বাংলায় সেন রাজবংশের ইতিহাস - Sena Dynasty in Bengal

- February 23, 2019
বাংলায় সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা সামন্ত সেন। সামন্তসেন কর্ণাটদেশে অনেক যুদ্ধে জয়লাভ করে বৃদ্ধ বয়সে রাঢ়দেশে গঙ্গাতীরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোন স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মনে হয় না। কারণ তাহার পৌত্র বিজয় সেনের শিলালিপিতে তার নামের সঙ্গে কোন রাজত্বসূচক পদবী ব্যবহৃত হয়নি। অপর পক্ষে বিজয় সেনের লিপিতে তাঁহার পিতা হেমন্ত সেন মহারাজাধিরাজ ও মাতা যশােদেবী মহারাজ্ঞী উপাধিতে ভূষিত হয়েছে। সুতরাং হেমন্তসেনই সেন বংশের প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন। হেমন্ত সেন পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগে রাঢ় অঞ্চলে নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। সেন বংশের রাজধানী ছিল যথাক্রমে গৌড়, বিক্রমপুর ও নবদ্বীপ।
Sena Dynasty in Bengal
সেন বংশের উৎপত্তি: খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের শেষলগ্নে পাল শাসনের ধ্বংস স্তূপের উপর সেন বংশের উথান ঘটে। সেন রাজারা দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে বাংলায় আসেন বলে অনেকের ধারণা। সেন রাজাদের শিলালিপিতে তাদের বংশ পরিচয় চন্দ্র-বংশীয় এবং ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয় বলা হয়েছে। বীরসেন ছিল সেন রাজাদের পূর্বপুরুষ। বাংলাদেশের প্রাচীন কুলজীগ্রন্থে তাদেরকে বৈদ্য জাতীয় বলা হয়েছে। আধুনিক কালে তাদের কায়স্থ এবং বাংলাদেশের অন্যান্য সুপরিচিত জাতিভুক্ত বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে সমসাময়িক লিপিতে তাদের নিজেদের উক্তিই সত্য বলে গ্রহণ করা উচিত। সুতরাং সেন রাজগণ যে কর্ণাটদেশের ক্ষত্রিয় জাতির এক শাখাভুক্ত ছিলেন সে সম্বন্ধে সন্দেহ করার কোন কারণ নেই। বাংলাদেশে আসার পর বিবাহ সম্বন্ধ দ্বারা বৈদ্য অথবা অন্য কোন জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তবে তার কোন প্রমাণ নেই।

ব্ৰহ্ম-ক্ষত্রিয় একটি পরিচিত জাতি। অনেকে মনে করেন যে প্রথমে ব্রাহ্মণ ও পরে ক্ষত্রিয় হবার জন্য এই জাতির এরূপ নামকরণ হয়েছে। সেন রাজগণের এক পূৰ্বপুরুষ ব্ৰহ্মবাদী বলিয়া উল্লিখিত করেন। এই সময় কর্ণাটদেশে (বর্তমান ধারবাড় জেলা) সেন উপাধিধারী অনেক জৈন আচার্যের নাম পাওয়া যায়। ইহারা সেনবংশীয় বলিয়া অভিহিত হয়েছেন। অনেকে অনুমান করেন যে বাংলার সেনরাজগণ এই জৈন আচার্য্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তারা জৈনধর্ম ত্যাগ করে শৈবধর্ম ও পরবর্তীকালে ধৰ্মচৰ্যার পরিবর্তে শাস্ত্ৰচৰ্য্যা গ্রহণ করেন। এই অনুমান কতদূর সত্য তা বলা দুরূহ। বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপিতে কথিত আছে, সামন্ত সেন রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্যন্ত বহু যুদ্ধাভিযান করে এবং দুর্বত্ত কর্ণাটলক্ষ্মী-লুণ্ঠনকারী শত্রুকুলকে ধ্বংস করিয়া শেষ বয়সে গঙ্গাতটে পুণ্যাশ্রমে জীবন যাপন করেছিল। এ থেকে জানা যায় সামন্ত সেন প্রথম কর্ণাটক থেকে বাংলাদেশে এসে গঙ্গাতীরে বাস করেছিল। কিন্তু বল্লাল সেন সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে চন্দ্রের বংশে জাত অনেক রাজপুত্র রাঢ়দেশের অলঙ্কারস্বরূপ ছিলেন এবং তাহাদের বংশে সামন্ত সেন জন্মগ্রহণ করেন। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে সামন্তসেনের পূর্বপুরুষগণ রাঢ়দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

অনেকে অনুমান করেন যে সেন রাজাগণ প্রথমে পাল রাজগণের অধীনে সৈন্যাধ্যক্ষ অথবা অন্য কোন উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। পরে পাল রাজগণের দুর্বলতার সুযােগে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হয়েছিল। এই অনুমানের সপক্ষে বলা যেতে পারে, পাল রাজগণের তাম্রশাসনে যে কর্মচারীর তালিকা আছে তাহার মধ্যে নিয়মিতভাবে গৌড়, মালব, খশ, হুণ, কুলিক, কর্ণাট, লাট, চাট, ভাট এই পদের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সুতরাং পাল রাজাগণ এই সমস্ত কর্ণাটগণকেও সৈন্যদলে নিযুক্ত করতেন এবং সেনবংশীয় কেউ এই সুযোগে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র এক রাজ্যের অধিপতি হয়েছিলেন। অনেকে বলেন যে, চোলরাজা রাজেন্দ্র চোলের বাংলা অভিযানের সময় চোলবাহিনীর সঙ্গে সেনদের পূর্বপুরুষরা বাংলায় আসেন। সেন রাজাদের দক্ষিণ ভারতীয় উৎপত্তির বিষয়টি অধিকাংশ ঐতিহাসিকই মেনে নিয়েছেন।

সেন বংশের ইতিহাস: সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন। তবে তিনি কোন স্বাধীন রাজবংশ প্রতিষ্টা করেননি। সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন রাঢ় অঞ্চলে নিজ রাজ্য প্রতিষ্টা করেন। সেন বংশের প্রথম সার্বভৌম রাজা ছিলেন হেমন্ত সেন। হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন ছিলেন স্বাধীন সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রাঢ় অঞ্চলে স্বাধীন সেন বংশের পত্তন করেন। উমাপতি ধর রচিত দেওপাড়া লিপি থেকে জানা যায়, তিনি গৌড়, কামরূপ, কলিঙ্গ, মগধ প্রভৃতি রাজাদের পরাজিত করে এক বিশাল সেন সাম্রাজ্য গড়ে তােলেন। মিথিলা এবং পূর্ববঙ্গের যাদব বংশীয় রাজাদেরও তিনি পরাজিত করেন। তিনি ক্ষুদ্র সেনরাজ্যকে একটি সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। তাঁর সাম্রাজ্য পূর্বে ব্রহ্মপুত্র থেকে দক্ষিণে কলিঙ্গ এবং পশ্চিমে কোশী-গণ্ডক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১১৫৮ খ্রিস্টাব্দে বিজয় সেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বল্লাল সেন সিংহাসনে বসেন। বল্লাল সেন মহারাজাধিরাজ এবং নিশ শঙ্কর গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ করেন। তিনি শেষ পালরাজা গােবিন্দপালকে পরাজিত করে গৌড় দখল করেন এবং বঙ্গধিপতি ভােজবর্মাকে পরাজিত করে বঙ্গ জয় করেন। তিনি মগধ ও মিথিলা জয় করেন। পূর্ববঙ্গ তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার রাজ্যসীমা পশ্চিমে মগধ ও মিথিলা থেকে পূর্বে বঙ্গ এবং উত্তরে দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া থেকে দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শেষ জীবনে ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দে বল্লাল সেন সংসার ত্যাগ করলে তার পুত্র লক্ষণ সেন সিংহাসনে বসেন। লক্ষণ সেন এই বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা। লক্ষ্মণ সেনের লিপি থেকে জানা যায় যে তিনি গৌড়, কামরূপ, কাশী ও কলিঙ্গ জয় করেন। পুরী, বারাণসী ও প্রয়াগে তার বিজয়স্তম্ভ পাওয়া গেছে অর্থাৎ এইসব স্থান তিনি জয় করেছিলেন। তিনি গাহড়বাল-বংশীয় রাজা জয়চন্দ্রকে পরাজিত করেন। তার সাম্রাজ্য পূর্বে কামরূপ, উত্তরে বরেন্দ্রভূমি, পশ্চিমে এলাহাবাদ ও দক্ষিণে কলিঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার উপাধি ছিল গৌড়েশ্বর, অরিরাজ-মর্দন-শঙ্কর ও পরম বৈষ্ণব।

সেন বংশের পতন: লক্ষণ সেনের আমলে ১২০২ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বীর মহম্মদ ঘুরির অনুচর ইক্তিয়ারুদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি নদিয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে পালিয়ে যান। বখতিয়ার খিলজীর আক্রমণে পশ্চিমবঙ্গে লক্ষণ সেনের আধিপত্যের অবসান ঘটে। এরপরও লক্ষণ সেন বিক্রমপুরে কয়েক বছর রাজত্ব করেন। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর তার দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন (১২০৬-১২২৫ খ্রিস্টাব্দ) ও কেশব সেন (১২২৫-১২৩০ খ্রিস্টাব্দ) যথাক্রমে সিংহাসনে বসেন। তারা উভয়ে গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ করেন। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং মুসলিম আক্রমণের ফলে শেষ পর্যন্ত সেন শাসনের অবসান হয়।
Advertisement