PayPal

শিখ ধর্মে নারীর অবস্থান

author photo
- Wednesday, February 13, 2019

শিখ ধর্মে নারী অধিকার ও মর্যাদা

বিখ্যাত মধ্যযুগীয় চিশতী সুফী বাবা ফরিদ উদ্দীন গজ-ই-শক্কর হিন্দু, মুসলমান ও শিখ সকলের কাছেই সমান শ্রদ্ধেয়। তিনি অত্যন্ত মধুর কবিতা রচনা করতেন তাই তিনি গঞ্জ-ই-শক্কর নামেও পরিচিত। গঞ্জ-ই-শক্কর কথাটির অর্থ হল মিছরির ভাণ্ডার। তিনি শুরু নানকের প্রজন্মের অনেক আগে জন্ম গ্রহণ করায় দুজনের সাক্ষাৎ হয়নি। তবে পাঞ্জাবের ঐ সুফীর কাব্যের দ্বারা গুরুনানক গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং শিখদের পবিত্র গ্রন্থ "গ্রন্থসাহেবে" বাবা ফরিদের কাব্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দেশ ভাগের পর বাবা ফরিদের দরগাহ যা পশ্চিম পাঞ্জাবের পাকপতানে অবস্থিত, যেটি বর্তমানে পাকিস্তানে চলে যায়। তা সত্ত্বেও ধর্মপ্রাণ শিখ তীর্থ যাত্রীগণ যখন পাকিস্তানে অবস্থিত গুরুদার ভ্রমণ করেন তখন বাবা ফরিদের দরগাহ এ গমন করে তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শিখ ধর্মে নারীর মর্যাদা
বাবা ফরিদের কাব্যে যে নারীকণ্ঠ আছে তা নতুনত্বের দাবি করে না, বরং প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে তার মিল আছে। এখানে প্রেমময় ভক্তি প্রকাশ পাচ্ছে আদর্শ স্ত্রীর মাধ্যমে যাকে সােহাগণ বলা হয়েছে। তবে পারস্পরিক ভালবাসায় যে সমতার চেতনা থাকে তা এখানে রক্ষিত হয় নি। এখানে ঈশ্বর রূপ স্বামী সকল ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী। এখানে প্রেক্ষময় মিলন স্বামীর মর্জির উপর নির্ভরশীল। এখানে ফরিদ যেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঠামােকে শক্তিশালী করেই, মহিলাদের জন্য একটু জায়গা সৃষ্টি করছেন। এই হেঁয়ালিটি মাথায় রাখতে হবে। অর্থাৎ বাবা ফরিদের নারী আধ্যাত্মিকতার স্বাদ পেতে পারেন তবে তা পারিবারিক সীমান্তের মধ্যেই।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সংক্রান্ত চেতনা কিভাবে একটি বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় তা বুঝতে গেলে ফরিদের কাব্যের সঙ্গে পাঞ্জাবের আরেক সুফ কবি শাহ হােসেনের কাব্যের তুলনা করা যেতে পারে। হােসেনের কবিতায় নারী সরাসরি ঈশ্বরকে সম্বােধন করছেন। ঈশ্বর এর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ হােসেনের কাব্যে একই স্থানে অবস্থান করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঠামােকে স্বীকার করে নিলেও হােসেনের কাব্যে এই কাঠামােকে প্রান্তিক অবস্থান দেওয়া হয়েছে। তার কাব্যে নারী একজন ব্যক্তি হিসেবে ঈশ্বরকে সম্বােধন করে। পাঞ্জাবের এই ঐতিহ্য শিখ ধর্মে নারীর অবস্থান বুঝতে সাহায্য করবে।[ J. S. Grewal - "Female Voice in Punjabi Sufi Poetry" in Mansura Haidar edited Sufi, Sultans and Feudal Order New Delhi, 2004 ]

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে ভারতে, বিশেষতঃ উত্তর ভারতে সামাজিক রক্ষণশীলতা বৃদ্ধি পায় যা সমাজে নারীর অবস্থা আরও শােচনীয় করে তােলে। মুসলিম ধর্মীয় আইন ধর্ম তথা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের বিভেদ করে না। সম্পত্তির অধিকার, বিবাহ বিচ্ছেদ তথা পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে মুসলিম নারীর অবস্থা তাত্ত্বিকভাবে উন্নততর। ভারতে মুসলিম রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু মুসলিম আইনের এই সুবিধা হিন্দু সমাজের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হয়নি, অর্থাৎ হিন্দু নারীর শােচনীয় অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। এই পটভূমিতে শুরু নানকের আবির্ভাব ঘটে যিনি শিখ ধর্মমতের প্রবক্তা। সমাজে বা মহিলাদের হীন চোখে দেখতাে তাদের সমালােচনা করে নানক প্রশ্ন করেন, "যারা মহাপুরুষদের জন্ম দেন তাদের কেন হীন বলা হবে?" (আদি গ্রন্থ, রাগ আম আ, পৃঃ ৪৭৩, cited in Sunita Puri, Advent of sikh Religion, A Socio-Political Perspective, New Delhi, 1993) সেই যুগে যে সমস্ত যােগী একদিকে নিজেদের ব্রহ্মচারী বলতাে আরেক দিকে লালসার দৃষ্টিতে মহিলাদের দেখতো তাদের তিনি কঠোর সমালোচনা করেন।

শিখ ধর্মে ব্রহ্মচারী কথা বলে না। স্বাভাবিক বিবাহিত জীবন শিখ ধর্মে বলা হয়েছে। নানকের মতে বিবাহ মানবিক দুর্বলতার পরিচয় বহন করে না বরং সুস্থ বৈবাহিক জীবন আধ্যাত্মিক উন্নতির সােপান। আদিগ্রন্থে স্পষ্ট বলা আছে যে বিবাহ কেবল দৈহিক মিলন নয়, আধ্যাতিক মিলনও বটে। শিখ একেশ্বরবাদ বিবাহিত নর-নারীর দুই আত্মার মিলনের কথা বলে। নানকের উপদেশে এক পুরুষের সঙ্গে এক নারীর সম্পর্কে জোর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন নারী বা একাধিক স্ত্রী গ্রহণকে উৎসাহ দেওয়া হয়নি। ব্যভিচারকে নিন্দা করা হয়েছে। সাবেকী সমাজে বৈবাহিক জীবনে কেবলমাত্র মহিলাদের কাছেই আনুগত্য প্রত্যাশা করা হতাে। নানক বললেন এই আনুগত্য দুই তরফেই থাকা প্রয়ােজন অর্থাৎ সুস্থ দাম্পত্য জীবনে নারী-পুরুষ উভয়েই পরস্পরের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে। এইভাবে নারীর মর্যাদা স্থাপনে নামক প্রয়াসী হয়েছিলেন।

পরিবারকে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ একক হিসেবে দেখা হয়েছে শিখ ধর্মে এবং বলা হয়েছে যে পরিবারের সদস্যদের নৈতিক ও জাগতিক উন্নতির ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী উভয়েই সমান দায়িত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। নানক মহিলাদের শাস্ত্র পাঠে উৎসাহিত করেছেন এবং প্রার্থনা সভায় পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে অংশগ্রহণ করার কথা বলেছেন। এটা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কেননা হিন্দু নারীর বেদ পাঠের অধিকার ছিল না এবং তাদের শুদ্ধ মনে করা হতাে না বলে মন্দিরে প্রবেশ এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও অংশ গ্রহণ করতে দেওয়া হতাে না।

সতীদাহ ও বিধবা বিবাহ নিয়ে গুরু নানক কিছু বলেননি। তবে পরবর্তী শিখ গুরুগণ নানক কর্তৃক নারীর মর্যাদা রক্ষার প্রয়াসে অনুপ্রাণিত হয়ে শিশুকন্যা হত্যা বা সতীদাহকে কঠোর সমালােচনা করেছেন। তৃতীয় শিখ গুরু অমর দাস বলেছেন, "প্রকৃত সতী হলেন সেই নারী যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর সৎ ও পবিত্র জীবন যাপন করেন। প্রকৃত সতী স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাপিয়ে পড়েন না..." ( আদি গ্রন্থ, রাগ সুহি, সুনীতা পুরী কর্তৃক উদ্ধৃত)। শিখ ধর্মে বিধবা বিবাহে অনুমােদন আছে অবশ্য বিধবাদের যদি তাতে সম্মতি থাকে। অর্থাৎ তাত্ত্বিকভাবে হিন্দু বিধবার তুলনায় শিখ বিধৰা অধিক স্বাধীনতা ভােগ করে। গুরু অমর দাসের আরেকটি কৃতিত্ব হল এই যে তিনি যােগ্য শিখ মহিলাদের ধর্মপ্রচার কার্যেও নিয়ােগের অনুমতি দেন এবং সাবেকী ধর্মীয় ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা থেকে মহিলাদের যুক্ত করার কথা ভাবেন।

শিখ ধর্মশাস্ত্রে নারী পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে। গুরু নানক এই সমতার উপর গুরুত্ব দিলেও মনে রাখা দরকার যে সেই যুগে নারী স্বাধীনতা বলে যা বােঝাতাে তা বর্তমান যুগের স্বাধীনতার ধারণার থেকে পৃথক। নানকের চেতনায় আদর্শ নারীর যে ভাবমূর্তি তার সঙ্গে গতানুগতিক সমাজে নারীর ভাবমূর্তির মৌলিক পার্থক্য নেই। নারী যদি রূপে, গুণে অসামান্যাও হন তবু তার কাছে বিনম্রতা এবং স্বামী তথা পরিবারের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য প্রত্যাশা করা হয়েছে। তবু মনে রাখতে হবে যে মধ্যযুগের পটভূমিতে নানক নারীকে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব ক্ষেত্রে যে মর্যাদা দিয়েছেন তা উপেক্ষা করার মতাে নয়। হিন্দু সমাজে যখন নারীকে সমস্ত পাপের উৎস হিসেবে দেখা হতাে, সেই পরিস্থিতিতে নানক কর্তৃক নারীকে মর্যাদা দানের মধ্য দিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর সমাজ জীবনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়াস যথেষ্ট প্রশংসার দাবী রাখে।

No comments:

Post a Comment