গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত

- March 17, 2019
এরাণ শিলালিপি থেকে জানা যায়, সমুদ্র গুপ্তের মৃত্যুর পর দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৪ খ্রিস্টাব্দ) পিতার সিংহাসনে বসেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তর পিতা ছিলেন সমুদ্রগুপ্ত ও মাতা ছিলেন দত্তাদেবী। অপর দিকে বিশাখদত্ত রচিত দেবীচন্দ্রগুপ্তম নাটকে বলা হয়েছে, সমুদ্র গুপ্তের পর তার জ্যৈষ্ঠ পুত্র রামগুপ্ত সিংহাসনে বসেন। তিনি শক রাজা বসনের কাছে পরাজিত হন এবং তার পত্নী ধ্রুবদেবীকে শক রাজাকে সমর্পণ করে। এই ঘটনায় ক্রুদ্ধ হয়ে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত শক শাসক ও রামগুপ্ত-কে হত্যা করেন এবং ধ্রুবদেবীকে বিবাহ করে গুপ্ত সিংহাসনে বসেন। এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত নরেন্দ্রচন্দ্র, সিংহচন্দ্র, নরেন্দ্রসিংহ, সিংহবিক্রম, দেবরাজ, দেবশ্রী নামে পরিচিত ছিলেন।
Gupta Emperor Chandragupta II Coins
বৈবাহিক সম্পর্ক: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্যর প্রসারের জন্যে তিনি তিনটি নীতি অনুসরণ করেন। এগুলি হল বৈবাহিক সম্পর্ক, সন্ধি ও যুদ্ধজয়। প্রথমে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মধ্য ভারতের শক্তিশালী নাগ-বংশীয় রাজকন্যা কুবের নাগ-কে বিবাহ করেন। নর্মদার দক্ষিণে অবস্থিত শক্তিশালী বাকাটক রাজ্যর অধিপতি দ্বিতীয় রুদ্রসেন-এর সঙ্গে নিজ কন্যা প্রভাবতী গুপ্তার বিবাহ দেন। এছাড়া দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত কুন্তল বা কর্ণাটকের কদম্ব বংশের কাকুৎসুবর্মণের রাজকন্যার সঙ্গে নিজ পুত্র প্রথম কুমারগুপ্তের বিবাহ দেন। ড: স্মিথ বলেন যে, শকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নাগ ও বাকাটক বংশের মৈত্রী দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্য বিস্তার: মালব, গুজরাট ও সৌরাষ্ট্রে রাজত্বকারী বিদেশি শকদের পরাজিত করে। ড: গয়াল বলেন যে, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুরাগী দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কাছে বিজাতীয় শকদের উপস্থিতি অসহনীয় ছিল। এই অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিজয় পতাকা উত্তোলন করা ও পশ্চিম উপকূলের গুজরাট বন্দর থেকে রোম সাম্রাজ্যর সঙ্গে বাণিজ্যর পথ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য তিনি শক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। শক রাজা তৃতীয় রুদ্রসেন বা রুদ্রসিংহ যুদ্ধে নিহত হন এবং শক রাজ্য গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। শক শক্তিকে উচ্ছেদ করে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত 'শকারি বা শকদের শত্রু' উপাধি ধারণ করেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তার রাজধানী উজ্জয়িনী নিয়ে যান।

বঙ্গ ও বাহ্লীক জয়: দিল্লির কুতুব মিনারের কাছে মেহরৌলি গ্রামে একটি লৌহস্তম্ভে (মেহরৌলি লৌহ স্তম্ভলিপি) উৎকীর্ণ তারিখবিহীন লিপি থেকে জানা যায়, চন্দ্র নামে রাজা বঙ্গের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং সপ্তসিন্ধু অতিক্রম করে বাহ্লীক দেশ জয় করেন। ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার, রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র সরকার বলেন, ঐতিহাসিকদের মতে চন্দ্র ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত একই ব্যক্তি। সম্ভবত সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ বিদ্রোহ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত পুনরায় তা জয় করেন। বাহ্লীক বলতে অনেকে ব্যাকট্রিয়া মনে করেন। বলা বাহুল্য তার পক্ষে ব্যাকট্রিয়া জয় অসম্ভব ছিল। ড: ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, এখানে সিন্ধুনদ অঞ্চলের উপজাতিদের বাহ্লীক বলা হয়েছে।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মুদ্রা: দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মুদ্রাগুলির অধিকাংশ বিহার ও বাংলা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে হুগলি জেলার মাধবপুর গ্রাম থেকে তীর-ধনুক হাতে রাজমূর্তি যুক্ত পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মুজাফফরপুর জেলার হাজীপুর গ্রামে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নামাঙ্কিত তিন ধরণের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়। প্রথম ধরণের মুদ্রায় ছাতার তলায় দন্ডায়মান রাজমূর্তি, অপর এক ধরণের মুদ্রায় তীর-ধনুক হাতে রাজমূর্তি এবং তৃতীয় ধরণের মুদ্রায় সিংহ শিকাররত রাজমূর্তি রয়েছে। গয়া থেকে শূল হাতে রাজমূর্তি যুক্ত একটি স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়। কালীঘাট থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়, যা ওয়ারেন হেস্টিংস ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন, এটি বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। ভাগলপুর জেলার সুলতানগঞ্জের নিকটে অবস্থিত একটি বৌদ্ধ স্তূপ উৎখননের সময় পশ্চিমী ক্ষত্রপ বংশীয় তৃতীয় রুদ্রসিংহের রৌপ্যমুদ্রার সাথে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নামাঙ্কিত একটি রৌপ্যমুদ্রা এবং যশোহর জেলার মহম্মদপুর গ্রামে বেশ কয়েকটি রৌপ্য মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়। পাটলিপুত্র উৎখননের সময় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের নামাঙ্কিত কয়েকটি তাম্র মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়।

কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্য: অনেকে মনে করেন, উজ্জয়িনী-রাজ বিক্রমাদিত্য নামে যে রাজার নাম উল্লেখ আছে তিনি ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত একই ব্যক্তি। কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্য শকদের নিধনকারী ছিলেন এবং উজ্জয়িনী ছিল তার রাজধানী। গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সম্পর্কে এই দুটি কথা মিলে যায়। কিংবদন্তীর বিক্রমাদিত্যর সম্পর্কে আরও বলা হয়, তার রাজসভায় কালিদাস প্রমুখ নবরত্ন (কালিদাস, ধনন্তরী, ক্ষপনক, শঙ্কু, বেতালভট্ট, ঘটকর্পর, অমরসিংহ, বরাহমিহির ও বররুচি) ছিলেন এবং তিনি বিক্রম সম্বত নামে একটি সম্বত বা অব্দ প্রবর্তন করেন। মহাকবি কালিদাস দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সমসাময়িক হলেও অন্য সকল রত্নরা তার সময় কখনােই জীবিত ছিলেন না। বিক্রম সম্বৎ ৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রবর্তিত হয়, কিন্তু দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের মানুষ। এছাড়া, তিনি কোনও সম্বৎ প্রবর্তন করেছিলেন বলেও জানা নেই। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার এর মতে, বিক্রম সম্বৎ ও রাজা বিক্রমাদিত্যের যথার্থ পরিচয় ভারত ইতিহাসের একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। আসলে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে বিক্রমাদিত্য একটি সম্মানসূচক উপাধিতে পরিণত হয় এবং ভারত ইতিহাসে কমপক্ষে দুই চোদ্দোজন বিক্রমাদিত্য এর সন্ধান পাওয়া যায়। এ সত্ত্বেও বলতে হয় যে, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে বিক্রমাদিত্যের কাহিনি সংযুক্ত করা তার জনপ্রিয়তারই সাক্ষ্য বহন করে।

দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কৃতিত্ব: সমুদ্রগুপ্তকে যদি সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বিস্তার কর্তা বলা হয়, তাহলে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তকে নিশ্চয়ই তার শ্রেষ্ঠ স্থপতিরূপে অভিহিত করা যেতে পারে। পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি যে সাম্রাজ্য পেয়েছিলেন, সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি তা সুসংহত করেন। দেশজোড়া শান্তি ও সমৃদ্ধির ফলশ্রুতি হিসেবে সাম্রাজ্যে বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের সূচনা হয়। তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। তথাকথিত 'সুবর্ণ যুগের’ উৎকর্ষ তার সময়েই পরিলক্ষিত হয়। কালিদাস তার সমসাময়িক ছিলেন এবং নবরত্নের অনেকেই তার রাজসভা অলঙ্কত করতেন। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল এক নতুন অধ্যায়। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত একজন নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব ছিলেন এবং তার উপাধি ছিল পরম ভাগবত। ধর্মবিশ্বাসে বৈষ্ণব হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরধর্মমতসহিষ্ণু ছিলেন। চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যে প্রচুর বৌদ্ধ মঠ দেখেছিলেন। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সেনাপতি আম্রকর্দব বৌদ্ধ ছিলেন এবং মন্ত্রী বীরসেন ছিলেন শৈব।