বাংলার লোকসংস্কৃতির অগ্রগতি।

author photo
- Thursday, February 14, 2019
advertise here

বাংলার লোকসংস্কৃতি (Folk Culture of Bengal)।

লোক শব্দটিকে ইংরেজীতে Folk বলা হয়। লোক বলতে বোঝায় সাধারণ অবিশেষিত মূল সমাজের গণ তথা সমূহ। ১৮৪৬ সালে উইলিয়াম জন টমস লোক শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করে।


লোকসমাজের সংস্কৃতি লোকসংস্কৃতি। এর দুটি ভাগ যথা - নির্বাক বা নির্ভাসিক ও বাককেন্দ্রিক। লোকসংস্কৃতির যে অংশ চিত্ররীতির প্রতিকধর্মী, আকরণ নির্ভর তাই নির্বাক। আলপনা, পূত্তলিকা, বৃক্ষ প্রতীক বা তাবিজ কবজ তাগা বন্ধন নির্বাক লোকসংস্কৃতি। বাককেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির দুটি প্রান্ত - সংক্ষিপ্ত প্রবাদ প্রবচন ছড়া চুটকি, অন্যদিকে বিস্তৃত গাঁথা, গীতি, গীতিকা, সংগীত, কথা বা কাব্য।

বর্তমান কালপর্বে বাংলায় মুসলমান সমাজের "কলমি পুঁথি" মিলেছে প্রচুর। সোনাভান-গদামল্লিক-চম্পাবতী-কলুগাজির কাহিনী কিংবা বোন বিবির জহরানামা এগুলোর মধ্যে দুটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
১) বাংলার মুসলমান সমাজ তাদের আত্মপ্রকাশের উপকরণ হিসাবে বাংলা ভাষাকে আশ্রয় করেছেন।
২) দূর আরব বা ইরাক ইরান তুরস্ক নয়। এসব কাহিনীর চরিত্র ছিল দেশীয়।

শ্রীহট্ট সিলেটি নগরী বা অন্যরকম চেষ্টায় যে প্রবণতা, উক্ত কলমী পুঁথির মধ্যে তার প্রভাব কম। তাই একে লোক বলেছে।

লোকসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দেখা দেয় ১৮৭২ সালে হিন্দুমেলায়। এখানে দেশীয় সংস্কৃতিকে আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। ১৮৮৪ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছড়া ও গান সংগ্রহ করেন । তার সংগ্রহ তিনভাগে বিভক্ত: ১) হর পার্বতীর গান, ২) রাধাকৃষ্ণের গান, ৩) সাধারণ প্রেমসঙ্গীত।

"প্রবাসী" রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন 'বাউল সঙ্গীত' (১৯১৫)। এর আগে নফর চন্দ্র দত্ত ১৮৮৩ সালে কিছু বাউল গান সংগ্রহ ও প্রকাশ করেন।

এরপর বাংলায় লোকসংস্কৃতি সংগ্রহের প্রবল উৎসাহ লক্ষ্য করি। যোগীন্দ্রনাথ সরকার 'খুকুমনির ছড়া' (১৮৯৯), আশুতোষ মুখোপাধ্যায় 'ছেলে ভুলানো ছড়া' (১৮৯৯), প্রকাশ করেন।

রূপকথা সংগ্রহে এগিয়ে আসেন বাঙালি যাজক লালবিহারী দে। ১৮৮৩ সালে তার গ্রন্থ "Folktales of Bengal" ইংরেজিতে লেখা হয়। এরপর দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার সংগ্রহ করেন 'ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৬), 'ঠাকুর দাদার ঝুলি (১৯০৮),।

অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকার "The Folk-Elements in Hindu Culture" লেখেন ১৯১৭ সালে। এতে তিনি বাংলার লোকশিল্প, লোকঐতিহ্য, লোকসঙ্গীত ও লোকউৎসব কে গুরত্ব দিয়েছেন। তার উৎসাহে হরিদাস পালিত লিখেছেন গাজন।


১৯১৯ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন "বাংলার ব্রত"।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক দীনেশ চন্দ্র সেন লোকসংস্কৃতি চর্চার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রেখেছেন। তার "Folk literature of Bengal" "Eastern Bengal Ballads" অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ রচনা।

এরপর বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার ধারাবাহিকতায় অধ্যাপক আশুতোষ ভট্টাচার্য, আশরাফ সিদ্দিকী নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্যার গুরুসদয় দত্ত থেকে শঙ্কর সেনগুপ্ত বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার বিপুল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

লোকসংস্কৃতির শিল্পী সাহিত্যিক নিজেরা যা গড়েন তার সঙ্গে গ্রামীণ ঐতিহ্যর পরম্পরা সক্রিয় থাকে। যারা তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাজনীতির কাছে লাগায় কিংবা অর্থনৈতিক চক্রে যুক্ত করে।

সহায়ক গ্রন্থাবলী:

১) অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র সেন - Folk Literature of Bengal (1920).
২) ড: বিনয় কুমার সরকার - The Folk Elements in Hindu Culture.
৩) ড: আশরাফ সিদ্দিকী - Bengali Folklore Collection and Studies - 1800-1947. Bangla Academy, Dacca, 1980.

ট্যাগ :
Advertisement advertise here