সমাজ সংস্কারে সত্যশোধক সমাজের ভূমিকা।

author photo
- Thursday, February 14, 2019
advertise here

সত্যশোধক সমাজ ও জ্যোতিবা ফুলে।

ঊনবিংশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষার কল্যাণে বা ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতে সামাজিক প্রতিসরণ ক্ষেত্রে পরিবর্তনের কল্যাণে দেশীয় সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের সমাজ সংস্কারমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। আঞ্চলিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল সেচ্ছামুলুক যাদের সদস্যপদের জন্য কোন বিশেষ বা বিশেষ বিশেষ বর্ণ বা জাতির অন্তভূক্ত জরুরি ছিল না। এদের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজ সংস্কার, কোন ধর্মীয় উদ্দেশ্য বা জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা নয়। সমাজে নারীর অবস্থান বা বর্ণ/জাতির কঠোর, অন্যায় অনুশাসন থেকে মানুষকে মুক্ত করায় শুধু নয়, শিক্ষা বিস্তার বা অর্থনৈতিক প্রশ্নে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দিষ্ট বক্তব্য বা অবস্থান ছিল। এই সংস্থাগুলি অনেক ক্ষেত্রেই স্কুল বা বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করত। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে ক্রমশ উচ্চবর্ণ সমাজের সমস্যা, যেমন বিধবা বিবাহ বা পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের মত বিষয়গুলি থেকে নিম্নবর্ণের সমস্যার দিকে আকর্ষিত হয়। প্রার্থনা সমাজ যেমন ধর্মীয় সামাজিক বিষয়গুলির প্রতি তাদের নজর বজায় রেখেছিল সেখানে সাধারণভাবে রাজনৈতিক বিষয়গুলির প্রতি আকর্ষনীয় ছিল বেশি।


এছাড়া আরো দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান দেখা গিয়েছিল - নিম্নবর্ণের জাতিগুলির অনেকেই আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ হয়েছিল যেমন সত্যশোধক সমাজ। এছাড়া ছিল আর্য সমাজ ও থিওসফিক্যাল সোসাইটি মত প্রতিষ্ঠান যার মূল লক্ষ্য সামাজিক পরিবর্তনের থেকেও ধর্মীয় সংস্কার - বিভিন্ন সামাজিক প্রথার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা যার অনুসারী হতে পারে প্রধান লক্ষ্য তা কখনোই নয়।




মহারাষ্ট্রের জ্যোতিবা ফুলে (১৮২৭-১৮৯০) ছিলেন ঊনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কারকদের মধ্য বিরল ব্যক্তি যার চিন্তা এবং কর্মের মধ্যে তফাৎ ছিল না। হিন্দু ধর্ম/সমাজের অচলায়তনের বিরুদ্ধে যেখানে সাধারণভাবে সংস্কারকদের কাজ মূলত পত্র পত্রিকায় প্রতিবাদ ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত সেখানে জ্যোতিবা ফুলে ১৮৫০ এর দশকে পুনায় মেয়েদের জন্য একটি বালিকা বিদ্যালয় এবং অস্পৃশ্যদের জন্য দুটি আলাদা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও শিশুহত্যা প্রতিরোধ কল্পে তিনি ১৮৬৩ তে একটি অনাথাশ্রম তৈরি করেন যেখানে বিধবাদের অবাঞ্চিত সন্তানদের দেখভাল করা হত। জ্যোতিবা ফুলে প্রশ্ন করেন "সদ্যমৃত স্বামীর সাথে স্ত্রী সহমরণে সতী হলে সদ্যমৃতার স্বামী তার সাথে সুত্ত (সতীর পুংলিঙ্গ) হবে না কেন?" ১৮৭৩ সালে জ্যোতিবা ফুলে নিচুবর্ণজাত মানুষদের ব্রাহ্মণদের ভন্ডামি থেকে রক্ষা করবার জন্য সত্যশোধক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। জ্যোতিবা ফুলের বিখ্যাত লেখা হল ১৮৭২ সালে প্রকাশিত "গুলামগিরি"। তিনি সমাজ সংস্কার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থক ভূমিকার কথা স্বীকার করেন।



জ্যোতিবা ফুলের আন্দোলন ছিল মূলত: মহারাষ্ট্রের মধ্যমবর্গীয় জাতিবর্গের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পরিচালিত কিন্তু ঊনবিংশ শতকে জাতি ও বর্ণের স্তরগুলিতে উথানের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই সংস্কৃতায়ন এর প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রবণতার কল্যাণে উপজাতি ও নিচুজাতের মধ্য নিরামিষ আহার, মদ্যপান বিরোধ কার্যকলাপের পাশাপাশি আগে বিধবা বিবাহ চালু থাকলেও সেগুলি বন্ধ করা হত। সমাজের উচ্চবর্ণের মধ্য চালু সামাজিক প্রথা অনুকরণ করবার একটা ইচ্ছা এই সময় অনেক নিম্নবর্গীয় বা উপজাতি শ্রেণীর মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। জ্যোতিবা ফুলের আন্দোলন অনুন্নত জাতিদের উথানের জন্য পরিচালিত হলেও কোন পশ্চাদগামী প্রবণতা জ্যোতিবা ফুলের আন্দোলনে দেখা যায় নী। নিম্নবর্ণের মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্র বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল এবং এই প্রসঙ্গে জ্যোতিবা ফুলে পথপদর্শকের ভূমিকা পালন করে। যদিও তার নিজের সত্যশোধক সমাজের ভূমিকা ছিল নগণ্য।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী:

1. Charles H. Heimsath Indian Nationalism and Hindu Social Reform, Princeton, New Jersey, Princeton University Press, 1964.
2. A Sreedharan Menon, A Survey of Kerala History, Kottayam, 1967.
3. Eugene F. Irschik, Politics and social conflict in South India; The Non-Brahman Movement and Tamil Separatism, 1916-1929, OUP, 1969.

ট্যাগ:
Advertisement advertise here