বৌদ্ধ ধর্মে নারীর অবস্থান।

author photo
- Tuesday, February 12, 2019
advertise here

বৌদ্ধ ধর্মে নারীর অধিকার ও মর্যাদা।

খ্রিস্ট পূর্ব ষষ্ঠ শতকের পর থেকে প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন আসে। বৌদ্ধ ধর্ম কেবলমাত্র নারীকে সতন্ত্র সামাজিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেনি, ধর্মীয় জীবনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করেছিল।


গৌতম বুদ্ধকে 'The First Urban Man' বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ হয়েছিল 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' সূচনা কালে। প্রাচীন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে সরে এসে বৌদ্ধ ধর্ম নারীর প্রতি অনেক বেশী উদার হয়। এই সময় থেকে কন্যাসন্তানের জন্মকে আর দুঃখের কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হত না। অবিবাহিত মহিলারাও গৃহে ও সমাজে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার পান। হরনারের মতে বিবাহে ইচ্ছুক ধনী পরিবারের মহিলারা নিজেদের জন্য পাত্র নির্বাচন করার অধিকার ছিল। এই সময় সাধারণের মধ্যে একাধিক বিবাহের প্রচলন ছিল না। তবে স্ত্রী সন্তানের জন্মদানে অক্ষম হলে স্বামী দ্বিতীয়বার বিবাহ করত। বৌদ্ধ ধর্ম মহিলাদেরও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার প্রদান করেছিল।


ভারতবর্ষে নগর সভ্যতার বিকাশ নারীর সামাজিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। এই সময় পুরুষের পাশাপাশি নারীরা বৌদ্ধ মঠে প্রবেশ। ধর্মীয় জীবনে অংশগ্রহণ করতে পারত। মহিলাদের সংঘজীবনে প্রবেশকে কেবলমাত্র ধর্মীয় আধারে বিচার করলে ভুল হবে। বৌদ্ধ ধর্মের হাত ধরে বৌদ্ধ সংঘের ভিক্ষুণীরা একটি সম্প্রদায় হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, যদিও তা সম্পূর্ণভাবে পুরুষ নিয়ন্ত্রণ বর্জিত ছিলনা।

বৌদ্ধ ধর্ম নারীর শ্রমের অধিকার দিয়েছিল। তাই এই ধর্ম উচ্চবর্গের পরিসীমার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে আকৃষ্ট করেছিল সমাজের দরিদ্র মানুষকে। নানান পেশার সঙ্গে যুক্ত মহিলারা, যেমন - নর্তকী, সংগীত পরিবেশক, গণিকা ও দাসিবৃত্তির সাথে যুক্ত মহিলাদের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

গৌতম বুদ্ধ আস্থা প্রকাশ করেন যে,পুরুষের মত নারীও সম্পূর্ণ জ্ঞান লাভে সক্ষম। সুতরাং নারীরা কঠোর ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে মুক্তি লাভ করতে পারে। তিনি ভিক্ষু ও ভিক্ষুনীদের নিজের জ্ঞানের দ্বারা সমৃদ্ধ করেছিল। এই কারণে মহিলা শিষ্য বৃদ্ধি পায়।

তবে পালি সাহিত্য থেকে জানা যায় সংঘ জীবণে প্রবেশের পথটি নারীদের পক্ষে তত সহজ ছিলনা। তিনি ভিক্ষুণীদের জন্য সতোন্ত্র নিয়ম প্রচলন করেন যেগুলি পালনের মধ্য দিয়ে ভিক্ষুনীদের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ হয়েছিল এবং তারা বাস্তবক্ষেত্রে ভিক্ষুদের আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।




মহা প্রজাপতি এবং অন্যরা যখন সংঘজীবনে প্রবেশ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তখন বুদ্ধ বলেন যে কেবলমাত্র আটটি প্রধান নিয়ম পালন করলেই তারা সংঘজীবনে প্রবেশ করতে পারত। এইভাবে সংঘজীবনে কেবলমাত্র মহিলাদের উপর কিছু শর্ত আরোপ করা হয়। কুল্লভগ্য বিনয়ে উল্লেখিত নিয়মগুলি হল।

১) একজন ভিক্ষুণের পক্ষে ভিক্ষুদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। সে ভিক্ষুদের প্রতি সমস্ত প্রকার ধর্মীয় কর্তব্য প্রতিপালনে বাধ্য।

২) অর্ধমাসিকভাবে যে ধর্মীয় উপচারগুলি হবে তা পালনের জন্য ভিক্ষুনীরা ভিক্ষুদের অনুমতি ও উপস্থিতি প্রার্থনা করবেন। ভিক্ষুদের অনুমোদন ব্যতীত উপসথ আচার পালন সঙ্গত নয়।

৩) ভিক্ষুদের অনুপস্থিতিতে কোন ভিক্ষুনি একা কোন স্থানে বর্ষাকাল অতিবাহিত করলে তা গর্হিত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

৪) বর্ষাকালের পর Pavarana নামক আচরটি মধ্যে দিয়ে যাচাই করা হবে যে ভিক্ষুনীরা সমস্ত নিয়ম সঠিকভাবে মান্য করছেন কিনা। সঙ্ঘে ভিক্ষু ও ভিক্ষুনী উভয় সভার সামনে এর বিশ্লেষণ হবে।

৫) কোন ভিক্ষুনীর পক্ষে গর্হিত অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে অপরাধ স্বীকার করতে হবে এবং মান্যতা বিধানটি অনুসরণ করতে হবে।

৬) যথাযথ অনুশীলনের মধ্যে দুই বছর পরই ভিক্ষুনীরা উপসমপদা-এর উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারবে।

৭) ভিক্ষুনীরা ভিক্ষুদের কোন দোষে অভিযুক্ত করতে পারবেনা।



৮) ভিক্ষুদের সংঘ পরিচালনায় ভিক্ষুনীদের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ হলেও, ভিক্ষুনীদের সংঘ পরিচালনায় ভিক্ষুরা হস্তক্ষেপ করতে পারবেন।

বিনয় পিটক ও মুক্ত পিটক থেকে বৌদ্ধ ধর্মে নারীর অবস্থান জানা যায়। বিনয় পিটকে ভিক্ষুণীবিভাঙ্গ এবং ভিক্ষুনিখণ্ডক-তে শ্রমণদের যে সমস্ত রীতি নীতি মেনে চলতে হত। সেই সমস্ত বিধান নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত আছে। এছাড়া সংযুক্ত নিকয়-র একটি অংশ ভীক্ষুনিসংযুক্ত এই বিষয় গুলির উপর আলোকপাত করতে সাহায্য করে।

ভিক্ষুনী ব্যতিতি সাধারণ নারীর প্রতি বৌদ্ধ ধর্ম অনেক ক্ষেত্রে উদারতা দেখান। এই ধর্মে নারীর বিবাহ আবশ্যিক ছিল না। বহু অবিবাহিত নারী পরবর্তীকালে সঙ্ঘে যোগদান করেছিল। বৌদ্ধ ধর্মে মাতৃত্বের ধারণাকে অভিনন্দন জানানো হয়। বিবাহের পরবর্তী জীবণে স্বামী স্ত্রীর সমান মর্যাদার কথা বলা হয় বৌদ্ধ ধর্মে।

সহায়ক গ্রন্থাবলী:

1. Vimala Churu Law, ed., Woman in Buddhist Literature, Varanasi, 1927, reprint 1994.
2. Nupur Dasgupta, Tools untold : An Appraisal of the Attitude Towards Woman and Their Work in Early Pali Buddhist Literature, in Anuradha Chanda, Mahua Sarkar, Kunal Chattopadhyaya, eds, Woman in History, Kolkata, 2003, 1943.
3. Diana Y. Paul, Woman in Buddhist : Images of the Feminine in Mahayana Tradition, Berkeley, 1979.
4. Kathryn R. Blackstone, Woman in the Footsteps of the Buddha, Delhi, 2000.
5. Image Chakravarti, The Rise of Buddhism as Experienced by Woman, Manushi, 8, 6-10.
6. I.B. Horner, Woman under Primitive Buddhism : Laywoman and Alms Woman, London, reprint Delhi, 1975.
Advertisement advertise here