হেরোডোটাসের ইতিহাস দর্শন।

author photo
- Friday, February 08, 2019
advertise here

হেরোডোটাস জীবনী।

গ্রীক ইতিহাস চর্চার এক বিপ্লব আনেন ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস। তার জীবন সম্পর্কে জ্ঞান খুব সীমিত। কারণ তার কোন জীবন কাহিনী লেখা হয়নি। হেরোডোটাসের পরিচয় পাওয়া খুব কঠিন একটি বিষয়। তাই তবে বলা যায় খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর শুরুর কালে হেরোডোটাস জন্ম হয় এবং ৪৫৪ খ্রীষ্টপূর্ব হেরোডোটাস হেলিকার্ণেসাস ত্যাগ করেন। কিছুকাল হেরোডোটাস স্যামসে শহরে ছিলেন, পরে এথেন্স চলে যান এবং সেখান থেকে ইতালী যান। খ্রীষ্টপূর্ব ৪৩১ অব্দ পেলোপনেশিয় যুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। তার জীবনের এই পরিমণ্ডলের মধ্যে বিভিন্ন ভ্রমন, বিখ্যাত ইতিহাস রচনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সযত্ন অনুসন্ধান চালানো বড় ব্যাপার ছিল।


হেরোডোটাসের ইতিবৃত্ত:

তিনি সর্বপ্রথম এক বিশাল পদ্ধতিগত ও ইতিহাসের নিয়ম অনুসৃত এক ঐতিহাসিক বই রচনা করেন। তার গ্রন্থের নাম "ইতিবৃত্ত" যা সাধারণভাবে "গ্রীক পারসিক যুদ্ধের ইতিহাস" নামে খ্যাত। তার সাবলীল গদ্য রচিতি ইতিহাস পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল।


গ্রিকদের সঙ্গে প্রাচ্য শক্তিবর্গের সম্পর্কের বর্ণনা হেরোডোটাসের ইতিহাসের বিষয়বস্তু। এবং সময়সীমা লিডিয়ার রাজা ক্রসাসের রাজত্বকাল থেকে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৭৮ সাল সেসটসের পতন পর্যন্ত। এদিক থেকে বিচার করলে তার গ্রন্থকে সম্পূর্ণ অর্থে আধুনিক ইতিহাস বলা যায়। তিনি গ্রিকদের কাছে ৪৭৮ খ্রীষ্টপূর্ব আগ্রাসী পারসিকদের পরাজয় পর্যন্ত গ্রীক ও এশিয়াবাসীর মধ্যকার বিরাজমান সম্পর্কের বিবরণ দেন।

হেরোডোটাসের গ্রন্থকে ৯ টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই ৯টি ভাগ করেন আলেকজন্দ্রিয়ার সম্পাদক। আধুনিক গ্রীক ঐতিহাসিক J.B.Bury খুব সরলভাবে হেরোডোটাসের ইতিবৃত্ত প্রশস্ততর, অপরিহার্য ও গুরত্বপূর্ণ ভাগগুলি তুলে ধরেন। তার মতে ইতিবৃত্ত স্বাভাবিকভাবে তিন পর্বে বিভক্ত এবং প্রতি পর্বে আবার তিনটি করে ভাগ আছে। প্রথম পর্বে বর্ণিত বিষয় সাইরাস এবং ক্যাসবাইসেসের রাজত্বকাল ও ডারায়াসের রাজ্যহরণ। দ্বিতীয় পর্বের আলোচ্য বিষয় ডারয়াস। তৃতীয় পর্বের জারেকসেস। প্রথম পর্ব মিশর সহ এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয় পর্ব ইউরোপের এবং তৃতীয় পর্ব গ্রিসের সঙ্গে যুক্ত।




বিষয়বস্তুর মূল সুর অনুযায়ী দেখা যায়, প্রথম পর্বে পারস্য সাম্রাজ্যের উদ্ধব, বিকাশ ও বিজয়ের গাঁথা বর্ণিত হয়েছে। তৃতীয় পর্বের বিষয়বস্তু গ্রিস কর্তৃক পারস্যর পরাজয়। দ্বিতীয় পর্বের আলোচ্য বিষয় মিশ্র ধরনের। সেখানে একদিকে আছে স্কাইথিয়া এবং ম্যারাথনে পারস্যর ব্যর্থতার কথা, অন্য দিকে আছে আয়োনিয়ায় গ্রিসের ব্যর্থতার কাহিনী। ৯ টি অংশের প্রত্যেকটিতে একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ধরা পড়েছে। প্রথম অংশটির কেন্দ্রীয় বিষয় সাইরাস, দ্বিতীয়টির মিশর, চতুর্থটি স্কাইথিয়া, পঞ্চমটির আয়োনিয়ার বিদ্রোহ, ষষ্ঠটির ম্যারাথন, সপ্তমটির থার্মোপাইলির যুদ্ধ পর্যন্ত জারেকসেসর আক্রমণ কাহিনী, অষ্টম অংশে সালামিসে গ্রিসের বিপর্জয়ের কাহিনী এবং নবম অংশে প্লাটিয়া এবং মাইকালিতে গ্রিসের জয়লাভ। একমাত্র তৃতীয় অংশে বর্ণিত বিষয় ততটা মিল নেই। রাজপরিবারের যে বিদ্রোহের ফলে ডারায়াস সিংহাসন লাভ করেছিল তাই আলোচনা করা হয়েছে।

এভাবে বিভিন্ন খন্ডে অত্যান্ত সাফল্যর সঙ্গে হেরোডোটাসের ইতিহাস সহজ সরল ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। তার রচনায় প্রকাশ্য ও উহ্যভাবে আধুনিক ইতিহাস তত্ত্বের প্রায় সবকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে তার অমনোযোগী ভাবটি ধরা পড়েছে। তবে এই দুর্বলতা তিনি অন্যভাবে পূরণ করেছেন। যেমন, গ্রীক পারসিক যুদ্ধ হেরোডোটাসের কাছে দুটি গুরত্বপূর্ণ ও সতন্ত্ৰ সভ্যতার দ্বন্দ্ব বলে মনে করছেন। এই দ্বন্দ্ব তার কাছে হেলেনিক ও প্রাচ্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব বলে প্রতিভাত হয়েছে।



তার সমগ্র গ্রন্থটি এথেনীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা হয়। সর্বদা স্পার্টার প্রতি অবিচার করেন। করিন্থের প্রতি তিনি ক্রুদ্ধ ছিলেন। তার কাছে হতে হতে পাওয়া মৌখিক তথ্য সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। গ্রীক ইতিহাসের সন-তারিখ সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাননি।

হেরোডোটাস ইতিহাসের জনক:

তিনি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অনেক যোগ্যতা ও কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তিনি "Historia" শব্দটি ব্যবহার করেন। এর ফলে সাহিত্যক্ষেত্রে এক বিপ্লবী পরিবর্তন সূচিত হয় এবং আজও ইতিহাস গবেষণার সাথে "History" শব্দটি আছে ও থাকবে। তাই একমাত্র "History" শব্দটির ব্যবহার ও এর সাথে জড়িত অর্থ হেরোডোটাসকে ইতিহাসের জনক রূপে আখ্যা দেওয়া হয়।

হেরোডোটাসের উক্তি:

"শান্তির সময় পুত্র পিতাকে সমাধিস্থ করে, আর যুদ্ধের সময় পিতা পুত্রকে সমাধিস্থ করে।"

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:

১) ইতিহাস ও ঐতিহাসিক - অমলেশ ত্রিপাঠী।
২) ইতিহাস ও ঐতিহাসিক - মমতাজুর রহমান তরফদার।
৩) ইতিহাসতত্ত্ব - এম. দেলওয়ার হোসেন।
৪) প্রাচীন যুগের গ্রিসের ইতিহাস - সুনীল চট্টোপাধ্যায়।
৫) History of Greece - Bury.
৬) Idea of History - R.G. Collingwood.
Advertisement advertise here