শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায় উদ্ধব।

author photo
- Sunday, February 10, 2019
advertise here

বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায়।

উনিশ শতকের প্রথমে বাংলা তথা ভারতে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এক বিশাল শিক্ষিত সম্প্রদায় বাংলা ও ভারতে আতপ্রকাশ করে। এর প্রধান কারণ ছিল স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার জন্য মিশনারী ও বেসরকারী উদ্যোগে এবং কলকাতা বিশববিদ্যালয়ের প্রভাব। এই শিক্ষিত সম্প্রদায় থেকে গড়ে উঠেছে বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী। আধুনিক ভারতের


জাতীয়তাবাদের উত্থান ও জাতীয় আন্দোলনে এই সম্প্রদায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৮৮০ দশকে ভারতে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৫০,০০০। ১৯০৭ সালে সেটি বেড়ে ৫,০৫,০০০ হয়।

ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিদের কাছে অনেক বৃত্তি লাভের সুযোগ আসে সেগুলির অস্তিত্ব প্রাক-উপনিবেশিক আমলে ছিল না। তারা আইনজীবী, সাংবাদিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার প্রমুখ হবার সুযোগ পান। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে আইন ব্যবস্থা দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বা ইংরেজী শিক্ষার সুযোগ বেশিরভাগ নেন হিন্দুরা এবং বিশেষ করে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। বাংলার কলেজ ছাত্রদের অধিকাংশই আসত ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য পরিবার থেকে। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে কৃষিবিদ্যা, বাণিজ্য বা প্রযুক্তিগত বিদ্যাচর্চায় খুব বেশি আগ্রহ ছিল না। সুতরাং ইংরেজি শিক্ষায় ও বিশববিদ্যালয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালিরা নতুন ধরনের বৃত্তি ও চাকুরীতে প্রবেশ করার ফলে এক নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্মও হয়। তবে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দেশজ শিকড় ছিল মজবুত। দেশের ঐতিহ্যকে তারা ভুলেনি।



উপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালির বা ভারতীয়রা কিন্তু উপনিবেশিক নীতি, আদর্শ মতাদর্শের সমালোচনা করতে থাকেন। তারা উপলব্ধি করতে পারেন যে উপনিবেশিক শাসন পদ্ধতির সঙ্গে ইউরোপিয় গণতন্ত্রের ধারণা বা যুক্তি এবং সাম্য ও আইনের শাসনের মিল খুব কমই আছে। শিক্ষিত বাঙালি বা ভারতীয়রা শিক্ষার মাধ্যমেই উপনবেশিক শাসনের কুফল সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে যা ভারতবর্ষের ইতিহাসকে বা জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সংঘবদ্ধ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমালোচনা শুরু করে। সংগঠিত জাতীয়তাবাদ এদের মাধ্যমেই বিকশিত হতে থাকে। এই শিক্ষিত বাঙালিরা প্রথম জাতীয় সচেতনতা অর্জন করেছিল। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। তারাই অনেকাংশে ভারতীয় জনগনকে আধুনিক জাতিতে সংহত করেছিল। তারাই ছিলেন রাজনৈতিক জাতীয় আন্দোলনের পথপ্রদর্শক, সংগঠক ও নেতা। শিক্ষামূলক ও প্রচারমূলক কার্যাবলীর মাধ্যমে তারাই জনসাধারণের বৃহত্তর অংশের মধ্যে স্বদেশীকতা ও স্বাধীনতার ধরণা এনে দিয়েছ। তারাই সৃষ্টি করেছিল সমৃদ্ধশালী সংস্কৃতি ও সাহিত্য যার মধ্য দিয়েই তারা ভারতে জাতীয়তা ও গণতন্ত্রের বীজ বুনতে চেয়েছিল।



বিংশ শতাব্দীতে বাংলা তথা ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ, বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায় প্রমুখ বাঙালি ও ভারতীয় সংগ্রামশিল নেতৃবৃন্দ সবাই ইংরেজি জানা বুদ্ধিজীবী ছিলেন। সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবকশ্রেণী দ্বারা পরিচালিত হয়। শিক্ষিত বাঙালির মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:

১) সুখময় সেনগুপ্ত - বাঙালি মনীষীর শিক্ষাচিন্তা ও সাধনা।

২) অমিতাভ মুখোপাধ্যায় - উনিশ শতকের সমাজ ও সংস্কৃতি।

৩) সমর কুমার মল্লিক - আধুনিক ভারতের দেড়শো বছর।
Advertisement advertise here