ইতিহাসের কার্যকারণ উদঘাটন

- February 09, 2019
ইতিহাসচর্চা হল কারণের চর্চা। ইতিহাসের কার্যকরন (ইংরেজি:Causation) বলতে আমরা ঐতিহাসিক বিষয় সমূহের মৌলিকতাকে বুঝি। ইতিহাস স্থান প্রতি ঘটনা ও বিষয় সমূহ সংগঠিত হবার পিছনে নানাবিধ কারণ হল কার্যকরন। অন্যভাবে বলা যায়, ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন বা সংগঠিত হবার পটভূমি হল কার্যকরণ। কোন চুক্তি, সেমিনার, যুদ্ধ, নির্মাণ, পতনকে অনিবার্য করে তোলার পিছনে তারনামুলুক দিককে কার্যকরণ বলে অভিহিত করা হয়। কোন কাজের পিছনের কারনই হল কার্যকরণ।
ইতিহাসের কার্যকরণ উদঘাটন
ইতিহাসের কার্যকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন মত : ঐতিহাসিক হেরোডোটাস খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে ইতিহাস ঘটনার কার্যকারণের উপর বেশি জোর দিয়েছেন। তিনি তার রচনায় নিজের উদ্দেশ্য নির্দেশ করেছেন। অষ্টাদশ শতকে আধুনিক ইতিহাসতত্ত্বের গোড়াপত্তন শুরুর লগ্নে ফরাসী দার্শনিক মন্টেস্কু বলেন, প্রতিটি রাজবংশ বা সাম্রাজ্যর উথান, অবক্ষয় ও পতনের মূলে কিছু সাধারণ, নৈতিক বা বাস্তব কারণ সক্রিয় থাকে আর যত কিছু ঘটুক না কেন তা এসব কারণের সাথে সম্পর্কিত। মন্তেষ্কু তার "Spirit of Laws" গ্রন্থে বিষয়টি আরও বিকশিত ও বোধগম্য করে তোলেন।

কার্যকরণ উদঘাটনের কৌশল : কার্যকরণ-বের করার জন্য ঐতিহাসিককে নানাভাবে বহুমুখী প্রশ্ন করতে হয়। যাইহোক ইতিহাসের কার্যকরন উদঘাটনের পদ্ধতিকে দুভাগে ভাগ করা যায়। ১) নির্ধারণবাদ বা নিমিত্তবাদ ও ২) অপ্রত্যাশিত বা দৈবঘটনা, পরিভাষায় যাকে বলা হয় আপতন বা ক্লিওপটার নাক।

নির্ধারণবাদ বা নিমিত্তবাদের গুরত্ব : নির্ধারণবাদ এমন এক ধরনের বিশ্বাস যে, যা কিছু ঘটছে তার সবই এক বা একাধিক কারণ আছে এবং সেই কারণ বা কারণগুলি যদি অন্যরকম না হতো তাহলে এর চেয়ে আলাদা কিছু হতে পারতোনা। নিমিত্তবাদ শুধু ইতিহাসের সমস্যা নয়, সমগ্র মানবীয় আচার আচরণই সমস্যা। প্রত্যেক ঘটনার মুলে কোনো না কোনো কারণ নিহিত আছে বলে কথিত আমাদের চারদিকে কি ঘটছে তা বোঝার পূর্বশর্ত। নির্ধারণবাদের অর্থ হল, তথ্যগুলি একই থাকলে যা ঘটবেই। কিছুতেই এক অন্যথা হতে পারে না।

প্রত্যেক মানুষের কাজের একাধিক কারণ থাকে। ঐতিহাসিকের বিশেষ কাজ ও দায়িত্ব হল এ সকল কারণ অনুসন্ধান করা। এর দ্বারা মনে হবে যে, তিনি মানবীয় আচরণের স্থিরকৃত দিকটা প্রতি বিশেষভাবে আগ্রহী। ইতিহাসে কোন ঘটনায় অনিবার্য নয়।

ধরা যাক রাম ও রহিমের এর মধ্য বেশ বন্ধুত্ব আছে। নিমিত্তবাদ অনুসারে রাম কোন মানবীয় কারণে রহিম এর সাথে বিরূপ আচরণ করছে। অথবা বিরূপ আচরনে রহিম ক্রুদ্ধ হয়, তা দেখে মজা করার জন্য ইচ্ছে করেই বিরূপ আচরণ করছে। নিমিত্তবাদী ঐতিহাসিক রাম এর বিরূপ আচরণ করার সার্বিক ভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। ততপর দেখা যাবে রাম হয়তো শারীরিক ও মানসিকভাবে কমবেশি অসুস্থ বা অর্থনৈতিক ভাবে কোন অসুবিধার মধ্যে আছে, হয়তো কোন দুঃসংবাদে শোকাহত বা কোন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে সমস্যাগ্রস্থ। এটাই হল নিমিত্তবাদ দ্বারা ইতিহাসের কার্যকরণ।

দৈবঘটনা বা আপতন তত্ত্বর গুরত্ব : আপতন বা ক্লিওপাট্রার নাক বা অপ্রত্যাশিত বা দৈবঘটনা তত্ত্ব অনুসারে ইতিহাসকে কেবল আকস্মিক ঘটনার সংগ্রহ বা সংকলন বলা যায়। এখানে ঘটনাপ্রবাহ দৈবক্রমে অভাবিত পূর্বপ্রেক্ষিতের উপর জোর দেয়া হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এক টিয়ামযুদ্ধের ফলাফল ঐতিহাসিক বর্ণিত কারণের প্রতি আরোপ না করে ক্লিওপাট্রার প্রতি এন্ট্রিনিওর প্রতি আকর্ষণ কে বেশি গুরত্ব দেওয়া হয়। অনুরূপভাবে ১৯২৩ সালের শরৎকালে জিনোভিয়েব, কামেনেভ এবং স্ট্যালিনের সাথে ক্ষমতার দ্বন্ধে ট্রটস্কির পরাজয়কে কেবল হেমন্তকালে হাঁস শিকারে গিয়ে তার অসুস্থ হয়ে পড়ার উপর আরোপ করা হয়। ক্লিওপাট্রার জন্য এন্ট্রিনিওর আকর্ষণ বা ট্রটস্কির ঠান্ডা লেগে জ্বর অতি সাধারণভাবে কার্যকারণসূত্রে নির্ধারিত। রমণীর সৌন্দর্য ও পুরুষের আকর্ষণ বা পুরুষের সৌন্দর্য ও রমণীর আকর্ষণ প্রতাহিক জীবনের সাধারণ ঘটনা। তবুও বিশ্লেষণের অভাবজনিত কারণে বা বিশ্লেষণের প্রতি অনীহার জন্য অনেকের নিকট দৈব ঘটনাগুলি বেশি প্রাধান্য পায়। এটা সঠিক বলে মনে করা ঠিক নয়।

মন্টেস্কু আকস্মিকতার অহেতুক প্রভাব থেকে ইতিহাস চর্চার রীতিনীতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তার মতে যদি কোন নির্দিষ্ট ব্যাপার, যেমন যুদ্ধের আকস্মিক ফলাফল একটি রাষ্ট্রের ধ্বংস সাধন করে তবে মনে করতে হবে যে সেখানে এমন পরিস্থিতির উদ্ধব হয়েছিল যাতে করে একটি খণ্ডযুদ্ধে পরাজই রাষ্ট্রটির অধঃপতনের জন্য যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হয়। তাই একটি আকস্মিক ঘটনার ফলাফলের উপর বিশেষ গুরত্ব দেওয়া কোন ঐতিহাসিকের পক্ষে উচিত হবে না।

কার্ল মার্কসের মতে আকস্মিক ঘটনা ঘটনা প্রবাহের গতিবেগকে বিলম্বিত করে, কিন্তু ঘটনা প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে না। আবার কোন কোন মতে অজ্ঞতার জন্যই আমরা ঘটনার আকস্মিকতার উপর বেশি জোর দিই। আবার কায়ক্লেশ সাধ্য অনুসন্ধান প্রক্রিয়া পরিহার করার উদ্দেশ্য অনেক দুর্ঘটনাকে বেশি প্রাধান্য দেন। এদেরকে নিচুমানের ঐতিহাসিক বলা হয়।

গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে অনেক সময় সাধারণ ঘটনা ঐতিহাসিক ঘটনায় রূপান্তরিত হয়। সকল ঘটনা ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। কার্যকরণ বিষয়ক ঐতিহাসিকের কর্তৃক আরোপিত কার্যকরণ ও ঐতিহাসিকের মধ্যে দৈত্য ও পারস্পরিক ক্রিয়া প্রক্রিয়া বর্তমান আছে। কার্যকরণ ঐতিহাসিকের ইতিহাস প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করার ধরণ স্থির করে। আবার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ধরণ ঐতিহাসিক দ্বারা আরোপিত কারণগুলি ঠিক করার ব্যাপারে বড়ো ভূমিকা পালন করে। ক্লিওপাট্রার সুন্দর্য, লেনিনের অকাল মৃত্যু প্রভুতি আকস্মিক ঘটনা ইতিহাসের গতিধারাকে পরিবর্তিত করেছিল। এগুলোর উপর বেশি গুরত্বআরোপ বা সম্পূর্ণ গুরত্বহীন করা যায় না। ঐতিহাসিকের জগৎ বৈজ্ঞানিকের জগতের মত প্রকৃত পৃথিবীর আলোকচিত্রতুল্য প্রতিলিপি নয়, বরং এটাকে কাজ চালানোর মত একটি আদল বলা যায়। যার মাধ্যমে ঐতিহাসিক মোটামুটিভাবে এটাকে বুঝতে ও রপ্ত করতে সক্ষম হয়।

উপসংহার : ট্যালকট পারসনস বলেন, ইতিহাস শুধু বাস্তবতার সঙ্গে সঠিক সম্পর্ক নির্ধরণী নয়, করণসম্মত সম্পর্ক নির্ধারণেও নির্বাচনমুলুক পদ্ধতি। অন্তত তথ্যর মধ্য থেকে ঠিক যেভাবে ঐতিহাসিক তার প্রয়োজনীয় তথ্যটি ঘটনার তাপ্পর্য অনুসারে নির্বাচন করে থাকেন, ঠিক তেমনই সংগঠিত ঘটনার কারণ ও ফলাফলের অজস্র ক্রমের মধ্য থেকে তিনি শুধু সেগুলোই নির্বাচন করেন যেগুলো তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। আবার কারণগুলির প্রতি কোনো ঐতিহাসিক গুরত্ব আরোপের মান নির্ভর করবে সেগুলোকে যক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ খাপ খাইয়ে নেওয়ার মধ্যে। অনান্য কার্যকাণ - পরম্পরাকে আপতন (Chance) বলে বাতিল করতে হয়, কেননা তাদের কার্যকারণের সম্পর্কই যে শুধু পৃথক তা নয়, এটি অপ্রাসঙ্গিক। এখানে ঐতিহাসিকের করার কিছু থাকে না। যাওয়া। যৌক্তিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের সাথে এদের কোনােভাবেই আলাদা করা যায় না এবং অতীত ও বর্তমানের ক্ষেত্রে তা অর্থবহ নয়, বরং অপ্রাসঙ্গিক। ক্লিওপাট্রার নাকের সৌন্দর্য, লেনিনের অকাল মৃত্যু প্রভূতির কিছু না কিছু ফল ছিল। কিন্তু এর থেকে যদি ধরে নেওয়া হয় যে সুন্দরীর প্রতি মোহাচ্ছন্ন জন্য সেনাপতিদের সামরিক পরাজয় ঘটে তবে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে। ঠিক তেমনি ১৯৯০ -এর দশকে সােভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রে যে সব সংঘাত হয়েছিল তার কারণ হলাে, শিল্পায়নের হার বা শহরের লােকদের খাদ্য সরবরাহের জন্য আরও বেশি শস্য উৎপাদন করতে কৃষকদের উৎসাহিত করার সেরা উপায় ইত্যাদি নিয়ে আলাপ আলােচনা বা মতানৈক্য, বা এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষমতার লড়াই ও তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। এইসব কারণে নিয়ে তখনকার ঘটনা ব্যাখ্যা করলে সে বক্তব্যকে যুক্তিযুক্ত ও ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। এগুলিই ছিল আসল কারণ এবং অন্য ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতেও এগুলি প্রয়োগ করা যেতে পারে। অতএব লেনিন - এর অকালমৃত্যু এই আপতিক ঘটনাটি কারণ নয়। এটিকে রাশিয়ার দ্বন্দ্বমুখর সংগ্রামের কারণ বললে ভুল ব্যাখ্যা হবে। এক্ষেত্রে হেগেলে সেই বহু উদ্ধত বাণীটির কথা বলা যায়, "যা কিছু যৌক্তিক তা - ই বাস্তব এবং যা কিছু বাস্তব, তা - ই যৌক্তিক"। বাণীটি উদ্ধত হয়েছে বহুবার এবং ভুল বােঝাও হয়েছে বহুবার।

ইতিহাসের কারণগুলি খুঁজতে গিয়ে ঐতিহাসিক যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ও আপতিক কারণের মধ্যে পার্থক্য করেন। যুক্তিগ্রাহ্য কারণগুলাে দেশ, কাল ও অবস্থা ভেদে প্রযােজ্য হতে পারে বলে সেগুলিকে শেষ অবধি ফলদায়ী সাধারণীকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া যায় এবং সেগুলাে থেকে শিক্ষাও পাওয়া যায়। সেগুলাে তাই আমাদের বোধ বিস্মৃতি ও গভীর করার উদ্দেশ্যে কাজে লাগে। অন্যদিকে আপতিক কারণগুলাের কোনাে সাধারণীকরণ করা যায় না। আর যেহেতু সব অর্থেই সেগুলাে অনন্য তাই শেষপর্যন্ত সেগুলাে থেকে না পাওয়া যায় কোনো শিক্ষা, না পৌঁছানাে যায় কোনাে সিদ্ধান্তে। উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ্য রাখার ধারণাটি থেকে ইতিহাসে কার্যকারণ নির্ণয়ে আমাদের পর্যালােচনার চাবিকাঠিটি পাওয়া যায়। এর সঙ্গে আবার মূল্যায়নের প্রশ্নটিও অবধারিতভাবেই জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের ব্যাখ্যান, বিশ্লেষণ সর্বদাই মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর ব্যাখ্যানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কার্যকারণ নির্ণয়। এইখানেই ইতিহাসের দ্বৈত তথা পরস্পর নির্ভর ভূমিকাটির কথা চলে আসে। আর এই ভূমিকাটি হলাে, বর্তমানের আলােয় অতীতকে তথা অতীতের আলেয় বর্তমানকে আরও ভালাে করে বুঝতে সাহায্য করা। যা কিছু এই দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধনে সহায় হতে পারে না, যেমন ক্লিওপট্রর নাকের সৌন্দর্যের প্রতি অ্যান্টনির মোহ, ঐতিহাসিকের চোখে তাই মৃত ও নিস্ফল। তবে অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতেরও সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহ্যকে এক হাত থেকে অন্য হাতে তুলে দিয়েই ইতিহাসের সূচনা। আর ঐতিহ্য বলতে বােঝায় অতীতের অভ্যাস ও শিক্ষা ভবিষ্যতে বয়ে নিয়ে যাও। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুবিধার জন্যই শুরু হয়েছিল অতীতে বিবরণ রেখে যাওয়ার কাজ।