গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক।

author photo
- Wednesday, February 27, 2019
advertise here

শশাঙ্ক ইতিহাস।

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের প্রথমভাগে স্বাধীন গৌড় রাজ্য খ্যাতি ও প্রভাব অর্জন করে। এই খ্যাতি ও প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেন গৌড়াধিপতি শশাঙ্ক (ইংরেজি: Sasanka)। শশাঙ্কের রাজত্ব ছিল ৬০৬ থেকে ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অনেকের মতে তিনি গুপ্তবংশসদ্ভুত ছিলেন এবং শশাঙ্কের অপর নাম ছিল নরেন্দ্রগুপ্ত। আবার অনেকে বলেন, শশাঙ্ক পরবর্তী-গুপ্তবংশীয় মগধ-রাজ মহাসেন গুপ্তের অধীনে সামন্ত ছিলেন। মহাসেন গুপ্তের মৃত্যুর পর ৬০৬ সালের পূর্বেই তিনি গৌড় স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই যুগে প্রাচীন গৌড় অঞ্চল বলতে উত্তর বাংলা ও পশ্চিম বাংলাকে বোঝাত। শশাঙ্ক ও গৌড় রাজ্যের রাজধানী ছিল


কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনা। তাঁর অষ্টম ও দশম রাজ্যঅংশে প্রকাশিত দুটি লিপি পাওয়া গেছে, মেদিনীপুর থেকে তারিখবিহীন অপর একটি লিপি খড়গপুরের নিকট এগ্‌রা হতে আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া শশাঙ্কের অধীনস্থ গঞ্জামের রাজা মাধববর্মার তাম্রশাসন (৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের), হর্ষবর্ধনের বাঁশখেরা ও মধুবন তাম্রশাসন ও কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মনের নিধানপুর তাম্রশাসন থেকে শশাঙ্ক সম্পর্কে জানা যায়। শশাঙ্কের উৎকীর্ণ স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে। গুপ্ত সাম্রাজ্যর পতন ও শশাঙ্কের উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলায় বেশ কিছু স্বাধীন শাসকের উদ্ভব ঘটে।

শশাঙ্কের রাজ্যজয়:

গৌড়ের স্বাধীন নৃপতি শশাঙ্ক দক্ষিণে দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুরের দাতন), উৎকল (বালেশ্বর অঞ্চল) ও কঙ্গোদ ( উড়িষ্যার গঞ্জাম জেলা) জয় করেন। পশ্চিমে মগধ তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল।


শশাঙ্ক বনাম হর্ষের দ্বন্দ্ব:

দেবগুপ্ত ও শশাঙ্ক যৌথভাবে কনৌজ আক্রমণ করেন। গ্রহবর্মন পরাজিত হন এবং রাজ্যশ্রীকে বন্দী করা হয়। থানেশ্বর-রাজ প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যুর পর থানেশ্বরের রাজা রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এই যুদ্ধে দেবগুপ্ত পরাজিত ও নিহত হন অন্যদিকে রাজ্যবর্ধন শশাঙ্কের হাতে নিহত হন। রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুতে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন ও শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। শশাঙ্কের শক্তি বৃদ্ধিতে কামরূপ-রাজ ভাস্কর বর্মন ভীতি হয়ে হর্ষের পক্ষে যোগ দেন। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প-তে বলা হয়েছে, হর্ষ শশাঙ্ককে পরাজিত করেন। শশাঙ্ক ও হর্ষের মধ্যে কোনও যুদ্ধ সম্পর্কে বানভট্ট ও হিউয়েন সাঙ নীরব থেকেছেন। বলাবাহুল্য ৬৩৭ সালে শশাঙ্কের মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি গৌড়, মগধ, দন্ডভুক্তি, উৎকল ও কঙ্গোদের অধিপতি ছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তার পুত্র মানবদেব আট মাস গৌড় রাজ্য শাসন করেন।



শশাঙ্কের ধর্ম:

শশাঙ্ক শিবের উপাসক ছিলেন। বানভট্ট শশাঙ্ককে গৌড়াধম ও গৌড়ভুজঙ্গ বলে অভিহিত করেন। হিউয়েন সাঙ বলেন , শশাঙ্ক বুদ্ধগয়ার পবিত্র বোধীবৃক্ষ ছেদন করেন। তিনি পাটালিপুত্রে বুদ্ধের চরণচিহ্ন অঙ্কিত প্রস্তরখণ্ড বিনষ্ট করেন এবং কুশীনগর বিহার থেকে বৌদ্ধদের তাড়িয়ে দেন। তার মতে এই সমস্ত পাপে শশাঙ্ক দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যান।

শশাঙ্কের কৃতিত্ব:

রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, বানভট্টর মতো চরিত-লেখক অথবা হিউয়েন সাঙ এর মতো ব্যাক্তি থাকলে হয়তো হর্ষবর্ধনের মতোই তার খ্যাতি চারিদিকে বিস্তৃত হয়তো। কিন্তু অদৃষ্টের নিদারুণ বিড়ম্বনায় তিনি স্বদেশে অখ্যাত ও অজ্ঞাত এবং শত্রুর কলঙ্ক কালিমাই তাহাকে জগতে পরিচয় করিয়েছে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী:

২. বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, রমেশচন্দ্র মজুমদার, ১৯৯৮, পৃষ্ঠা ৩৬।
৩) ভারতের ইতিহাস, জীবন মুখোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৬৩।
Advertisement advertise here