ইতিহাস ও অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক

- February 09, 2019
ইতিহাস ও অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক গভীর। সম্পদ সংগ্রহ, সম্পদ বিতরণ ও সম্পদ ভোগ করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে তাকেই অর্থনীতি বলে অভিহিত করা হয়। ইতিহাসের যে বিরাট কর্মযজ্ঞ তা কখনো মানবজীবনকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। এই মানুষের জীবনধারণের জন্য একান্ত দরকার অর্থ। তাই মানুষের কর্মকাণ্ডের সিংহভাগই বহুমুখী প্রয়োজন মেটাবার জন্য ধন সম্পদ সংগ্রহে নিয়োজিত থাকে। আবার ইতিহাস গবেষণার একটা দিক হল মানুষের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান চালানো।
ইতিহাস ও অর্থনীতির মধ্য সম্পর্ক
প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মানুষের আর্থিক চাহিদার প্রকৃতি বুঝতে পারলে একজন ঐতিহাসিকের পক্ষে মানবীয় কর্মকাণ্ডের সঠিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ সহজতর হবে। একমাত্র অর্থনৈতিক নিমিত্তবাদ দ্বারা ই ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সম্ভব। এ তত্ত্বের উদ্গাতা কার্ল মার্কস। তবে সকলে হয়তো বা এ তত্ত্বের সঙ্গে একমত হবে না এবং আধুনিককালের নানা ঐতিহাসিকের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ স্পষ্ট। তবে একথা সত্য যে,ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই অর্থনৈতিক বিষয়াদি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা সম্ভব নয়, বরং এই সব বিষয়াদি অত্যান্ত গুরত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে হয়। প্রাচীনকালের ইতিহাস থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে কোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে উৎপাদনব্যবস্থা, উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সংসিলিষ্ট মানুষজন উৎপাদিত দ্রব্য ও তার বিলব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলি মুখ্য ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

কোন কোন যুগে, বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এই অর্থনৈতিক বিষয়াদি মানুষের কর্মকাণ্ডে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক ও নির্ধারক ভূমিকা পালন করে আসছে শুধু অর্থনীতির নিরিখে আধুনিক ও সমসাময়িক সমাজের উদ্ধব ব্যাখ্যা করলে প্রায় চূড়ান্ত সত্যর কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। তাই গবেষক ও ঐতিহাসিককে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপর অধিকতর জোর দিতে হয়। আর এ কাজে মুন্সিয়ানা দেখাবার জন্য ঐতিহাসিকদের সম্পদ তৈরি ও ব্যবহার প্রক্রিয়ার সাথে ভালোভাবে পরিচিতি হতে হয়। অর্থনীতি সম্পর্কে তার ভালো জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। যিনি এই কাজে যত দক্ষতা দেখান তিনি একজন দক্ষ অর্থনৈতিক ঐতিহাসিকের খ্যাতি অর্জন করে।

অর্থশাস্ত্র যাবতীয় অর্থনৈতিক কার্যকলাপ যেমন উৎপাদন, ভােগ, বিনিময়, বণ্টন ইত্যাদি নিয়ে আলােচনা করে তার প্রতিটি কার্যকলাপের একটি বিবর্তনের ইতিহাস আছে। পৃথিবীতে মানুষ কখন উৎপাদন পদ্ধতি রপ্ত করল, তখন বিনিময় মাধ্যম কী ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব সবই ইতিহাসের বিষয়বস্তু। এইসব বিষয় আলােচনা করতে হলে অর্থনীতির দ্বারস্থ হতে হয়। মানবসমাজ ও সভ্যতার ক্রমন্নতির কথা, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উন্নতির কথা জানতে হলে অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের আলােচনা জরুরি।

অবশ্য ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক একজন অর্থনীতির ছাত্র, গবেষকের কার্যক্রম সহজ করতে অনেক অবদান রাখতে পারে। সদূর অতীত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্ময়নের ধারা ও চালিকা শক্তির ধরণ একমাত্র ইতিহাসই ব্যক্ত করতে পারে এবং অর্থনীতি বিদদের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসে তাদের কাজকে সহজতর করে তুলতে পারে। প্রাচীন ও মধ্য যুগের লোকেদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের প্রেক্ষাপট পর্যাপ্ত ভাবে রপ্ত করা ছাড়া বর্তমান মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। এর ফলে সে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। ইতিহাসই অর্থনীতির ক্ষেত্রে নিয়োজিত গবেষকদের অতি প্রয়জনীয় আর্থিক বিষয় সরবরাহ করতে পারে।

মোটের উপর বলা যায়, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ইতিহাস ও অর্থনীতি এই বিষয় দুটি একে অপরের উপর নির্ভরশীল। আজ তাই অর্থনীতির বহু বিষয় ইতিহাসের ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠক্রমে অন্ত্রভুক্ত করা হয়েছে এবং অন্যদিকে ইতিহাসের অনেক কিছু অর্থনীতির ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ার জন্য পাঠক্রমে ঢোকানো হয়।
Advertisement