গুপ্ত পরবর্তী যুগ - উত্তর ভারত।

author photo
- Wednesday, March 06, 2019
advertise here

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান - উত্তর ভারত।

বলভীর মৈত্রিক বংশ (The Maitrakas of Valabhi):

গুপ্তদের সেনাপতি ভট্টারক পশ্চিম ভারতের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে বলভীর মৈত্রক বংশের প্রতিষ্ঠা করেন । এই বংশের কয়েকজন উল্লেখযোগ্য শাসক হলেন ধরসেন, দ্রোনসিংহ, প্রথম ধ্রুবসেন, ধরপত্ত, গুহসেন, দ্বিতীয় ধরসেন, প্রথম শিলাদিত্য, দ্বিতীয় ধ্রুবসেন ও চতুর্থ ধরসেন। দ্বিতীয় ধ্রুবসেন কনৌজের অধিপতি পুষ্যভূতি বংশীয় হর্ষবর্ধনের হাতে পরাজিত হন। এই বংশের প্রথম স্বাধীন নরপতি ছিল প্রথম শিলাদিত্য। বলভীর রাজারা শৈব ছিলেন।


মান্দাশোরের যশোধর্মন (Yasodharmana of Mandasore):

গুপ্ত বংশের পতনের সুযোগে মান্দাশোরের যশোধর্মন নামে একজন সামন্তরাজ শক্তিশালী হয়ে ওঠেন এবং পশ্চিম মালবে এক শক্তিশালী স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজধানী ছিল দাশপুর বা মান্দাশোর। যশোধর্মন ৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দে হুন রাজ মিহিরকুল-কে পরাজিত করেন। মান্দাশোর লিপি থেকে জানা যায় যশোধর্মন সম্ভবত ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে আরব সাগর পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই রাজবংশের পতন ঘটে।

মৌখরী বংশ (The Maukharies):

গুপ্ত পরবর্তী যুগে মগধের পরিবর্তে কনৌজ ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। মৌখরীরা একটি প্রাচীন ক্ষত্রিয় রাজবংশ। হরিবর্মন মৌখরী বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। হরিবর্মন মহারাজা উপাধি ধারণ করেন। কনৌজের মৌখরী বংশের রাজারা হলেন হরিবর্মন, আদিত্যবর্মন, ঈশ্বরবর্মন, ঈশানবর্মন, সর্ববর্মন ও অবন্তীবর্মন। মৌখরী বংশের প্রথম স্বাধীন রাজা ঈশানবর্মন অন্ধ্র, উড়িষ্যা, মগধ ও গৌড় দখল করেন। মৌখরী বংশের শেষ রাজা ছিলেন গ্রহবর্মন। গ্রহবর্মন থানেশ্বরের পূষ্যভূতি বংশের রাজা প্রভাকরবর্মনের কন্যা রাজ্যশ্রী-কে বিবাহ করেন। গ্রহবর্মণ গৌড়রাজ শশাঙ্কের হাতে পরাজিত ও নিহত হন। পরবর্তীকালে হর্ষবর্ধন কনৌজ নিজ রাজ্যভুক্ত করেন।

কামরূপ (The Kingdom of Kamarupa):

বর্তমান আসাম অতি প্রাচীন অঞ্চল। প্রাচীন যুগে এই অঞ্চলটি কামরূপ নামে পরিচিত ছিল। এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায়, সমুদ্রগুপ্ত পুষ্যবর্মনকে কামরূপের শাসক নিযুক্ত করে। গুপ্ত সাম্রাজ্যর দুর্বলতার সুযোগে কামরূপ রাজ ভূতিবর্মন স্বাধীনতা ঘোষণা করে। তিনি দাভক বা ঢাকা এবং সুরমা উপত্যকা বা শ্রীহট্ট জয় করেন। সুস্থিবর্মন মহাসেনগুপ্তের হাতে পরাজিত হন। এরপর সিংহাসনে বসেন ভাস্কর বর্মন। তার মৃত্যুর পর কামরূপ রাজবংশের অবসান হয়।

থানেশ্বরের পুষ্যভুতিবংশ (The Pushyabhutis of Thaneswar):

থানেশ্বরের পুষ্যভুতি বংশের রাজা প্রভাকরবর্ধনের কনিষ্ঠ পুত্র হর্ষবর্ধন এক চরম সংকট মুহুর্তে সিংহাসনে বসেন। তিনি একই সময়ে থানেশ্বর ও কনৌজের সিংহাসন লাভ করেন। তিনি ভগিনী রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার করে শশাঙ্কর কাছ থেকে। শশাঙ্কর মৃত্যুর পর তিনি মগধ, গৌড়, ওড়িশা ও কঙ্গোদ নিজ রাজ্যভুক্ত করে। তিনি বলভীরাজ ধ্রুবসেন-কে যুদ্ধে পরাজিত করেন। হর্ষবর্ধন তাঁর কন্যার সঙ্গে ধ্রুবসেনের বিবাহ দেন এবং বলভীর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। এদিকে চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর হাতে হর্ষবর্ধনের পরাজয়ের ফলে তাঁর দক্ষিণ ভারত অভিযান ব্যর্থ হয়। উত্তর ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল তিনি কুক্ষিগত করেছিলেন বলে চালুক্য লিপিতে তাঁকে “সকলোত্তরপথনাথ” বলা হয়েছে। হিউয়েন সাং তাঁকে “পঞ্চভারতের অধিপতি” বলে উল্লেখ করেছেন। উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে নর্মদা পর্যন্ত এবং পূর্বে গঞ্জাম থেকে পশ্চিমে বলভী পর্যন্ত সমগ্র এলাকা হর্ষবর্ধনের অধীন ছিল । দয়ালু, ধর্মনিরপেক্ষ, শিক্ষানুরাগী ও বিদ্যোৎসাহী নরপতি হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি রত্নাবলী ও প্রিয়দর্শিকা নামে দুটি নাটক রচনা করে ছিলেন। তার সভাকবি ছিল বানভট্ট। বানভট্ট রচিত হর্ষচরিত গ্রন্থ থেকে হর্ষবর্ধন সম্পর্কে জানা যায়।



গুর্জর প্রতিহার (The Gurjara Pratiharas):

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর প্রতিহার বংশ উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। প্রতিহার বা গুর্জররা ছিল রাজপুত জাতির একটি শাখা। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিল হরিচন্দ্র, কিন্তু বৎসরাজের আমলেই প্রতিহাররা একটি সর্বভারতীয় শক্তিতে উন্নীত হয়। বৎসরাজ ধর্মপাল ও ধ্রুবর সঙ্গে কনৌজের দখল নিয়ে ত্রি-শক্তি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়। তিনি ধর্মপালকে পরাজিত করে এবং ধ্রুবর হাতে পরাজিত হন। বৎসরাজের পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় নাগভট্টের আমলেও ত্রি-শক্তি সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। এ ক্ষেত্রে ধর্মপাল পরাজিত হলেও রাষ্ট্রকূট রাজ তৃতীয় গোবিন্দের হাতে নাগভট্টের পরাজয় ঘটে। প্রথম ভোজ বা মিহিরভোজ ছিলেন এই বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা। কনৌজের অধিকার নিয়ে যে ত্রি-শক্তি সংঘর্ষ চলছিল, তাতে শেষ পর্যন্ত প্রতিহাররা জয়লাভ করে ও তারা কনৌজ অধিকার করে। কিন্তু মহীপালের আমলে রাষ্ট্রকূট রাজ তৃতীয় ইন্দ্র কনৌজ ধ্বংস করে প্রয়াগ পর্যন্ত অগ্রসর হন। মহীপালের পর প্রতিহারদের পতন শুরু হয়। সুলতান মামুদ কনৌজ লুন্ঠন করেন। চান্দেলদের হাতে প্রতিহারদের পতন সম্পূর্ণ হয়।

হর্ষবর্ধনের পরবর্তী যুগে উত্তর ভারত (Post-Harsha Northern India):

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য বিনষ্ট হয়। এবং ধীরে ধীরে কনৌজ, কাশ্মীর, বাংলা, রাজপুত, আজমির, দিল্লির চৌহান বংশ, চান্দেল, চেদী ও পারমার প্রভুতি রাজ্য স্বাধীন হয়ে যায়। এই সময় কাশ্মীরের ইতিহাস ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সম্রাট অশোক ও কণিষ্ক রাজত্বকালে কাশ্মীর মৌর্য ও কুষাণ সাম্রাজ্যর অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বাদশ শতকে রচিত কলহন-এর রাজতরঙ্গিনী থেকে কাশ্মীরের ইতিহাস জানা যায়।

ক) কনৌজ (Kanauj):

হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর কনৌজের সিংহাসনে বসেন অর্জুন নামে এক মন্ত্রী। তিব্বত-রাজ স্ট্র-সান-গাম্ফো অর্জুনকে পরাজিত করে চিনে পাঠান। এরপর কনৌজের ইতিহাস অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই সময় ৭০০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন যশোবর্মন। যশোবর্মন-এর সভাকবি ছিলেন বাকপতিরাজ। তার রচিত গ্রন্থ গৌড়বহো থেকে যশোবর্মন সম্পর্কে জানা যায়।


১) কাশ্মীরের কর্কট বংশ:

কাশ্মীরের সামন্ত রাজা দুর্লভবর্ধন কাশ্মীরে কর্কট বা নাগ বংশের প্রতিষ্ঠা করে। দুর্লভবর্ধনের শাসন কলে হিউয়েন সাঙ কাশ্মীরের আসেন। দুর্লভবর্ধনের পুত্র দ্বিতীয় প্রতাপাদিত্য প্রতাপপুর নগর প্রতিষ্ঠা করে। এরপর সিংহাসনে বসেন চন্দ্রাপীর তিনি আরব আক্রমন প্রতিরোধ করেন। চীন সম্রাট চন্দ্রাপীড়-কে মহারাজ উপাধি দেন। তিনি নিজ ভাই তারাপীড়-এর হাতে নিহত হন। কর্কট বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন ললিতাদিত্য মুক্তাপীড়। এরপর সিংহাসনে বসেন জয়াপীড় বিনয়াদিত্য। খ্রিষ্টীয় নবম শতকের মাঝামাঝি কর্কট বংশের অবসান হয়।

২) কাশ্মীরের উৎপল বংশ:

অবন্তীবর্মন কাশ্মীরে উৎপল বংশের প্রতিষ্ঠা করে। অবন্তীবর্মন কাশ্মীরে অবন্তীপুর নগর প্রতিষ্ঠা করে। অবন্তীবর্মন-র মন্ত্রী ছিল সূর্য। অবন্তীবর্মন বৈষ্ণব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। এর পর কাশ্মীরের সিংহাসনে বসেন শঙ্করবর্মন, গোপালবর্মন, পার্থবর্মন। পার্থবর্মনকে সরিয়ে চক্রবর্মন নামে এক ব্যক্তি সিংহাসনে বসে। চক্রবর্মন আততায়ী হাতে নিহত হলে দ্বিতীয় অবন্তীবর্মন কাশ্মীরের সিংহাসনে বসেন। তিনি উন্মাদ অবন্তী নামে পরিচিত। সেনাপতি কমলবর্মন দ্বিতীয় অবন্তীবর্মন-কে সিংহাসনচ্যুত করে ৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে যশস্কর নামে এক ব্যক্তি সিংহাসনে আরোহণ করেন। যশস্করের মৃত্যুর পর প্রভোগুপ্ত নামে এক মন্ত্রী সিংহাসনে বসেন। এরপর একে একে ক্ষেমগুপ্ত, অভিমুন্য ও দিদ্দা (রাজমাতা) সিংহাসনে বসেন। ১০০৩ সালে সংগ্রামরাজ দিদ্দা-কে হত্যা করে কাশ্মীরে লহোর বংশের প্রতিষ্ঠা করে।

৩) কাশ্মীরের লহোর বংশ:

লহোর বংশের প্রতিষ্ঠা করেন সংগ্রামরাজ। তিনি সুলতান মামুদ নিকট পরাজিত হন। লহোর বংশের পরবর্তী রাজারা হলেন হরিরাজ, অনন্ত, হর্ষ ও জয়সিংহ। জয়সিংহ ছিল লহোর বংশের শ্রেষ্ট রাজা। ১৯৩৯ সালে শাহমীর নামে মুসলিম কাশ্মীরে হিন্দু শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।

ট্যাগ: ভারতে আঞ্চলিক শক্তির আত্মপ্রকাশ : সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর। উত্তর ভারতে আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ : ছোটো প্রশ্ন ও উত্তর।
Advertisement advertise here