পার্সিয়ান পন্ডিত এবং বিজ্ঞানী আবু রায়হান আল বিরুনী

- March 04, 2019
মধ্য এশিয়ার অন্তর্গত খারাজিম (বর্তমানে উজবেকিস্তান) রাজ্যর রাজধানী খিবাতে আল বিরুনীর জন্ম হয় ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে। আল বেরুণীর প্রকৃত নাম "আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী"। আল বেরুনীর বাল্যকাল কাটে বাদশাহ আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরাকের তত্ত্বাবধানে। আল বেরুনীর নিযুক্ত শিক্ষকের কাছে তিনি পবিত্র কোরআন ও হাদিস শিক্ষা করেন। তিনি ইতিহাসে আল বেরুনী নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন মুসলিম জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ, নৃতাত্ত্বিক, নৃবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং ভূগোলবিদ। তিনি সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারত সম্পর্কে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপা বলেন, "আল-বেরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নন, তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের একজন।

রাজা কাবুসের কাছে থাকাকালে তিনি 'আসারুল বাকিয়া' ও 'তাজরী দুশ শুয়াত' নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। রাজা কাবুসের প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি তার আসারুল বাকিয়া গ্রন্থটি রাজা কাবুসের নামে উৎসর্গ করেন।

খারাজিমের রাজা সুলতান মামুন বিন মাহমুদ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সাধক ছিলেন। তিনি জ্ঞানী পন্ডিতদের কদর করতেন। আল বেরুনীর কথা শুনে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠান। আল বেরুনী সুলতান মামুদের অনুরোধে ১০১১ খৃষ্টাব্দে মাতৃভূমি খারাজিমে ফিরে আসেন। সুলতান মামুদ তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে আল বেরুনী জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা ও সাধনা চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি মান মন্দির প্রতিষ্ঠা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণার কাজ চালান।

আল বেরুনীর পাণ্ডিত্য মুগ্ধ হয়ে গজনীর সুলতান মামুদ আল বেরুনীকে নিজ রাজসভার সভাসদ নির্বাচন করেন। তিনি সুলতান মামুদের সঙ্গে ভারতে আসেন। আল বেরুনী ভারতের শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি সংস্কৃত ভাষা আয়ত্ত করে প্রাচ্যদেশীয় সাহিত্য ও দর্শন পাঠ করেন এবং গভীর জ্ঞান লাভ করেন। ভারতবর্ষের উপর লিখিত আল বেরুনীর গ্রন্থ হল তহকক-ই-হিন্দ বা কিতাবুল হিন্দ (ভারততত্ত্ব) থেকে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যায়।

সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মাসউদ ১০৩১ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। সুলতান মাসউদ আল বেরুনী-কে খুবই সম্মান করতেন। এই সময় আল বেরুনী ‘কানুনে মাসউদী’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

কানুনে মাসউদী গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে, তৃতীয় খন্ডে ত্রিকোণমিতি, চতুর্থ খন্ডে আকৃতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, পঞ্চম খন্ডে গ্রহ, দ্রাঘিমা, চন্দ্র সুর্যের মাপ, ষষ্ঠ খন্ডে সূর্যের গতি, সপ্তম খন্ডে চন্দ্রের গতি, অষ্টম খন্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমা ও গ্রহন, নবম খন্ডে স্থির নক্ষত্র, দশম খন্ডে ৫ টি গ্রহ এবং একাদশ খন্ডে জ্যোতিষ বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়। গ্রন্থটি সুলতান মাসউদের নামে নামকরণ করায় তিনি খুশী হয়ে বহু মূল্যবান রৌপ্য মুদ্রা উপহার দেন।

আল বেরুনী বিভিন্ন বিষয়ে মানব জাতির জন্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি তার বিভিন্ন গ্রন্থে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়, বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস, মৃত্তিকা তত্ত্ব, সাগর তত্ত্ব ও আকাশ তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ইউরোপীয় পন্ডিতগণ আল বেরুনীর জ্ঞানের প্রশংসা করে বলেন, আল বেরুনী নিজেই বিশ্বকোষ। এছাড়া তিনি একজন ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি আরবী, ফার্সী, সিরীয়, গ্রীক, সংস্কৃতি ও হিব্রু প্রভৃতি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। ত্রিকোণমিতিতে তিনি বহু তথ্য আবিষ্কার করেন।

কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ গুলো সূর্য্যকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু কোপার্নিকাসের জন্মের ৪২৫ বছর আগে আল বেরুনী বলেন, পৃথিবী বৃত্তিক গতিতে ঘোরে। তিনি টলেমি ও ইয়াকুবের দশমিক অংকের গণনায় ভুল ধরে দিয়ে তার সঠিক সমাধান দেন। তিনিই সর্বপ্রথম অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। তিনিই প্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণা আর্টেজিয় কূপের রহস্য উদঘাটন করেন। তিনি একজন জ্যোতিষী ছিলেন। তিনি যেসব ভবিষ্যতবাণী করতেন সেগুলো সঠিক প্রমাণিত হত। তিনি শব্দের গতির সাথে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেন। ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কটি তিনি আবিষ্কার করেন।

আল বিরুনী সুক্ষ্ম ও শুদ্ধ গণনার একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন। তার বর্তমান নাম দি ফরমুলা অব হিন্টার পোলেশন। পাশ্চাত্যের পন্ডিতরা এই পন্থাকে নিউটানের আবিষ্কার বলে প্রচার করছেন। এটি নিউটনের জন্মের ৫৯২ বছর আগেই আল বেরুনী আবিষ্কার করেন। একে ব্যবহার করে তিনি বিশুদ্ধ সাইন তালিকা তৈরী করেন। এই ফর্মুলার পূর্ণতাদান করে তিনি একটি ট্যানজেন্ট তালিকা তৈরী করেন। বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা হয় ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হবে কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না। তিনিই প্রথম এই সূত্র আবিষ্কার করেন।

আল বেরুনী চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বহুরোগের ঔষধ তৈরীর কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ছিল ১১৮ টি। তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ইতিহাস বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। আল বেরুনীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘কিতাবুল আল হিন্দ’। তিনি ‘আল আসারুল বাকিয়া আলাল কুবানিল কালিয়া’ গ্রন্থে পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

আল বেরুনীর ভারততত্ত্ব: আল বিরুনীর ভারততত্ত্ব বা কিতাব ফি তাহকিকে মালইল হিন্দে মিন মাকালাতুন মুকবুলাতুন ফিল-আকলিয়ে মারজুলাতুন বিখ্যাত ইসলামী দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক আল বেরুনীর লেখা ভারতবর্ষ বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ। এই গ্রন্থটি অনুবাদ করেন আবু মাহমেদ হবিবুল্লাহ্‌। এর প্রকাশক দিব্যপ্রকাশ। এই গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয় ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে। এই গ্রন্থে তিনি ভারত সম্পর্কে বলেন, দেশের মানুষের জীবিকা ছিল কৃষিকাজ। অন্যসময় কুটিরশিল্প করত। রাজকোষের আয় ছিল ভূমি রাজস্ব। তবে বণিক, কারিগর প্রমুখ কিছু কিছু কর প্রদান করতেন। ভারতীয় সমাজ ছিল অসাম্য ও বৈষম্য ভরা। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, জাতিভেদ অস্পৃশ্যতা প্রভুতি নানা কুসংস্কার ছিল। নারীরা ছিল অবহেলিত। ধর্ম ভাবনা ছিল গোড়ামি ও কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। তিনি আরো বলেন ভারতে বিচারব্যবস্থায় বিচারে সমতা ছিল না। ব্রাহ্মনরা সব ক্ষমতা ভোগ করত। প্রাণদণ্ড ছাড়া জরিমানা, বেত্রাঘাত, অঙ্গছেদ ছিল শাস্তির রূপ।

আল বেরুনী মৃত্যু: আল বেরুনী বড় পন্ডিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন একজন সৎ ও ভাল লোক। তিনি খুবই ধার্মিক ব্যাক্তি ছিলেন। তার মনে মধ্যে কোন গৌরব বা অহংকার ছিল না। তিনি সঠিকভাবে নামায-রোজা করতেন এবং ইসলামের সকল হুকুম মেনে চলতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর অর্জিত জ্ঞান খুবই সামান্য। সকল জ্ঞানের উৎস হলেন আল্লাহ, তিনি মহান। আল-বিরুনি ৬৩ বছর বয়সে এক রোগে আক্রান্ত হন। এবং ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে ১২ ই ডিসেম্বর, ৪৪০ হিজরি ২ রজব তিনি ৭৫ বছর বয়সে মারা যান গজনীতে (বর্তমানে আফগানিস্তান)। এই সময় গজনীতে গজনভিদ রাজবংশ রাজত্ব করত।