PayPal

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন

author photo
- Friday, March 15, 2019

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রাচীন ভারতের শেষ সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য। খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকের শেষভাগ থেকে পতন শুরু হয় এবং খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে কোন সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী হয় না। তবে গুপ্ত সাম্রাজ্যর পতনের কারণ ছিল একাধিক।

রাজপুত্রদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দুর্বলতা : গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর পুরুগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্তের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিবাদ দেখা যায় এবং শেষ পর্যন্ত স্কন্দগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। স্কন্দগুপ্তের মৃত্যুর পর পুরুগুপ্ত ও স্কন্দগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের মধ্যে গৃহযুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পুরুগুপ্ত জয়ী হন। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে গুপ্ত সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া স্কন্দগুপ্তের পরবর্তী শাসকগণ ছিল দুর্বল ও অযোগ্য।

ধর্মীয় কারণ : প্রথম দিকে গুপ্ত রাজারা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন, পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। প্রথম কুমারগুপ্ত বৌদ্ধ ধর্মে প্রভাবিত হয় এবং মুদ্রায় সন্ন্যাসীর সাঁজে দেখা যায়। স্কন্দগুপ্ত ও তার রানী যুবরাজ বালাদিত্যকে অধ্যায়নের জন্যে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বসুবন্ধুর কাছে পাঠান। হিউয়েন সাঙ এর বিবরণ থেকে জানা যায়, হুন নেতা মিহিরকুল ভারত আক্রমণ করলে রাজা বালাদিত্য যুদ্ধ না করে জঙ্গলে আশ্রয় করেন। বলা হয় যে মিহিরকুল পরাজিত হয়ে বন্দী হলে তিনি মায়ের অনুরোধে বন্দী হুন নেতাকে মুক্তি দেন। গুপ্ত রাজারা বৈষ্ণব ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বুধগুপ্ত, তথাগতগুপ্ত, নরসিংহগুপ্ত প্রমুখ রাজারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে।

সমন্তপ্রথা : গুপ্ত যুগের প্রথম দিকের এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা ধীরে ধীরে আধা-সামন্ততান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোেয় রূপান্তরিত হয়। গুপ্ত রাজারা ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য কর্মচারীদের গ্রাম ও ভূমিদান করতেন। এইসব অঞ্চলের শাসন, বিচার, শান্তিরক্ষা, আর্থিক কর্তৃত্ব এমনকী রাজার একচেটিয়া অধিকার , খনি প্রভৃতির উপরেও সামন্তদের কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়। এইভাবে কর্তৃত্ব হস্তান্তর এবং সামন্তদের সংখ্যা ও স্বাধীনতা বৃদ্ধি রাজ কর্তৃত্বকে বহুল পরিমাণে খর্ব করে। গুজরাটের মৈত্রক ও কনৌজের মৌখরি বংশ এবং মান্দাশােরের যশাধর্মন , মহারাজ সুবন্ধু শক্তিশালী সামন্তরাজা ছিলেন।

সেনাবাহিনীর অভাব : গুপ্তদের কোনও স্থায়ী সৈন্যবাহিনী ছিল না। সমুদ্রগুপ্তের বিজয়াভিযানের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়, কিন্তু তার সেনাবাহিনীর কথা কোথাও উল্লেখ নেই। সেনাবাহিনীর জন্য গুপ্তরা সম্পূর্ণভাবে সামন্তদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন — সম্রাটের প্রয়ােজনে সামন্তরা সেনা পাঠাতেন। যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সরঞ্জাম হাতি ও ঘােড়ার উপরেও সম্রাটের কোনও অধিকার ছিল না। এই অবস্থায় কোনও সাম্রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব ছিল না এবং গুপ্তদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।

প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা : বৈদেশিক আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্যের দুর্বলতা ও গােলযােগের সুযােগ নিয়ে মান্দাশােরের শাসনকর্তা যশােধর্মন গুপ্ত আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। এবং অচিরেই কনৌজে মৌখৱি বংশ, বলভীতে মৈত্রক বংশ, থানেশ্বরে বর্ধন বংশ এবং অন্যান্য প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন। স্কন্দগুপ্তের পর অর্থাৎ ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দের পর পশ্চিম মালৰ বা সৌরাষ্ট্র কোথাও গুপ্তদের মুদ্রা বা শিলালিপি পাওয়া যায় নি। পঞ্চম শতকের শেষদিকে প্রায় সমগ্র পশ্চিম ভারত গুপ্তদের কর্তৃত্বের বাইরে চলে যায়। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে হৃন আক্রমণ নয় , প্রকৃতপক্ষে যশােধর্মন - ই গুপ্ত সাম্রাজ্যের উপর মৃত্যু - আঘাত হেনেছিলেন।

অর্থনৈতিক বিপর্যয় : বহিঃশত্রুর আক্রমণে সাম্রাজ্যের আর্থিক বুনিয়াদ ভেঙে পড়েছিল। হূন আক্রমণে বিপর্যস্ত স্কন্দগুপ্ত তার রাজত্বের শেষদিকে খাদ মেশানো স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করতে বাধ্য হন। এছাড়া গুপ্ত শাসনের শেষদিকে তামা ও রূপার মুদ্রা অপেক্ষা সাম্রাজ্যে স্বর্ণমুদ্রার আধিক্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ইঙ্গিত বহন করে। ৪৭০ খ্রিস্টাব্দে একদল পশম শিল্পী গুজরাট থেকে মালবে এসে অনুৎপাদক পেশায় নিয়ােজিত হয়। এর থেকে মনে হয় যে, এ সময় তাদের তৈরি পশমবস্ত্রের আর চাহিদা ছিল না। গুজরাটের ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় সাম্রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিনাংশুকের আবিষ্কার ভারতের রেশম বাণিজ্যে তীব্র আঘাত হানে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ - পঞ্চম শতকে বর্বর আক্রমণের ফলে রােম সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং রােমের সঙ্গে বাণিজ্য নষ্ট হলে ভারতীয় অর্থনীতি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বৈদেশিক আক্রমণ : পুষ্যমিত্র, বাকাটক ও হুন জাতির ক্রমাগত আক্রমণে সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রথম কুমারগুপ্তের আমলে পুষ্যমিত্রদের আক্রমণ ভয়ঙ্কর আকৃতি ধারণ করে। বুধগুপ্তের আমল থেকে বাকাটক জাতি সাম্রাজ্য আক্রমণ করতে শুরু করলে মধ্য ভারতে গুপ্ত আধিপত্য প্রবলভাবে খর্ব হয়। স্কন্দগুপ্ত ও তাঁর পরবর্তীকালে হুনদের ক্রমাগত আক্রমণে গুপ্ত সাম্রাজ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এর মতে, হূন আক্রমণে সাম্রাজ্য হীনবল হয়ে পড়ে, সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের শাসনকর্তারা বিদ্রোহে অনুপ্রাণিত হন।