বাংলা চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইতিহাস

- February 14, 2019
বাংলায় চলচ্চিত্র সচেতনতার সূচনা ঘটেছে মফঃস্বল শহরে। একটু বিস্ময়কর হলেও সত্য। ১৯৩৯ সালে ফরিদপুরে গড়ে উঠেছিল প্রথম বঙ্গীয় চলচ্চিত্র সম্মিলনী। ইতিপূর্বে ১৯২০-র পর থেকেই চলচ্চিত্র বিষয়ক আলােচনা শুরু হয়। নাচঘর, বায়ােস্কোপ, চিত্রলেখা, চিত্রপঞ্জী চলচ্চিত্র সম্পর্কে আলােচনার পত্রপত্রিকা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। চলচ্চিত্র সম্পর্কে প্রথম বাংলা বই লেখেন নরেন্দ্র দেব (১৮৮৮-১৯৭১) — 'সিনেমা : ছায়ার মায়ার বিচিত্র রহস্য' (১৯৩৪)। রবীন্দ্রনাথ কোনাে জার্মান কোম্পানির জন্য চলচ্চিত্র ভাষ্য লিখেছিলেন ‘শিশুতীর্থ' অবলম্বনে। এটিকে ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে ধরতে হবে।
বাংলা চলচ্চিত্র আন্দোলন
বাংলার প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র চাষার মেয়ে আর চোরকাটা ১৯২৪ সালে মুক্তি পায়। পঙ্কজ কুমার মল্লিক (১৯০৫-১৯৬৮) আর মলিনা দেবী (১৯১৪-১৯৭৭) এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিভাননী দেবী (১৮৯৫-১৯৭৮) নীরদা সুন্দরী (১৮৮৩-১৯৭৪) ছিলেন নাট্যাভিনেত্রী।

বাংলা চলচ্চিত্রের আদি পুরুষ হিসাবে স্মরণীয় ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৯৩ - ১৯৭৮) ডি.জি. হিসাবে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি সিনেমায় এনেছিলেন গতি ও শিল্পগুণ। ২৪টি নির্বাক আর ২৫টি সবাক চলচ্চিত্র তৈরি করেন ডি.জি.। ১৯১৯ তিনি নীতিশ লাহিড়ীর সঙ্গে গড়ে তােলেন ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি। বিলাত ফেরৎ, যশােদা নন্দন, সাধু কি শয়তান এই সময়ের নির্বাক চলচ্চিত্র। ১৯২৮ ব্রিটিশ ডােমিনিয়ান ফিল্ম কোম্পানি গড়ে তােলেন। তিনি আটটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯৫০-এ সবাক চিত্র এল। নিউ থিয়েটার্সের হয়ে তিনি তৈরি করেন মাসতুতো ভাই, ভক্ত কবীর, অচিন প্রিয়া প্রভৃতি। ধীরেন্দ্রনাথ বাংলা ছাড়াও ইংরেজী, হিন্দী, উর্দু প্রভৃতি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। পেয়েছিলেন ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৭৬)। স্ত্রী রমলা দেবী আর মেয়ে পারুল ও মনিকাদেরও চলচ্চিত্রে অভিনয় করিয়েছেন। নিজেও ছিলেন সুপুরুষ অভিনেতা।

মধু বসু, শান্তি গুপ্ত, বিজয় ভট্টাচার্য, সতু রায়, অর্ধেন্দু, সুমিত্রা দেবী প্রকৃতি বাংলা পেশাদারী চলচ্চিত্রে কিছু অবদান রেখে যান। সাহিত্য ক্ষেত্র থেকে এসেছিলেন শৈলজানন্দ মুখােপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি। বাংলা পেশাদারী চলচ্চিত্র শাসন করেছেন দেবকী কুমার বসু (১৮৯৮-১৯৭১), ছবি বিশ্বাস (১৯০০-১৯৬২), অনুভা গুপ্ত (১৯৩০-১৯৭২) বা উত্তমকুমার (১৯২৬-১৯৮০)। এই পর্যায়ে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে সর্বকালের জনপ্রিয়তার সীমা ছাড়িয়েছে।

আর্ট ফিল্মের ক্ষেত্রে বাঙালীর কৃতিত্ব অত্যন্ত কার্যকরী। এই ক্ষেত্রে দুজন শিল্পীর কৃতিত্ব তুলনারহিত। ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫-১৯৭৬) এর অভিমানী পদক্ষেপ বাংলা চলচ্চিত্রের অহঙ্কার। প্রথমে বিমল রায়ের সহযােগী ছিলেন। ১৯৫২-তে নাগরিক আর্থিক কারণে শেষ অবধি মুক্তি পায়নি। ১৯৫৭ মুক্তি পায় অযান্ত্রিক। এরপর বাড়ি থেকে পালিয়ে, মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণ রেখা প্রভূতি অপূর্ব।

সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২) বাংলা চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে রাজকীয় বৈভব ও সার্থকতার প্রতিনিধি। ১৯৫৫ সালে 'পথের পাঁচালী' মুক্তি পায়। আন্তজাতিক খ্যাতি ও পুরস্কার লাভ করে এই চলচ্চিত্র। এরপর একে একে অপুর সংসার, নায়ক, কাপুরুষ মহাপুরুষ, দেবী, কাঞ্চনজঙ্ঘা, চারুলতা, তিনকন্যা, ঘরে বাইরে প্রভৃতি মুক্তি পায়। সত্যজিৎ হয়ে ওঠেন কিংবদন্তী। শেষের দিকে সমাজ ব্যবস্থাকে তির্যক চোখে দেখেছেন। এই ভঙ্গির প্রধান ছবি – অশনি সংকেত, গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে, শাখা প্রশাখা, আগন্তুক ও গণশত্রু। সত্যজিৎ রায় ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রত্যেক শাখাতেই ছিল অবাধ যাতায়াত। এমনকি চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট এঁকে দিয়েছেন নিজেই। এইরকম বহুমুখী প্রতিভা বাংলায় চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে আর আসেনি। শুধু বাংলাই বা কেন, ভারতের অন্য কোথাও এমনকি সারা পৃথিবীতেও তিনি অদ্বিতীয়। হিন্দী ও ইংরেজীতেও তার কিছু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। সিকিম রাষ্ট্র। সম্পর্কে তথ্যচিত্রটি মুক্তিলাভ করেনি। 'শতরঞ্চ কি খিলাড়ি' একটি সার্থক ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র। দুরদর্শনের জন্য তৈরি তার টেলিফিল্ম ‘সদগতি' একটি সমাজ সচেতন চলচ্চিত্র। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে শিল্পীর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।

ছোটদের উপযােগী সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘সােনার কেল্লা'। কিশাের উপযােগী অ্যাডভেঞ্চারধর্মী চলচ্চিত্র নিজের গােয়েন্দা কাহিনী ফেলুদা-সিরিজের শুরু ‘সােনার কেল্লায়' এরপর “ফেলুদা যুগ যুগ জিও" প্রভৃতিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন । তৰে সত্যজিৎ রায়ের হাতে ফরাসী রাষ্ট্রপতি এসে যখন দিয়ে যান ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লিজিয়ন অফ অনার বা দূরদর্শনের মারফত অসুস্থ সত্যজিৎ রায়কে দেওয়া হয় মার্কিন তথা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার অষ্কার, তার তুলনা ও গৌরবের পরিমাপ করা অসম্ভব।

ঋত্বিক ও সত্যজিতের ধারাবাহিকতা বাংলার চলচ্চিত্রকাররা রক্ষা করেছেন। মৃণাল সেন, গৌতম ঘােষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বা অর্পণা সেনৱা সেই ঐতিহ্য এগিয়ে নিচ্ছেন।