থানেশ্বর রাজ্যর পুষ্যভূতি বংশ।

author photo
- Thursday, February 28, 2019

পুষ্যভূতি বংশ।

থানেশ্বর রাজ্য বা পুষ্যভূতি বংশ (ইংরেজি: Pushyabhutis Dynasty) সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। তবে বলা যায়, খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকের শেষ বা ষষ্ঠ শতকের সূচনায় পূর্ব পঞ্জাবের কুরুক্ষেত্রের কাছে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশ উদ্ভূত হয়। এরা বৈশ্য জাতীয় ছিলেন এবং এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিল পুষ্যভূতি। এরা গুপ্ত রাজাদের অধীনে সামন্ত ছিলেন। পুষ্যভূতি বংশের রাজারা হলেন মহারাজা নরবর্ধন, আদিত্যবর্ধন, প্রভাকরবর্ধন, রাজ্যবর্ধন ও হর্ষবর্ধন।


প্রভাকরবর্ধন:

পুষ্যভূতি বংশের উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন প্রভাকরবর্ধন। তিনি কনৌজের রাজা গ্রহবর্মনের সঙ্গে নিজ কন্যা রাজ্যশ্রী-র সঙ্গে বিবাহ দেন। এর ফলে উত্তর ভারতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক জোটের উদ্ধব হয়। ৬০৫ সালে প্রভাকরবর্ধন মারা যান।

রাজ্যবর্ধন:

প্রভাকরবর্ধন মৃত্যুর পর তার পুত্র রাজ্যবর্ধন সিংহাসনে বসেন। তিনি মালব-রাজ দেবগুপ্তকে যুদ্ধে পরাজিত করেন, কিন্তু অপর দিকে শশাঙ্কের হাতে তিনি নিহত হন আনুমানিক ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে।

হর্ষবর্ধন:

ভ্রাতা রাজ্যবর্ধন মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন মাত্র ১৬ বছর বয়সে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের সিংহাসনে বসেন। হর্ষবর্ধন ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে একটি নতুন বর্ষ গণনা বা অব্দের প্রচলন করেন তাকে হর্ষব্দ বা হর্ষ-সম্বৎ বলা হয়। হর্ষবর্ধনের জীবনী সম্পর্কে জানা যায় বাণভট্টর হর্ষচরিত ও চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বিবরণ থেকে। হর্ষবর্ধনের পিতা ছিলেন প্রভাকরবর্ধন।

বাণভট্টর কথা অনুসারে বন্দী ভগিনী রাজ্যশ্রী-কে হর্ষবর্ধন উদ্ধার করেন। হর্ষবর্ধন শিলাদিত্য উপাধি ধারণ করেন। হর্ষবর্ধনের রাজধানী ছিল কনৌজ।



হর্ষবর্ধন গৌড় রাজ শশাঙ্ক এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করেন। বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ কারো রচনাতে এই যুদ্ধের কোন বর্ণনা নেই। শশাঙ্কর মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন মগধ, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গ জয় করেন। শশাঙ্কের রাজ্যর অন্তর্ভুক্ত পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গ কামরূপ রাজ ভাস্কর বর্মনের রাজ্যভুক্ত হয়। হর্ষবর্ধন বাতাপির চালুক্য বংশীয় রাজা দ্বিতীয় পুলকেশী-র কাছে পরাজিত হন ৬১৮-৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে। হর্ষবর্ধনকে পরাজিত করে দ্বিতীয় পুলকেশী পরমেশ্বর উপাধি ধারণ করে। বাণভট্টর মতে হর্ষবর্ধন নেপাল ও কাশ্মীর দখল করেন। হর্ষবর্ধন কে সকল উত্তর পথ নাথ বলা হয়েছে। হর্ষবর্ধনের সম্রাজ্য র বিস্তৃতি ছিল পূর্ব পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিম বিহার। দক্ষিণে তার রাজ্য সীমা নর্মদা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।


হর্ষবর্ধন সুপণ্ডিত শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি কবিতা ও নাটক লিখতেন। হর্ষবর্ধন রচিত নাগানন্দ, প্রিয়দর্শিকা ও রত্নাবলী নাটক তিনটি সংস্কৃত ভাষায় লেখেন। বহু বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিক তার রাজসভায় ছিলেন। বাণভট্ট ছিলেন হর্ষবর্ধনের সভাকবি। তিনি হর্ষবর্ধনের জীবনীমূলক গ্রন্থ হর্ষচরিত রচনা করেন সংস্কৃত ভাষায়। এছাড়া বাণভট্ট কাদম্বরী রচনা করেন। এই যুগে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ বিদ্যা চর্চার শ্রেষ্ট পীঠস্থান ছিল। জয়সেন নামক জৈনিক বৌদ্ধ পণ্ডিতকে হর্ষবর্ধন উড়িষ্যার ৮০ টি গ্রাম দান করেন।

হর্ষবর্ধন ছিলেন শিব ও সুর্যের উপাসক। তিনি সকল ধর্মের প্রতি সহনশীল ছিলেন। হর্ষবর্ধন হিউয়েন সাঙের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য ৬৪২ খ্রিস্টাব্দ হর্ষ কনৌজে ধর্ম সম্মেলনের আহ্বান করেন। হর্ষবর্ধন প্রায়াগের মেলায় তিন মাস জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে অকাতরে দান করতেন। হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় জানা যায়, হর্ষবর্ধন প্রজাদের জন্য সরাইখানা, বিশ্রামাগার স্থাপন করেন। প্রায়াগের মেলা মহামোক্ষ ক্ষেত্র নামে পরিচিত।

প্রাচীন ভারতে অশোকের পর হর্ষবর্ধনের মত প্রজাসুলভ নরপতি পাওয়া দুষ্কর। রাধাকুমদ মুখোপাধ্যায় মনে করেন, হর্ষবর্ধনের চরিত্রে অশোক ও চন্দ্রগুপ্তের চারিত্রিক গুণাবলী সমাবেশ ঘটেছিল।

COMMENTS