বাংলার সেন বংশের শাসন কাঠামো - Sena Dynasty Administration

- February 21, 2019
সেন যুগে মুলত পাল আমলের শাসন পদ্ধতিই বজায় ছিল প্রয়োজন অনুসারে সেন রাজারা সামান্য কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন। সেন শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানার উপায় হল সমকালীন লেখমালা। এ ব্যাপারে বিজয় সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসন ও দেওপাড়া প্রশস্তি, লক্ষণ সেনের আনুলিয়া লিপি, সূর্য সেনের ইদিলপুর তাম্রশাসন, ডােমনপালের সুন্দরবন লিপি এবং ভোজবর্মনের বেলাব লিপি গুরুত্বপূর্ণ।
Bengal Sen dynasty governance structure
সেন যুগের শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল - রাজা ও রাজপরিবারের মর্যাদা, জাকজমক ও আড়ম্বরপ্রিয়তা বলাংশে বৃদ্ধি পায়। শাসনকার্যে রাজমহিষীদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। পাল আমলের প্রশাসনিক তালিকায় কোনও মহিষীর নাম পাওয়া যায় না, কিন্তু সেন রাজাদের তালিকায় বহু রানির নামােল্লেখ আছে। সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী ছিলেন। হয়তাে এই কারণেই শাসনব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, সংস্কৃতি, ব্রাহ্মণ শ্রেণি ও পুরােহিতদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। পুরােহিত, মহাপুরােহিত, শান্তিবারিক প্রভৃতি রাজকর্মচারীরা ধর্মসংক্রান্ত নানা কাজকর্ম করতেন। তারা রাজসভায় সমাদৃত হতেন এবং তাদের উপস্থিতি রাজসভার মর্যাদা বৃদ্ধি করত।

সেন যুগে শাসনকার্যে আমলাতন্ত্র ও অভিজাতদের প্রভাব বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেনযুগে শাসনকার্যে জনপ্রতিনিধিত্বের বিষয়টি একেবারে সংকুচিত হয়ে যায়। ব্যবসা বাণিজ্যের অবলুপ্তি সত্ত্বেও পাল রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিল্পী বণিক ও ব্যবসায়ীদের একটি নির্দিষ্ট স্থান ছিল, কিন্তু সেন রাষ্ট্রব্যবস্থায় এঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ অপ্রয়ােজনীয়। সমাজ ও রাষ্ট্রে অভিজাত সম্প্রদায়, আমলাতন্ত্র ও ব্রাহ্মণদের প্রাধান্যের ফলে সাধারণ মানুষ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কেও তারা উদাসীন হয়ে ওঠে। তাই ঐক্যবিহীন, বিভেদ জর্জর বাঙালি সমাজ মুষ্টিমেয় তুর্কি সেনার কাছে পরাজয় বরণে বাধ্য হয় এবং রাজা লক্ষণ সেন খিড়কি দরজা দিয়ে পলায়ন করেন এবং সেন রাজবংশের পতন হয়।

সেন শাসনব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বেসর্বা এবং সকল ক্ষমতার অধিকারী। রাজতন্ত্র ছিল বংশানুক্রমিক। পাল রাজাদের তুলনায় তাদের শাসনতান্ত্রিক এলাকা সংকীর্ণ হলেও তারা জাঁকজমকপূর্ণ অভিধা গ্রহণ করতেন। পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ এইসব অভিধা ছাড়াও তারা আরও বিশেষ বিশেষ উপাধি গ্রহণ করতেন। বিজয় সেন, বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেন যথাক্রমে অরিরাজবৃশবশঙ্কর, অরিরাজনিঃশঙ্কশঙ্কর এবং আরিরাজমর্দনশঙ্কর প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন। শেষদিকের সেন রাজারা এইসব উপাধির সঙ্গে আবার অশ্বপতি, গজপতি, নরপতি, রাজত্রয়াধিপতি প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন।

সেন রাজাদের তাম্রলিপিতে বহুসংখ্যক উচ্চপদস্থ কর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য ছিলেন মহামন্ত্রী। সম্ভবত ইনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এছাড়া সেন যুগে 'মহা' নামধারী প্রচুর নতুন পদের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেগুলি হল — মহাসন্ধিবিগ্রহিক, মহাপুরােহিত, মহাভােগপতি, মহাধর্মাধ্যক্ষ, মহাসেনাপতি, মহাকরণধ্যক্ষ প্রভৃতি। বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন মহাধর্মাধ্যক্ষ। সামরিক বিভাগের প্রধানকে বলা হত মহাপিলুপতি।

সেন যুগে ভুক্তি, বিষয়, মণ্ডল, গ্রাম প্রভূতি প্রশাসনিক বিভাগ ছিল, তবে সেগুলির সীমানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির সীমানা বহুগুণে বৃদ্ধি পেলেও বর্ধমান ভুক্তির সীমানা ছোট হয়ে গিয়েছিল এবং দণ্ডভুক্তি অবলুপ্ত হয়। সেন যুগের লিপিগুলিতে ভুক্তি, মণ্ডল, বিষয় ও বীথীর পরবর্তী স্তরে গ্রাম এর কোনও উল্লেখ নেই, বরং গ্রাম-সংক্রান্ত ক্ষুদ্র-বৃহৎ একাধিক নতুন বিভাগ-উপবিভাগের উল্লেখ আছে। সেগুলি হল পাটক, চতুর, আবৃত্তি ও গ্রাম প্রভৃতি।
Advertisement