গ্রীক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের ইতিহাস দর্শন

- February 08, 2019
গ্রীক ইতিহাস চর্চার এক বিপ্লব আনেন ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস। তিনি একজন গ্রীক দার্শনিক। তার জীবন সম্পর্কে জ্ঞান খুব সীমিত। কারণ তার কোন জীবন কাহিনী লেখা হয়নি। হেরোডোটাসের পরিচয় পাওয়া খুব কঠিন একটি বিষয়। তাই তবে বলা যায় খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর শুরুর কালে হেরোডোটাস জন্ম হয় এবং ৪৫৪ খ্রীষ্টপূর্ব হেরোডোটাস হেলিকার্ণেসাস (বর্তমান বোদরাম, তুরস্ক) ত্যাগ করেন। তার পিতা মাতা যথাক্রমে লেক্সেস ও ডারইউটাম। কিছুকাল হেরোডোটাস স্যামসে শহরে ছিলেন, পরে এথেন্স চলে যান এবং সেখান থেকে ইতালী যান। খ্রীষ্টপূর্ব ৪৩১ অব্দ পেলোপনেশিয় যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। তার জীবনের এই পরিমণ্ডলের মধ্যে বিভিন্ন ভ্রমন, বিখ্যাত ইতিহাস রচনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সযত্ন অনুসন্ধান চালানো বড় ব্যাপার ছিল।
গ্রীক দার্শনিক হেরোডোটাস
হেরােডােটাসের ইতিবৃত্ত : হেরোডোটাসই সর্বপ্রথম এক বিশাল পদ্ধতিগত ও ইতিহাসের নিয়ম অনুসৃত এক ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার গ্রন্থের নাম 'ইতিবৃত্ত' (Histories) যা সাধারণভাবে গ্রীক - পারসিক যুদ্ধের ইতিহাস (History of Gracco - Persian War) নামে খ্যাত। খ্রীঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রীসে বীরত্বব্যঞ্জক বিষয় সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল ও আসক্তি নিবারণের জন্যই তিনি এই ধরণের বিষয়কে অবলম্বন করে ইতিহাস লেখেন। তিনি যা কিছু জেনেছিলেন এবং দেখেছিলেন সবই তার মনের খােরাক হয়েছিল। তিনি তার বিবিধ ও বিচিত্র উৎসসমূহের তার পর্বের আয়ােনীয়ার কাহিনীদের অনুসরণে লিখলেও সেই কাহিনীকে ইতিহাসের প্রকৃত রূপ দান করে তার পূর্বের লেখকদের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার সাবলীল গদ্যে রচিত ইতিহাস পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

গ্রীকদের সঙ্গে প্রাচ্য শক্তিবর্গের সম্পর্কের বর্ণনা সম্পর্কে বর্ণনা হেরোডোটাসসের ইতিহাসের বিষয়বস্তু। এবং সময়সীমা লিডিয়ার রাজা ক্রোসাসের রাজত্বকাল থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৭৮ সাল সেসটসের পতন পর্যন্ত। এদিক থেকে বিচার করলে তার গ্রন্থকে সম্পূর্ণ অর্থে আধুনিক ইতিহাস বলা যায়। তিনি গ্রীকদের কাছে ৪৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আগ্রাসী পারসীকদের পরাজয় পর্যন্ত গ্রীক ও এশিয়াবাসীর মধ্যকার বিরাজমান সম্পর্কের বিবরণ দেন। দেশাত্মবােধে উদ্বুদ্ধ হেরােডােটাস গ্রীকদের কাছে পারসিকদের পরাজয়ের কাহিনী বর্ণনা করলেও প্রাচ্যদেশীয় সভ্যতা সংস্কৃতির বিবরণ দিতে কিন্তু ভুলেন নি। সমসাময়িক বৃহত্তর জনগােষ্ঠীর কাছে তার ইতিহাস সাদরে গৃহীত হয়েছিল।

হেরােডােটাসের গ্রন্থে এখন যে নয়টি খণ্ড দেখা যায়, তা তার সৃষ্টি নয়। কেননা তখন পর্যন্ত এই ধরনের খণ্ড বিভাগের রীতি প্রচলিত হয় নি। পরবর্তীকালে জনৈক আলেকজান্দ্রিয়ার সম্পাদক এই কাজ করেছিলেন। আধুনিক গ্রীক ঐতিহাসিক J. B. Bury খুব সরলভাবে হেরােডােটাসের ইতিবৃত্তের প্রশস্ততর, অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভাগগুলাে তুলে ধরেন। তার মতে ইতিবৃত্ত স্বাভাবিকভাবে তিন সর্গে বিভক্ত এবং প্রতি সর্গে আবার তিনটি করে ভাগ আছে। প্রথম সর্গের বর্ণিত বিষয় সাইরাস এবং ক্যাসবাইসেসের রাজত্বকাল ও ডারায়াসের রাজ্যরোহণ। দ্বিতীয় পর্বের আলােচ্য বিষয় ডারায়াস। তৃতীয় পর্বের জারেকসেস। প্রথম সর্গ মিশর সহ এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয় সর্গ ইউরোপ এবং তৃতীয় সর্গ গ্রীসের সঙ্গে যুক্ত। বিষয়বস্তুর মূল সুর অনুযায়ী দেখা যায় যে, প্রথম সর্গে পারস্য সাম্রাজ্যের উদ্ভব, বিকাশ ও বিজয়ের গাঁথা বর্ণিত হয়েছে। তৃতীয় সর্গের বিষয়বস্তু গ্রীস কর্তক পারস্যের পরাজয়। দ্বিতীয় সর্গের আলােচ্য বিষয় মিশ্র ধরণের। সেখানে একদিকে আছে স্কাইথিয়া এবং ম্যারাথনে পারস্যের ব্যর্থতার কথা, অন্য দিকে আছে আয়ােনিয়ায় গ্রীসের ব্যর্থতার কাহিনী। নয়টি অংশের প্রত্যেকটিতে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ধরা পড়ে। প্রথম অংশটির কেন্দ্রীয় বিষয় সাইরাস, দ্বিতীয়টির মিশর। অনুরূপভাবে চতুর্থটির স্কাইথিয়া, পঞ্চমটির আয়ােনিয়ার বিদ্রোহ এবং ষষ্ঠটির ম্যারাথন। সপ্তম অংশে আলােচনা করা হয়েছে – থার্মোপাইলির যুদ্ধ পর্যন্ত জারেকসেসের আক্রমণ কাহিনী। সালামিসে গ্রীসের বিপর্যয়ের কাহিনী আলােচিত হয়েছে অষ্টম অংশে। নবম অংশের বর্ণিত বিষয় প্রাটিয়া এবং মাইকালিতে গ্রীসের চুড়ান্ত জয়লাভের ইতিহাস। একমাত্র তৃতীয় অংশে বর্ণিত বিষয় ততটা ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ নয়। রাজপরিবারে যে বিদ্রোহের ফলে ডারায়াস সিংহাসন লাভ করেছিলেন তাই আলােচনা করা হয়েছে।

হেরােডােটাসের ইতিহাস রচনার বৈশিষ্ট্য : যুদ্ধের বর্ণনাদানে হেরােডােটাস তার উত্তরসূরী থুকিভিডিসের তুলনায় যথেষ্টই দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। যুদ্ধের বিবরণ দিতে গিয়ে তার অমনােযােগী ভাবটি ধরা পড়েছে। এইসঙ্গে বিস্তারিত যুদ্ধের বর্ণনা দিতেও তিনি অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। অবশ্য এই দুর্বলতা ও অক্ষমতা তিনি অন্যভাবে পূরণ করেছেন। যেমন, গ্রীক - পারসিক যুদ্ধ হেরােডােটাসের কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও সতন্ত্র সভ্যতার দ্বন্দ্ব বলে মনে হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব তার কাছে - হেলেনিক ও প্রাচ্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব বলে প্রতিভাত হয়েছে। এজন্য তিনি বিষয়ান্তরে গিয়ে দুই পরস্পর বিরােধী সভ্যতা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেন। এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে খ্রিষ্টপূর্ব যষ্ঠ ও পঞ্চম শতকে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও পশ্চিম এশিয়ার জাতিসমূহের কাছে একটি সুন্দর ও ব্যাখ্যান নির্ভর, উজ্জ্বল বর্ণনা তিনি তুলে ধরেন।

হেরােডােটাসের কৃতিত্ব হল এই যে, তিনি তার ইতিহাস জাতীয় গবেষণাকর্মের চরিত্র বােঝাতে গিয়ে সর্বপ্রথম Historia শব্দটি চয়ন করে। শিরােনামে ব্যবহার করেন। এর ফলে সাহিত্যক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয় এবং আজও ইতিহাস গবেষণার সাথে History শব্দটি আছে ও থাকবে। তাই একমাত্র History শব্দটির ব্যবহার ও এর সাথে জড়িত অর্থ হেরোডোটাসকে ইতিহাসের জনক রূপে আখ্যা দেওয়ার পক্ষে যথার্থ।

হেরােডোটাসের গ্রন্থ থেকে আমরা খ্রীঃ পূঃ ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রীক সভ্যতার একটি সামগ্রিক চিত্র পাই। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে হেরােডােটাসের রচনা তাই একটি সর্বব্যাপী গ্রন্থ। তাঁর এই গ্রন্থ আমাদের ইতিহাসের ঐক্য বিষয়ে শিক্ষা দেয়।

হেরােডােটাসের রচনা কেবল ঘটনা লিপিবদ্ধ করেই কাজ শেষ করেনি, বরং হেরোডোটাস একের পর এক প্রশ্ন করেছেন। ইতিহাস কথাটির অর্থ হল জিজ্ঞাসা। তার লিখিত ইতিহাস এই ক্রমিক জিজ্ঞাসার ফল। তিনি তার গ্রন্থের সূচনায় স্বীকার কৱেছেন যে এই গ্রন্থটি তার অনুসন্ধানের ফল। তিনি তার গ্রহে কখনও বিশ্বাসপ্রবণতা, আবার কখনও বা সতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন । ইতিহাসের বিষয়বস্তু সম্বন্ধে সঠিক ও সচেতন ধারণা দিয়েছেন। তাঁর কাছে ইতিহাস অতিকথন বা দেবতাভিত্তিক না হয়ে সম্পূর্ণ মানবীয় রূপে প্রতিভাত হয়েছে। অতিমানবীয় বা দানবাদি বিষয়গুলি তিনি একেবারেই বর্জন করেছেন তার বর্ণনায়। তিনি তার ইতিবৃত্তে মুখবন্ধে মানুষের অতীত কর্মকাণ্ডের বিবরণ লিপিবদ্ধ করাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি উৎসের গুরুত্ব সম্পর্কে খােলাখুলি না বললেও দেশ - বিদেশ ঘুরে সযত্ন গবেষণার মাধ্যমে উৎসসমূহ জোগাড় করেন এবং ঐগুলিকে ভিত্তি করে তার ইতিবৃত্ত রচনা করেন। ইতিহাস রচনায় এবং ঘটনার বর্ণনায় হেরোডোটাসের সত্য সন্ধানের প্রক্রিয়ার ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টার পরিচয় পাওয়া যায়। যদিও তাকে প্রায়ই জনশ্রুতির উপর নির্ভর করতে হয়েছিল তথাপি যা অধিকতর সম্ভাব্য, তাই প্রকৃত সত্য, এমন কোনাে প্রান্ত ধারণা তার মনে ছিল না। তিনি একজন অতি উত্তম তথ্য সংগ্রাহক ছিলেন এবং শিল্পীর মত সেগুলি উপস্থাপিত করেছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি ঐতিহাসিকের প্রকৃত দায়িত্ব পালন করেন নি, কারণ তথ্য সংগ্রহের পরে তার বিচার করা এবং সত্যতা যাচাই করা ঐতিহাসিকের দায়িত্ব।

হেরােডােটাস সর্বদা অপক্ষপাত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেননি। তিনি তাঁর সমগ্র গ্রন্থটি এথেনীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লিখেছিলেন। সর্বদা স্পার্টার প্রতি সুবিচার তিনি করেন নি। করিন্থের প্রতি তিনি বিদ্বেষপরায়ণ ছিলেন। হেরােডােটাস নিঃসন্দেহে একজন এথেন্সপ্রেমী গণতন্ত্রী ছিলেন। তার নজিরও তার লেখায় ধরা পড়ে। তার কাছে হাতে হাতে পাওয়া মৌখিক তথ্যের মূল্য অন্যের কাছ থেকে পাওয়া কাহিনীর মুল্যের চেয়ে বেশি। তবে তিনি যুদ্ধের ইতিহাস লিখলেও যুদ্ধ সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞানও তার ছিল না। এটি তার বড় ত্রুটি। তাই যুদ্ধের বর্ণনায় তিনি অনেক কিছু উপলব্ধি করতে পারেন নি বা সে ব্যাপারে তার যােগ্যতার অভাবের পরিচয় দিয়েছেন। গ্রীক ইতিহাসের সন - তারিখ সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে তিনি মাথা ঘামান নি। এই বিষয়ে তার উদাসীনতা দেখে মনে হয় যে, তিনি পরিপূর্ণ ঐতিহাসিক ছিলেন না, অর্ধ - ঐতিহাসিক ছিলেন। তাই বলা হয় যে, হেরােডোটাস ছিলেন পারসিক যুদ্ধের হোমার। প্রকৃতিগতভাবে তিনি ছিলেন গ্রীসের ইতিহাসে যে নবজাগরণ ঘটেছিল, তার পূর্ববর্তী। এই নব জাগরণকে তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন। তাকে উপলব্ধি করার জন্য তিনি বেঁচে ছিলেন না।

সমালোচনা : হেরােডােটাস নিজে সমালােচক ছিলেন না। কিন্তু প্রাচীনকাল থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক তার সমালােচনা করেছেন। যারা হেরােডােটাসের রচনার দোষ দেখাতে চেয়েছেন তারা বলেছেন ইতিহাস যে, সমসাময়িকদের মত তিনিও আকাশবাণী, স্বপ্ন, বীরের অতিপ্রাকৃত আবির্ভাব ইত্যাদিতে বিশ্বাস করতেন, যেহেতু তিনি ছিলেন একজন পর্যটক এবং দীর্ঘকাল তার কোন নির্দিষ্ট নগর ছিলনা সেহেতু নগররাষ্ট্রের রাজনীতি বিষয়ে মনােযােগ দেন নি। যুদ্ধের ইতিহাস লিখলেও সে সম্পর্কে তাঁর কোন ধারণা ছিল না আর তিনি সেনাপতি ছিলেন না। যুদ্ধের সাজসজ্জার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। কিন্তু স্থলে অথবা জলে রণকৌশল সম্পর্কে তার সঠিক ধারণা ছিল না। তবে ঐতিহাসিক হিগনেট মনে করেন যে, সামরিক বিষয়ে হেরােডোটাসের অজ্ঞতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখানাে হয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে থুকিডিদিস তার থেকে অনেক এগিয়ে আছেন। রণনীতি সম্পর্কে হেরােডোটাসের কোনাে স্পষ্ট ধারণা ছিল না একথা সত্যি। তবে হিগনেট এবং বিউরির মত তার বড় সমর্থনকারী ঐতিহাসিকেরাও স্বীকার করেছেন যে, পারসিক নৌ এবং সেনাবাহিনীর সংখ্যা সম্পর্কে চরম দায়িত্বহীনতা যুদ্ধের ইতিহাস রচয়িতা হিসেবে হেবােডাটাসের খ্যাতিকে বিশেষভাবে ক্ষুন্ন করেছে। এখানে অপরাধের দায়ভাগ তাঁকে একাই বহন করতে হবে। বিউরি বলেছেন, এই সৰ সংখ্যা তার ঐতিহাসিক নয়, মহাকাব্যিক মনের আভাস দেয়। এইসব ঐতিহাসিক বিতর্কের জের টেনে বলা যায়, সামরিক অনভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে হেরােডােটাস তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু সেই তথ্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারেন নি।

ঐতিহাসিক হিসেবে হেরােডােটাসকে আদিম আখ্যা দেওয়া হয়। বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছাৱ গভীরে প্রকৃত ঐতিহাসিক কারণের অনুসন্ধান তিনি করেননি। তবে হিগনেট বলেছেন, এর জন্য সবসময় তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে স্পার্টার সরকারের গােপনীয় মনােভাব তার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের পথে বাধা ছিল। তাই হয়ত তিনি পারসিক যুদ্ধে স্পার্টার অসুবিধার কথা উপলব্ধি করতে পারেন নি। তবে একথা সত্য, মৌখিক ঐতিহ্যের সীমাবদ্ধতা তার কাছে বড় বাধা ছিল। হেরােডােটাসের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযােগ এই যে, তার রচনায় ভৌগােলিক উপাদানের প্রাধান্য বেশী এবং তা অনেকসময়ই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়ােজন যে, সে প্রথম দিকের ইতিহাস সাহিত্যে ভৌগোলিক বিষয়াদি ছিল অন্যতম বৈশিষ্ট্য, হেরােডােটাস এখানে হেকাটিয়াস প্রবর্তিত ধারা অনুসরণ করেছিলেন। তাছাড়া একজন পর্যটক হিসেবে হেরােডােটাসের গ্রন্থে ভূগােলের ব্যাপক অনুপ্রবেশ প্রায় অনিবার্য হয়ে দাড়িয়েছিল। হেরােডােটাসের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযােগ এই যে, তিনি মূল বিষয় থেকে সরে এসেছেন, অবান্তর বিষয়ের অবতারণা করেছেন। বিউরি বলেন, এটি ছিল অন্যতম মহাকাব্যিক বৈশিষ্ট্য এবং তিনি সুপরিকল্পিতভাবে এই বৈশিষ্ট্যকে তার রচনার অঙ্গীভুত করেছিলেন। এইভাবে তিনি তার গ্রন্থে মহাকাব্যের বৈচিত্র্য এনেছিলেন। বস্তুতপক্ষে হেরােডােটাসই প্রথম ঐতিহাসিক, যিনি বিষয়বস্তুর দিক থেকে আধুনিক ইতিহাসের ভিতরে মহাকাব্যিক গুণাবলীর অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন।

হিগনেট বলেন, ঐতিহাসিক হিসেবে হেরােডােটাসের দূর্বলতা আলােচনা করা সহজ, কিন্তু এতদিন পরে তার শক্তির কথাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস রচনায় তিনি ছিলেন পথপদর্শক। তার সাফল্য থুকিডডিসকে আরও অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার মন জাতীয় কুসংস্কার থেকে দূরে ছিল। তিনি গ্রীসের শত্রুপক্ষের গুণাবলীর উল্লেখ করতে কার্পণ্য করেন নি। সন - তারিখের গোলমাল তার বই - এ থাকলেও একথা অনস্বীকার্য যে, এত অল্প উপাদানের উপর নির্ভর করে তিনি মােটামুটি গ্রহণযােগ্য কালানুক্রমিক কাঠামাে ইতিহাস লিখতে পেরেছিলেন। গল্প বলায় তাঁর সমকক্ষ তখন কেউ ছিল না। কিন্তু তাই বলে তার ইতিহাস গ্রন্থকে উপন্যাসােপম বলা যায় না। প্রকৃত ঐতিহাসিক ঐতিহ্য যখন তার হাতে এসেছিল, তখন তার উপযুক্ত ব্যবহার তিনি করেছিলেন। তাঁর রচনার বক্তৃতাবলী এবং কল্পকাহিনী অনৈতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। তবে তিনি এথেন্সের প্রশস্তি রচনা করেছিলেন এই অভিযােগ পুৰােপুরি ঠিক নয়। তাঁর স্বপক্ষে বলা যায় যে, এথেন্স সম্পর্কে যে ঐতিহ্য ইতিপূর্বে স্পষ্ট হয়েছিল, তিনি তাকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নতুন কোন ঐতিহ্য সৃষ্টি করেন নি। যুদ্ধ বিষয়ে তার অজ্ঞতাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে থুকিডডিস তার চেয়ে অনেক নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। তার রচনার নানা দুর্বলতা সত্ত্বেও পারসিক যুদ্ধ সম্পর্কে তাৱ গ্ৰন্থই একমাত্র নিশ্চিত ভিত্তি। তার রচনা সর্বদা গ্রহণযােগ্য নয়, একথা যেমন সত্য, তেমনই পুরােপুরি বর্জনীয় নয়, একথাও সমভাবে সত্য। থুকিডডিসের তুলনায় হেরােডোটাস কম বিজ্ঞানসম্মত মনের অধিকারী ছিলেন। তবে তার ইতিহাস বিজ্ঞানসম্মত ও সত্যনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে অপূর্ণতা রেখে গেলেও মানবসভ্যতার ইতিহাস পুনর্গঠনে এক সুফল বয়ে এনেছিল। তার বর্ণিত অনেক অবিশ্বাস্য বিবরণী এমন সব ইঙ্গিত বহন করত যা পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বা স্পষ্ট হয়েছিল। এগুলাের মধ্যে মিশরের ফেরাও নেকোর আহ্বানে ফনিসিয়ানদের দ্বারা আফ্রিকা প্রদক্ষিণ করার কাহিনীর উল্লেখ সবচেয়ে বেশি উল্লেখযােগ্য। সবশেষে উইল ডুবান্টের কথা উল্লেখ করে বলা যেতে পারে, এরিস্টটলের মত হেরােডোটাস বিস্তীর্ণ এলাকা পৰিভ্রমণ করেন। তাই ভুল করার অনেক সুযােগ তার হয়েছিল। তার অজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্য বড়ো মাপের। তিনিই প্রথম গ্রীক ঐতিহাসিক, যার রচনা আমাদের হাতে এসেছে।