চালুক্য রাজবংশ।

author photo
- Sunday, March 10, 2019
advertise here

চালুক্য সাম্রাজ্য।

ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে দাক্ষিণাত্য চালুক্য বংশ (ইংরেজি: Chalukya dynasty) উত্থান ঘটে। উত্তর কর্ণাটকের বিজাপুর জেলার বাতাপি বা বাদামি-কে কেন্দ্র করে চালুক্য রাজবংশ ক্ষমতা বিস্তার করে। বাতাপি বা বাদামি ছিল চালুক্য বংশের রাজধানী। এজন্য এই চালুক্যদের বাতাপি বা বাদামি চালুক্য বলা হয়। চালুক্যদের আদি বাসভূমি ছিল কৃষ্ণা নদীর তীরে হিরন্য রাষ্ট্র। চালুক্যদের তিন ভাগে ভাগ করা হয় - (১) বাতাপির চালুক্য বংশ, (২) বেঙ্গির চালুক্য বংশ, (৩) কল্যাণীর চালুক্য বংশ।


(১) বাতাপির চালুক্য বংশ:

চালুক্য বংশের প্রথম রাজা বা প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জয়সিংহ। তিনি রাষ্ট্রকুটদের পরাজিত করে চালুক্য বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সিংহাসনে বসেন রণরাজ। রণরাজের পুত্র প্রথম পুলকেশী চালুক্য বংশের প্রথম স্বাধীন নরপতি। প্রথম পুলকেশী-কে চালুক্য বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। প্রথম পুলকেশীর পুত্র প্রথম কীর্তিবর্মন কোঙ্কনের মৌর্যবংশ ও মহারাষ্ট্র ও মালবের কলচুরি বংশের রাজাদের পরাজিত করেন।

মঙ্গলেশ:

কীর্তিবর্মনের মৃত্যুর পর নিজ ভাই মঙ্গলেশ সিংহাসনে বসেন (৫৯৭-৬১০ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি কলচুরিদের পরাজিত করে উত্তর ও মধ্য মহারাষ্ট্র জয় করেন। তিনি বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। তিনি রণবিক্রন্ত, পৃথিবী-বল্লভ উপাধি ধারণ করেন। দ্বিতীয় পুলকেশী তাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন।

দ্বিতীয় পুলকেশী (৬১০-৬৪২ খ্রিস্টাব্দ):

দ্বিতীয় পুলকেশী ছিলেন চালুক্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা। তিনি বল্লভ, পৃথিবী-বল্লভ, পরমেশ্বরপরম ভাগবত প্রভুতি নামে পরিচিত। দ্বিতীয় পুলকেশীর সভাকবি রবিকীর্তির আইহোল শিলালিপি থেকে তার সমন্ধে জানা যায়। তিনি মহীশূরের গঙ্গরাজ্য, মালাবারের অলুপ অঞ্চল ও গুজরাট জয় করেন। কনৌজ রাজ হর্ষবর্ধন দক্ষিণ ভারত জয়ে অগ্রসর হলে দ্বিতীয় পুলকেশীর কাছে পরাজিত হন। তিনি পল্লব রাজ প্রথম মহেন্দ্রবর্মনকে পরাস্ত করে তার রাজধানী কাঞ্চি দখল করেন। মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মন পিতার পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে চালুক্য রাজধানী বাতাপি আক্রমণ করেন এবং দ্বিতীয় পুলকেশী নিহত হন (৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে)। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ তাকে 'দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাট' বলেছেন। দ্বিতীয় পুলকেশীর মৃত্যুর পর পুত্রদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এবং ১৩ বছর চালুক্য সিংহাসন শূন্য থেকে।

প্রথম বিক্রমাদিত্য:

দ্বিতীয় পুলকেশীর পুত্র প্রথম বিক্রমাদিত্য ৬৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। তিনি চালুক্য রাজ্য থেকে পল্লবদের বিতাড়িত করে। তিনি তুঙ্গভদ্রা অতিক্রম করে পল্লব রাজ্য আক্রমণ করেন এবং পল্লব রাজধানী কাঞ্চি লুণ্ঠন করেন। তিনি চোল ও চেরদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন।


বিনয়াদিত্য:

প্রথম বিক্রমাদিত্যর পুত্র বিনয়াদিত্য সিংহাসনে বসে (৬৮১-৬৯৬ খ্রিস্টাব্দ) পল্লব, চোল, কেরল প্রভূতি বিরুদ্ধে অবিরাম সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তার সারা জিবন যুদ্ধে অতিবাহিত হয়।

বিজয়াদিত্য:

বিনয়াদিত্যর পর বিজয়াদিত্য সিংহাসনে বসেন (৬৯৬-৭৩৩ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি পল্লব-রাজ দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মনকে পরাজিত করে কাঞ্চি দখল করেন এবং পল্লব-রাজকে কর প্রদানে বাধ্য করেন। তিনি বিজাপুরের শিবমন্দির নির্মাণ করেন।

দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য:

বিজয়াদিত্যর পর তার পুত্র দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য (৭৩৩-৭৪৬ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে বসেন। তার আমলে ও চালুক্য-পল্লব দ্বন্দ্ব অব্যাহত ছিল। তিনি পল্লব রাজ নন্দীবর্মন-কে পরাজিত করে সাময়িকভাবে কাঞ্চি দখল করেন।

দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন:

এরপর সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় কীর্তিবর্মন (৭৪৬-৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)। চালুক্যদের সামন্ত রাষ্ট্রকুট-বংশীয় দন্তিদুর্গ কীর্তিবর্মনকে পরাজিত করে চালুক্য বংশ ধ্বংস করে। মহারাষ্ট্রে রাষ্ট্রকুট বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

(২) বেঙ্গির চালুক্য বংশ:

বাতাপির চালুক্য নৃপতি দ্বিতীয় পুলকেশী কৃষ্ণা গোদাবরী নদীর মোহনা অঞ্চলে অবস্থিত বেঙ্গি জয় করেন এবং নিজ ভাই বিষ্ণুবর্ধন-কে সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। কিছু দিন পর বিষ্ণুবর্ধন স্বাধীন হয়ে যায়। বেঙ্গির এই স্বাধীন চালুক্যরা বেঙ্গির চালুক্য নামে পরিচিত। চোলদের সঙ্গে বেঙ্গির চালুক্যরা বৈবাহিক সম্পর্ক আবদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত চালুক্যরা চোল বংশে মিশে যায় (১০৭০ খ্রিষ্টাব্দে)।

(৩) কল্যাণীর চালুক্য বংশ:

কল্যাণীর চালুক্যরা হল বাতাপি চালুক্য বংশের একটি শাখা। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বাতাপি চালুক্যদের বংশধর দ্বিতীয় তৈল রাষ্ট্রকুট-রাজ কার্ক-কে পরাজিত করে কল্যাণীর চালুক্য বংশের প্রতিষ্ঠা করে। হায়দ্রাবাদ রাজ্যর অন্তর্গত কল্যাণী ছিল এই রাজ্যর রাজধানী। দ্বিতীয় তৈলর পুত্র সত্যাশ্রয় সিংহাসনে বসেন। তার সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। সত্যাশ্রয় পুত্র দ্বিতীয় জয়সিংহ-র রাজত্বকালে কলচুরি-রাজ গাঙ্গেয়দেব, পারমার-রাজ ভোজ এবং চোল-রাজ রাজেন্দ্র চোল সম্মিলিত ভাবে চালুক্য রাজ্য আক্রমন করে। তিনি এই আক্রমণ প্রতিহত করেন। দ্বিতীয় জয়সিংহের পুত্র প্রথম সোমেশ্বর এর আমলে চোল-চালুক্য যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। প্রথম সোমেশ্বরের কনিষ্ঠ পুত্র ত্রিভুবনমল্ল বিক্রমাদিত্য বা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য কল্যাণীর চালুক্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। ১০৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য 'চালুক্য বিক্রমাদিত্য অব্দ' প্রবর্তন করেন। ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর সভাকবি বিলহন-এর বিক্রমাঙ্কদেবচরিত থেকে তার সম্পর্কে জানা যায়। তিনি চোল-রাজ কুলোতুঙ্গ-কে পরাজিত করেন। মিতাক্ষরা গ্রন্থের রচয়িতা বিজ্ঞানেশ্বর ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যর রাজসভা অলংকৃত করেন।

পতন:

ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য-র পর কল্যাণীর চালুক্য বংশের পতন শুরু হয়। একের পর এক অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সাম্রাজ্য-কে দুর্বল করে তোলে। এরপর দ্বাদশ শতকের শেষ ভাগে মহীশূরের হোয়েসল বংশ ও মহারাষ্ট্রের যাদব-বংশীয় রাজারা এই রাজ্যর বিভিন্ন অংশ দখল করে নিলে কল্যাণীর চালুক্য বংশের বিলুপ্তি ঘটে।
Advertisement advertise here