি প্রভৃতি স্থানে বেশ কিছু মন্দির নির্মিত হয়। বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরের শিল্প অনুকরণে হিন্দু মন্দির নির্মাণ এই যুগের শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই যুগে পাহাড় কেটে মন্দির নির্মাণ শুরু হয়। চালুক্য-রাজ মঙ্গলেশ পাহাড় কেটে বাতাপির বিখ্যাত বিষ্ণুমন্দিরটি নির্মাণ করেন। বিজয়াদিত্য নির্মিত সঙ্গমেশ্বর মন্দির ও দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য নির্মিত বিরুপাক্ষ মন্দির চালুক্য শিল্পরীতির অপূর্ব নিদর্শন। হ্যাভেল-এর মতে, এই মন্দিরটিতে ইউরােপীয় ধ্রুপদী গঠন রীতির সঙ্গে গথিক শিল্পের ভঙ্গিমার মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। এইসব মন্দিরগাত্রে উৎকীর্ণ কারুকার্যগুলিও বিস্ময়কর। অনেকের ধারণা যে, অজন্তা ও এলিফ্যান্টার কয়েকটি চিত্র চালুক্য যুগেই অঙ্কিত হয়।

চালুক্য রাজাদের সাহিত্য

কল্যাণীর চালুক্য রাজারা সাহিত্যের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। দ্বিতীয় তৈলপ-এর আমলে তার পৃষ্ঠপােষকতায় কানাড়ি ভাষা ও সাহিত্যের যথেষ্ট বিকাশ ঘটে। অজিতপুরাণ নামক গ্রন্থের রচয়িতা কানাড়ি কবি রন্না তার সভাসদ ছিলেন। বিক্রমাঙ্কদেবচরিত রচয়িতা বিলহন তার সভাকবি ছিলেন। যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি-র টীকাকার ও মিতাক্ষরা গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানেশ্বর এই যুগেই আবির্ভূত হন।