মগধের উত্থানের কারণ - Rise of Magadha Empire

- March 18, 2019
আর্যাবর্তে রাজনৈতিক প্রাধান্য লাভের সংগ্রামে মগধের সাফল্য অর্জন কোনও আকত্মিক ঘটনা নয়। বিভিন্ন কারণ পৃথকভাবে বা যুণভাবে এই উত্থানকে সম্ভব করে তােলে। এ প্রসঙ্গে ডঃ রামশরণ শর্মা, ডঃ ব্যাসাম ও ডঃ রােমিলা থাপার কয়েকটি কারণের উল্লেখ করেছেন।
Map of Magadha Empire
নিরাপদ দূরত্ব : অনিশ্চিত ও উপদ্রুত উত্তর পশ্চিম সীমান্ত থেকে বহুদূরে মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকায় অবস্থিত মগধের অধিবাসীরা নিরাপদ জীবনযাপন করত। বহিরাগত কোনও শক্তির পক্ষে এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এই অঞ্চলে পৌছানাে সহজসাধ্য ছিল না। সিন্ধু উপত্যকা থেকে এই মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকায় বসতি স্থাপন করতে আর্যদের কমপক্ষে দু’হাজার বছর সময় লেগেছিল। পারসিক ও ম্যাসিডােনীয় বাহিনীর পক্ষে এতদূরে পৌছানাে সম্ভব হয় নি। এই ভৌগােলিক দূরত্বজনিত নিরাপত্তার ফলে মগধের উত্থানের ধারা খণ্ডিত বা ব্যাহত হয় নি।

যোগ্য নেতৃত্ব : বিম্বিসার, অজাতশত্রু, শিশুনাগ, মহাপদ্ম নন্দ, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং অশােকের মতাে সমরকুশলী, দক্ষ ও উদ্যমী নেতৃবৃন্দের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে অজাতশত্রুর মন্ত্রী বাসসাকর, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মন্ত্রী কৌটিল্য এবং রাজর্ষি অশােকের মন্ত্রী রাধাগুপ্তের মতাে ভারতবিখ্যাত কুটনীতিবিশারদ মন্ত্রীদের ভূমিকাকে কোনওক্রমেই উপেক্ষা করা চলে না। বাসসাকরকে ম্যাকিয়াভেলির সঙ্গে তুলনা করা হয়, আর কৌটিল্য ছিলেন মৌর্য সাম্রাজ্যের নেপথ্য নায়ক। মন্ত্রীদের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা এবং রাজন্যবর্গের শৌর্য বীর্যের সমন্বয় মগধকে অপ্রতিহত করে তােলে।

ভৌগোলিক অবস্থান : রাজন্যবর্গের ব্যক্তিগত কুশলতা সর্বাংশে ব্যর্থ হত, যদি না মগধের ভৌগোলিক অবস্থান অনুকুল হত। গঙ্গা, শােন ও চম্পা নদীবেষ্টিত মগধ ছিল অতি সুরক্ষিত। মগধের প্রথম রাজধানী রাজগৃহ পাঁচটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় খুবই নিরাপদ ছিল। গঙ্গা, শােন ও গণ্ডক নদীর সংগমস্থলে অবস্থিত পাটলিপুত্র কার্যত দুর্ভেদ্য ছিল। পাটলিপুত্র ছিল একটি জলদুর্গ বিশেষ এবং সে যুগে এই নগরাটকে অধিকার করা আদৌ সহজসাধ্য ছিল না। চতুর্দিকে নদী থাকায় শত্রু দ্বারা পাটলিপুত্রের আক্রান্ত হওয়ার সস্তাবনা যেমন ছিল খুবই কম, তেমনি নদীপথ ধরে মগধের সেনাবাহিনী অবাধে চতুর্দিকে চলাফেরা করতে পারত।

মগধের অরণ্যে সম্পদ : মগধের পূর্বাঞ্চলে ছিল হস্তিসংকুল ঘন অরণ্য। এই অরণ্য ভেদ করে শক্রর পক্ষে মগধ আক্রমণ করা দুঃসাধ্য ছিল, কিন্তু ওই অরণ্য থেকেই হস্তি সংগ্রহ করে নন্দ রাজার বিশাল রণহস্তিবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। মগধের সেনাবাহিনীর প্রধান অঙ্গই ছিল হস্তিবাহিনী। সুশিক্ষিত হস্তির মাধ্যমে বর্ষায় দুর্গম কর্দমাক্ত এলাকার মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীর রসদ পরিবহন করা, রণহস্তির সাহায্যে বিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যুহকে চুর্ণ বিচুর্ণ করা এবং সর্বোপরি শত্রুবাহিনীর মধ্যে ত্রাস সঞ্চার করা মগধের পক্ষে সহজসাধ্য হয়। ধননন্দের রণহন্তি বাহিনীর ভয়েই বােধ হয় গ্রিক বীর আলেকজাতারের বিশ বিশ্ববিজয়ী সেনাদল বিপাশার পূর্বদিকে অগ্রসর হতে অস্বীকৃত হয়।

উর্বর ভূমি : গঙ্গা নদী ছিল মগধের হিৎপিন্ড। গঙ্গা ও অন্যান্য নদীগুলি মগধকে উর্বরা এবং সুজলা সুফলা করেছিল। এই অঞ্চলে নানা জাতের ধানচাষ হত এবং বছরে দু'বার জমিতে ফসল উৎপন্ন হত। উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদনের দ্বারা যেমন বিশাল সেনাবাহিনীর ভরণ পােষণ সহজতর হয়। ডঃ রােমিলা থাপার বলেন যে, কৃষির উপর নির্ভর করেই মগধে প্রথম সাম্রাজ্য গঠনের সম্ভাবনা দেখা দেয়।

বৈদেশিক বাণিজ্য : নদীগুলির উপর একচ্ছত্র অধিপত্যের ফলে প্রতিবেশী রাজ্যগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মগধের পক্ষে সহজতর হয়েছিল এবং এই নদীর মাধ্যমেই মগধের বৈদেশিক বাণিজ্য চলত। গঙ্গার পথ ধরে মগধের বণিকরা বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ ভারত ও দূরপ্রাচ্যে পাড়ি দিত। জলপথ ছাড়াও স্থলপথে মগধের বণিকরা কাশ্মীর ও গান্ধারে চলে যেত। জাতক এ সমুদ্রপথে ও স্থলপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক সম্ভারপূর্ণ বড়াে বড়াে শকটের মিছিলের উল্লেখ আছে।

খনিজ সম্পদ : খনিজ সম্পদে পূর্ণ মগধের তামা ও লােহার খনিগুলি ছিল মগধের আর্থিক সমৃদ্ধি ও সামরিক শক্তির প্রধান সহায়। কেবলমাত্র দৈনন্দিন জীবনে নয়, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে লােহা ও তামার ব্যাপক ব্যবহার তৎকালীন মগধে প্রচলিত ছিল। কৌটিল্যর মতে, মগধের লৌহখনিগুলি ছিল তার সামরিক শক্তির গর্ভগৃহ।

মিশ্র সংস্কৃতি : মগধের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণকে প্রসারিত করে। মগধের সীমানার দুই পাশে ছিল আর্য ও অনার্য দুই পৃথক সংস্কৃতির আবাসস্থল। এর ফলে মগধে এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। মানুষের চিত্তবৃত্তি উদার ও উন্নত হয়। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কঠোরতা এখানে অনেক শিথিল হয়ে পড়ে এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উদারতা জনজীবনকে প্রভাবিত করে। আর্য মানসিকতা ও অনার্য বাহুবলের মিলনে মগধ দুর্বার হয়ে ওঠে।

আদর্শবাদ : যুগ যুগ ধরে ভারতীয় রাজন্যবর্গ এক ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্ন দেখতেন। তারা সম্রাট, একরাট, বিরাট, সার্বভৌম, রাজচক্রবর্তী প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করতেন। মগধের রাজন্যবর্গও এই আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও অশােকের আমলে এই আদর্শ পূর্ণতা পায়।
Advertisement