দক্ষিণ ভারতের পল্লব রাজবংশ

- March 09, 2019
খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের প্রথমার্ধে সাতবাহন সাম্রাজ্যের পতনের পর কৃষ্ণা নদীর তীরে কাঞ্চি নগরকে কেন্দ্র করে পল্লব রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পল্লবদের উৎপত্তি বা আদি পরিচয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা একমত নন। খ্রিস্টীয় তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের তামিল সঙ্গম সাহিত্য বা অশােকের শিলালিপিতে পল্লবদের কোনও উল্লেখ নেই পল্লবদের প্রাচীন লিপিগুলিতে তামিলের পরিবর্তে প্রথমে প্রাকৃত এবং পরে সংস্কৃতের ব্যবহার দেখা যায়। তারা উত্তর ভারতের রাজাদের মতাে অশ্বমেধ যজ্ঞ করতেন। তাদের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে অর্থশাস্ত্র নির্ভর সাতবাহন শাসনব্যবস্থার যথেষ্ট মিল আছে। এইসব কারণে বলা যায় যে, পল্লবরা ঠিক দক্ষিণ ভারতের লােক নয় — তারা উত্তর ভারতের অধিবাসী এবং ব্রাহ্মণদের সঙ্গে সম্পর্কিত। ডঃ জয়সয়াল এর মতে পল্লবরা দ্রাবিড় নয়। প্রকৃতপক্ষে তারা উত্তর ভারতের অধিবাসী ব্রাহ্মণ বাকাটকদের একটি শাখা। তারা ছিল পেশাদার যােদ্ধা এবং তারা বাহুবলের দ্বারা দক্ষিণ ভারতে একটি রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়। বলা বাহুল্য, তেলেগুণ্ডা লিপি এই ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করে প্রমাণ করেছে যে পল্লবরা ছিল ক্ষত্রিয়। ডঃ কৃষ্ণস্বামী আয়েঙ্গার এর মতে পল্লবরা বিদেশি নয়। তারা সাতবাহনদের সামন্ত ছিল এবং সাতবাহনদের দুর্বলতার সুযােগে দক্ষিণ ভারতে স্বাধীন পল্লব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।
mahabalipuram in Chengalpattu
খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকে পল্লব রাজ্যের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এই বংশের প্রথম নৃপতি ছিলেন শিবস্কন্দবর্মন। কৃষ্ণা নদী থেকে বেলারি জেলা পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিল। কাঞ্চি ছিল তার রাজধানী। তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। শিবস্কন্দবর্মনের পর দীর্ঘদিন পল্লবদের কোনও প্রামাণিক ইতিহাস পাওয়া যায় নি। এরপর খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিষ্ণুগোপ এর নাম পাওয়া যায়। গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত দাক্ষিণাত্যের যে সব রাজাকে পরাজিত করেছিলেন, তাদের অন্যতম ছিলেন কাঞ্চির বিষ্ণুগোপ। তৃতীয় সিংহবর্মন পল্লব বংশের একজন শাসক। যিনি খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রাজত্ব করেছিলেন। তিনি সিংহবিষ্ণুর পিতা ও পূর্বসূরি। তাঁর রাজত্বের কোনও অবশিষ্টাংশ বা শিলালিপি নেই। তৃতীয় সিংহবর্মন সম্পর্কে তথ্যের একমাত্র উৎস হল তার পৌত্র প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের ভাইয়ালুর অনুদানের একটি বংশপঞ্জক। পরবর্তী দুশাে বছরে ১৫ জন পল্লবরাজার নাম জানা গেলেও তাদের কৃতিত্ব সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় নি।

সিংহবিষ্ণু (৫৭৫-৬০০ খ্রিস্টাব্দ): ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহবিষ্ণু কাঞ্চির সিংহাসনে বসেন এবং এ সময় থেকেই পল্লবদের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাস জানা যায়। ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহবিষ্ণুর আমল থেকেই তাদের প্রতিপত্তি ও গৌরবময় যুগের সূচনা হয়। কৃষ্ণা থেকে কাবেরী পর্যন্ত তার আধিপত্য স্থাপিত হয়। সুদূর দক্ষিণের পাণ্ড্য, চের ও চোল রাজ্য তার বশ্যতা স্বীকার করে। তার আমল থেকেই চালুক্য শক্তির সঙ্গে পল্লবদের বিবাদের সূচনা হয়, যা দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসকে একশাে বছর ধরে প্রভাবিত করে। কথিত আছে যে, তিনি সিংহলের বিরুদ্ধেও সামরিক অভিযান পাঠিয়েছিলেন। তিনি বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তার আমলে মহাবলীপুরম শিল্পচর্চার এক বিখ্যাত কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিরাতার্জুনীয়ম গ্রন্থের রচয়িতা বিখ্যাত কবি ভারবি তার সভাকবি ছিলেন।

প্রথম মহেন্দ্রবর্মন (৬০০-৬৩০ খ্রিস্টাব্দ): ৬০০ খ্রিস্টাব্দে সিংহবিষ্ণুর পুত্র প্রথম মহেন্দ্রবর্মন সিংহাসনে বসেন। তার আমলে পল্লব-চালুক্য সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। তুঙ্গভদ্রা নদীর উত্তরে ছিল চালুক্য এবং দক্ষিণে পল্লব রাজ্য। একে অপরের শক্তিবৃদ্ধিতে এরা পরস্পরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। প্রথম মহেন্দ্রবর্মন চালুক্য-রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর হাতে পরাজিত হন এবং বেঙ্গি প্রদেশটি তার হস্তচ্যুত হয়। বিবিধ গুণাবলীর অধিকারী মহেন্দ্রবর্মন ত্রিচিনপল্লি, আর্কট ও চিঙ্গলপেট জেলায় বহু সুদৃশ্য মন্দির নির্মাণ করেন। তিনিই প্রথম ইট ও কাঠের পরিবর্তে পাহাড় কেটে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবেও তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সঙ্গীতশাস্ত্রের উপর গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত ব্যঙ্গ নাটক মত্তলাস প্রহসন সংস্কৃত ভাষায় তার দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি চিত্রকলার পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তিনি গুণভার উপাধি ধারণ করেন। ভারবি, দণ্ডিন প্রমুখ গুণী সাহিত্যিকরা তার পৃষ্ঠপােষকতা অর্জন করেন। ধর্মীয় দিক থেকে তার উদারতার অভাব ছিল না। তিনি প্রথম জীবনে জৈনধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং পরে শৈবধর্ম গ্রহণ করেন। তার বিবিধ গুণাবলীর জন্য জনসাধারণ তাকে বিচিত্রচিত্ত বলে অভিহিত করে। বহু মন্দির নির্মাণের জন্য তিনি চৈত্য কারী বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি পল্লবমল্ল নামেও পরিচিত ছিলেন।

প্রথম নরসিংহবর্মন (৬৩০-৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ): প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের পুত্র পল্লব বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা প্রথম নরসিংহবর্মন ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। তিনি মহামল্ল উপাধি ধারণ করেন। চালুক্য রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীকে তিনি একাধিকবার যুদ্ধে পরাস্ত করেন, এমনকী তুঙ্গভদ্রা অতিক্রম করে তিনি চালুক্য রাজধানী বাতাপি অধিকার করেন এবং বাতাপিকণ্ডো উপাধি নেন। যুদ্ধে দ্বিতীয় পুলকেশী নিহত হন। প্রথম নরসিংহবর্মনের রাজত্বের শেষদিকে দ্বিতীয় পুলকেশীর পুত্র প্রথম বিক্রমাদিত্যের নেতৃত্বে চালুক্যশক্তির পুনরুত্থান ঘটে। তার কাছে প্রথম নরসিংহবর্মন পরাজিত হন এবং তিনি চালুক্য রাজ্যের বেশ কিছু অংশ পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। নরসিংহবর্মন দক্ষিণে চোল, পাণ্ড্য, কেরল, কলভ্র শক্তিকে পরাস্ত করেন এবং দুবার সিংহলে নৌ অভিযান পাঠিয়ে তার অনুগত মানববর্মনকে সিংহলের সিংহাসনে বসান। বৌদ্ধগ্রন্থ মহাবংশতে এই যুদ্ধের বিবরণ পাওয়া যায়। পিতার মতােই তিনি বিদ্যা, বিদ্বান ও শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তাঁর আমলে বহু মন্দির তৈরি হয়। মহাবলীপুরমের বিখ্যাত রথ মন্দিরগুলি তার আমলেই তৈরি হয়। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী কাঞ্চিতে আসেন। সংস্কৃত শিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র পল্লব রাজধানী কাঞ্চি ছিল ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নগর।

প্রথম পরমেশ্বরবর্মন (৬৭০-৬৯৫ খ্রিস্টাব্দ): প্রথম নরসিংহবর্মনের পুত্র দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মনের (৬৬৮-৬৭০ খ্রিস্টাব্দ) দুবছর রাজত্বের পর ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পরমেশ্বরবর্মন সিংহাসনে বসেন। এই সময় আবার চালুক্য-পল্লব দ্বন্দ্ব প্রবল আকার ধারণ করে। চালুক্য-রাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর পুত্র প্রথম বিক্রমাদিত্য চালুক্য রাজ্য থেকে সকল পল্লব সেনা বিতাড়িত করেন। তুঙ্গভদ্রা অতিক্রম করে তিনি পল্লব রাজধানী কাঞ্চি দখল করেন এবং ত্রিচিনােপল্লি পর্যন্ত অগ্রসর হন। প্রথম পরমেশ্বরবর্মন অবশ্য শেষ পর্যন্ত কাঞ্চি পুনর্দখলে সক্ষম হন। তিনি শৈব ধর্ম বিশ্বাসী ছিলেন এবং কাঞ্চিতে একটি সুরম্য শিবমন্দির নির্মাণ করেন।

দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন (৬৯৫-৭২২ খ্রিস্টাব্দ): প্রথম পরমেশ্বরবর্মনের পুত্র দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে রাজসিংহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তার রাজত্বকাল শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং শান্তিপূর্ণ বৈদেশিক নীতির জন্য বিখ্যাত। তার আমলে বিখ্যাত কৈলাসনাথের মন্দির তৈরি হয় এবং তিনি মহাবলীপুরমের মন্দিরগুলির নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ করেন। তার রাজত্বকালে পল্লব স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে যে নতুন শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে তার নাম রাজসিংহ রীতি। তিনি শৈব ধর্মের অনুরাগী ছিলেন। তিনি সংগীতশাস্ত্র ও হস্তিবিদ্যায় বিশেষ দক্ষ ছিলেন। কাঞ্চিতে সংস্কৃত বিদ্যাচর্চায় তার বিশেষ অবদান ছিল। বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত দণ্ডি সম্ভবত তার সভাকবি ছিলেন।

দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন (৭২২-৭৩০ খ্রিস্টাব্দ): দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনের পুত্র ৭২২ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন সিংহাসনে বসেন। তার আমলে চালুক্যরা কাঞ্চি আক্রমণ করে,দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন আত্মসমর্পণ করে এবং অবমাননাকর পরিস্থিতি মেনে নিতে হয়। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মণ চালুক্য রাজ্যে আক্রমণ করে কিন্তু দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য এর নিকট পরাজিত হয়ে ৭৩০ খ্রিস্টাব্দে নিহত হন। এবং পল্লব সাম্রাজ্য থেকে সিংহবিষ্ণুর বংশধরের অবসান হয়।

দ্বিতীয় নন্দীবর্মন (৭৩০-৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ): রাজা দ্বিতীয় নদীবর্মন পল্লবমল্ল নামে পরিচিত ছিলেন। তার পিতা ছিলেন হিরন্যবর্মন। রাজত্বের প্রথমদিকে তাকে পাণ্ড্যদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়। পল্লব শক্তির দুর্বলতার সুযােগ নিয়ে চালুক্য-রাজ দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য দ্বিতীয় নন্দীবর্মনকে পরাজিত করে কাঞ্চি দখল করেন এবং কাঞ্চির সিংহাসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী চিত্রমায়া-কে প্রতিষ্ঠা করেন। চিত্রমায়া প্রায় কুড়ি বছর পল্লব রাজ্য শাসন করেন। এ সময় দ্বিতীয় নন্দীবর্মন রাষ্ট্রকূট-রাজ দন্তিদুর্গের আশ্রয়ে ছিলেন। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় নন্দীবর্মনের এক অনুগত সেনাপতি চিত্রমায়াকে হত্যা করলে (৭৪৬ খ্রিঃ) দ্বিতীয় নন্দীবর্মন আবার পল্লব সিংহাসন দখল করেন। সিংহাসনে বসে তিনি চালুক্য রাজ্য আক্রমণ করেন। চালুক্য রাজ কীর্তিবর্মন পরাজিত হন। দাক্ষিণাত্যে রাষ্ট্রকুট শক্তির উত্থান ঘটে। দ্বিতীয় নন্দীবর্মন বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি মুক্তেশ্বরের মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

দন্তিবর্মন (৭৯৬-৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ): দ্বিতীয় নন্দীবর্মনের পুত্র দন্তিবর্মন সিংহাসনে বসেন। তিনি ৭১ বছর রাজত্ব করেন। তার আমল থেকে পল্লব বংশের পতন শুরু হয়। দক্ষিণ ভারতে পাণ্ড্যদের প্রবেশের ফলে পল্লব সাম্রাজ্য ছোট হতে থাকে। ৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে রাষ্ট্রকুট বংশের রাজা প্রথম ধ্রুব দন্তিবর্মনকে পরাজিত করে কাঞ্চি প্রবেশ করে।

তৃতীয় নন্দীবর্মন (৮৪৬-৮৬৯ খ্রিস্টাব্দ): এরপর দন্তিবর্মনের পুত্র তৃতীয় নন্দীবর্মন সিংহাসনে বসেন তৃতীয় নন্দীবর্মণ একজন শক্তিশালী রাজা ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রকুট এবং গঙ্গাদের সাথে জোট করেছিলেন এবং তেলালারু যুদ্ধে পান্ড্যদের পরাজিত করেছিলেন। এরপরে তিনি বৈগাই নদী অবধি পিছু হটে পাণ্ড্য সেনাবাহিনীকে অনুসরণ করেছিলেন। এরপর পুনরায় পাণ্ড্য রাজা শ্রীমার শ্রীবল্লভ পল্লব রাজ তৃতীয় নন্দীবর্মনকে কুম্বকোনামে পরাজিত করেছিলেন। তৃতীয় নন্দীবর্মনের একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল এবং সিয়াম ও মালায়ার সাথে বাণিজ্য যোগাযোগ ছিল। এরপর সিংহাসনে বসেন নরপাতুংবর্মন (৮৬৯-৮৮০ খ্রিস্টাব্দ)।

অপরাজিতবর্মন (৮৮০-৮৯১ খ্রিস্টাব্দ): ৮৮০ খ্রিস্টাব্দে অপরাজিতবর্মন সিংহাসনে বসেন। তিনি পল্লব বংশের শেষ রাজা। তিনি ৮৯১ খ্রিস্টাব্দে চোল সামন্ত প্রথম আদিত্যর নিকট পরাজিত ও নিহত হন এবং পল্লব রাজবংশের অবসান হয়।

পল্লব সাহিত্য: পল্লব রাজারা শিক্ষা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তাদের পৃষ্ঠপােষকতায় রাজধানী কাঞ্চি বিদ্যাচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। দেশ বিদেশের শিক্ষার্থী ও পণ্ডিতরা এখানে সমবেত হতেন। পল্লব রাজারা সংস্কৃত ভাষার পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। কিরাতার্জুনীয়ম কাব্যের রচয়িতা কবি ভারবি পল্লব রাজ সিংহবিষ্ণুর রাজসভা অলঙ্কৃত করতেন। কাব্যাদর্শ প্রণেতা দণ্ডিন দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনের দরবারে ছিলেন। পল্লব রাজ প্রথম মহেন্দ্রবর্মন একজন খ্যাতনামা লেখক ছিলেন। তিনি মত্তবিলাস প্রহসন ও ভগবদজ্জুকিয় নামে দুটি প্রহসন রচনা করেন। এছাড়া তিনি সঙ্গীতের উপরেও একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ও ন্যায়ভাষ্য প্রণেতা বাৎস্যায়ন ছিলেন কাঞ্চির নাগরিক। এই যুগে তামিল সাহিত্যও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। শৈব নায়নার ও বৈষ্ণব আলওয়ারদের রচিত ভক্তিমূলক গীতিগুলি তামিল সাহিত্যের পরিচয় বহন করে। প্রসিদ্ধ আলওয়ার সন্ত ও পণ্ডিত তিরুমঙ্গাই এ যুগেই আবির্ভূত হন।

পল্লব স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলা: পল্লব যুগ স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ইতিহাসে এক উল্লেখযােগ্য অধ্যায়। পল্লব রাজাদের পৃষ্ঠপােষকতায় এই যুগে শিল্পকলার প্রভূত উন্নতি ঘটে। বস্তুতপক্ষে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে পল্লব রাজবংশের অধীনেই দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ইতিহাসের সূত্রপাত হয়। মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করেই পল্লব শিল্পের বিকাশ ঘটে। রাজধানী কাঞ্চি, মহাবলীপুরম, আর্কট জেলা, ত্রিচিনােপল্লি প্রভৃতি স্থানে এই যুগে বহু সুদৃশ্য মন্দির নির্মিত হয়। প্রকৃত দ্রাবিড় শিল্প শিল্প ও ভাস্কর্যের প্রথম পরিচয় পল্লব শিল্প ভাস্কর্যের মধ্যেই পাওয়া যায়। পল্লব মন্দিরগুলি ছিল দুধরনের — (১) পাহাড় কেটে বৌদ্ধ বিহারের অনুকরণে বা রথের আকৃতিযুক্ত মন্দির এবং (২) স্বাধীনভাবে তৈরি মন্দির। পাহাড় কেটে মন্দির গঠনের পদ্ধতি সর্বপ্রথম পল্লবদের দ্বারাই আবিষ্কৃত হয়। প্রথম মহেন্দ্রবর্মনের আমলে ত্রিচিনােপল্লি, চিঙ্গলপেট ও আর্কট জেলায় পাহাড় কেটে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর মন্দির নির্মিত হয়।

প্রথম নরসিংহবর্মন রথের আকারে মন্দির নির্মাণ রীতি প্রবর্তন করেন। গােটা একটি পাহাড় বা পাথর কেটে মন্দিরের আকৃতি দেওয়া হত। মহাবলীপুরমের এইসব রথ মন্দিরগুলির মধ্যে ধর্মরাজ রথ, দ্রৌপদী রথ, অর্জুন রথ ও ভীম রথ উল্লেখযােগ্য। দ্বিতীয় নরসিংহবর্মনের আমলে নির্মিত কাঞ্চির কৈলাসনাথ মন্দির, বৈকুণ্ঠ পেরুমল মন্দির, ত্রিপুরান্তকেশ্বর ও ঐরাবতেশ্বর মন্দির এবং মহাবলীপুরমের মুক্তেশ্বর মন্দির পল্লব মন্দির স্থাপত্যের উল্লেখযােগ্য নিদর্শন। এইসব মন্দিরের গঠন সৌষ্ঠব, ভাস্কর্য কৌশল এবং মন্দিরগাত্রে খােদাই করা মুর্তিগুলি আজও দর্শকদের বিস্ময় উৎপাদন করে। মন্দিরগাত্রে অঙ্কিত গঙ্গাবতরণ বা গঙ্গার মর্তে আগমন এবং বিষ্ণুর অনন্ত শয়ান এই ধরনের দুটি বিখ্যাত ভাস্কর্য কর্ম। এই মন্দিরগুলির অনুকরণে ভারতের বাইরে কম্বােজ, আন্নাম ও যবদ্বীপে মন্দির ও মুর্তি নির্মাণ করার রীতি শুরু হয়।

পল্লব যুগের ধর্ম: পল্লব যুগে দক্ষিণ ভারতের আর্যীকরণ সম্পূর্ণ হয় এবং এ ব্যাপারে পল্লব রাজন্যবর্গের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ভারতে ব্রাহ্মণদের বসতি বিস্তার, মঠ মন্দিরে তাদের বেদ অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা, মন্দির সংলগ্ন ঘেটিকা বা শিক্ষাকেন্দ্রগুলির ব্যয়ভার বহন দক্ষিণ ভারতে আর্য সংস্কৃতি বিস্তারে যথেষ্ট সহায়ক হয়। কাঞ্চি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি বিস্তারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পল্লব রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী ছিলেন। পল্লব রাজ্যে পৌরাণিক ধর্মের মধ্যে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শৈব নায়নার ও বৈষ্ণব আলওয়াররা দাক্ষিণাত্যে ভক্তি ধর্মকে জনপ্রিয় করে তােলেন। পল্লব রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী হলেও পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। এই বংশের প্রথম উল্লেখযােগ্য রাজা সিংহবিষ্ণু বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। রাজা মহেন্দ্রবর্মন প্রথমে জৈন ধর্মাবলম্বী ছিলেন। পরে তিনি শিবের উপাসনা শুরু করেন। এ সত্ত্বেও অন্যান্য দেবদেবীর প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল। পল্লব সাম্রাজ্যে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল।

পল্লব রাজাদের তালিকা: ১) শিবস্কন্দবর্মন, ২) বিষ্ণুগোপ, ৩) সিংহবর্মন, ৪) সিংহবিষ্ণু, ৫) প্রথম মহেন্দ্রবর্মন, ৬) প্রথম নরসিংহবর্মন, ৭) দ্বিতীয় মহেন্দ্রবর্মন, ৮) প্রথম পরমেশ্বরবর্মন ৯) দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন, ১০) দ্বিতীয় পরমেশ্বরবর্মন, ১১) দ্বিতীয় নন্দীবর্মন, ১২) দন্তিবর্মন, ১৩) তৃতীয় নন্দীবর্মন, ১৪) নরপাতুংবর্মন, ১৫) অপরাজিতবর্মন।