ইতিহাস ও ভূগোলের মধ্যে সম্পর্ক

- February 09, 2019
ইতিহাস ও ভূগোলের মধ্যে সম্পর্ক প্রাচীন। উচ্চমানের ইতিহাস রচনার জন্য, বিশেষভাবে সামরিক ও কূটনৈতিক ইতিহাস রচনার জন্য মোটামুটি ভৌগলিক জ্ঞান ও মানচিত্রের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এমনকি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একটি উপযুক্ত ভৌগলিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা দরকার।
ইতিহাস ও ভূগোলের সম্পর্ক
ফরাসি পণ্ডিত Bodin মন্তব্য করেছেন, “প্রকৃতির সন্তান মানুষের জাতীয় চরিত্র গঠনে কোনো অঞ্চলের ভৌগােলিক প্রভাব সুদুরপ্রসারী।" কে. এস. পানিক্করের কথায়, “যে অঞ্চল প্রকৃতির দ্বারা এমন পরিবেষ্টিত ও বিচ্ছিন্ন তা অনিবার্যভাবেই এমন বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয়, যা সভ্যতাকে করে তােলে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।"

ইতিহাসের সঙ্গে ভুগােলের বন্ধন অবিচ্ছেদ্য। উভয়ের সম্বন্ধ বড়ােই নিকট। ইতিহাস, ভূগােল একসূত্রে গ্রথিত, দুটি চোখের মতাে। ইতিহাসের বিষয়বস্তু হল মানুষ ও তার বিচিত্র কার্যকলাপ, আর ভূগােলের বিষয়বস্তু হল প্রাকৃতিক জগৎ ও তার বিচিত্র ক্রিয়া - প্রতিক্রিয়া। এটা চির সত্য যে ভূগােলের জ্ঞান ব্যতীত ইতিহাস উপযুক্তভাবে বোঝা যাবে না, আবার ইতিহাসের জ্ঞান থাকলে ভূগােল সহজেই বােঝা যায়। ইতিহাস পড়ার সময় মানচিত্রের ব্যবহার খুবই দরকার। ইতিহাসের সঙ্গে যে নদী (যেমন সিন্ধুনদী, গঙ্গানদী, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা), পাহাড়, পর্বত (যেমন হিমালয় পর্বত), বন্দর নগর (কলকাতা, হলদিয়া), শহর (তমলুক শহর), রাস্তা (গ্র্যান্ড ট্রাংক রােড), খাল, সাগর, উপসাগর, মহাসাগর ইত্যাদি জড়িত।

এই ভাবাদর্শ থেকে ইতিহাসের জনক গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস সর্বপ্রথম মানুষের কর্মকাণ্ডের সাথে ভূগোল ও পরিবেশের নিবিড় সংযোগের কথা বলেছেন। গ্রীক পার্সিয়ান যুদ্ধের ইতিহাস শীর্ষক গ্রন্থে মিশরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি নীলনদের প্লাবন, পলিমাটি বেষ্টিত ভূমির কথা এবং এদের প্রভাবের কথা জোর দিয়ে বর্ণনা করেছেন।

বিখ্যাত ফরাসী ঐতিহাসিক মিশেলের মতে, ইতিহাস বিশ্লেষণ ভৌগলিক তথ্যর উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি আরো বলেন, ভৌগলিক ভিত্তি ছাড়া ইতিহাসের মানুষের কর্মকাণ্ডের বর্ণনা নিরর্থক। এতে বাস্তবতার কোন স্পর্শ থাকে না। নির্দিষ্ট ভৌগলিক পরিবেশে মানুষের কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয়ে থাকে। ভূমির গঠন, উর্বরতা, উৎপন্ন দ্রব্য, জলবায়ু প্রভুতি নানাভাবে মানুষের কার্যক্রমের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন সাধারণ রূপ নিয়েছে। ভারত ও ভারতবর্ষের লোকেদের উপর প্রকৃতি, জলবায়ু, আবহাওয়া, পরিবেশের যে বিপুল প্রভাব রয়েছে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। সদুর অতীত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস ও ভারতীয়দের জীবনযাত্রা ভূগোল ও পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। ভারত উপমহাদেশ ও বাংলার ইতিহাসের ভৌগলিক প্রভাব সবার জানা।

ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনাই নির্দিষ্ট দেশ, স্থান ও পরিবেশে ঘটেছে। এই পরিবেশই তাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। সুতরাং ইতিহাসের ঘটনাকে বাস্তব এবং নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে সম্পর্কসূত্রে বােঝাবার জন্য ভূগােল বিষয়ের সাহায্য দরকার। তাই ভূগােলকে বলা হয় স্থানের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের পরিমাপ, ইতিহাসকে বলা হয় সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের পরিমাপ। মানুষের দুটি চোখ যেমন পরস্পরের সঙ্গে সংযােগপূর্ণ। তেমনি নির্দিষ্ট জায়গায় মানুষের কাজ ও ঘটনার তাৎপর্যেই ইতিহাস চেতনার পূর্ণতা।

যে কোনাে বিশেষ ঘটনা পর্যালােচনা করলে দেখা যায় যে ওই বিশেষ ঘটনা কোনাে বিশেষ সময়ে, কোনাে বিশেষ জায়গায় ঘটেছিল। তাই ভূগােল ও সময়পঞ্জি ইতিহাসের দুটি চোখ। কোনাে বিশেষ মানবগােষ্ঠী বিশেষ ভৌগােলিক অবস্থানে বসেই ইতিহাস সৃষ্টি করে। আর এই মানবগােষ্ঠীর জীবনে ভৌগােলিক পরিবেশের প্রভাব, জীবনযাত্রা, মানসিকতা ও শ্রম ক্ষমতার বিশেষত্ব এনে দেয়। ভৌগােলিক পরিস্থিতিই বহু সাম্রাজ্যের উত্থানপতন ও বহু যুদ্ধে জয়পরাজয় নির্ণয় করেছে।

অন্যদিকে ইতিহাসের বর্ণনা ও নানা ঘটনা থেকে ভূগোলবিদ সেই দেশ ও এলাকার ভৌগলিক বিবরণ যেমন জানতে পারেন তেমনি তা নিয়ে তাদের চিন্তাধারা পুনর্গঠনের সুযোগ পান। তাই ইতিহাস ও ভূগোল পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
Advertisement