শ্যামা-হক মন্ত্রীসভার গঠন ও পতন

- January 27, 2019
১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে হক (ফজলুল হক) প্রােগ্রেসিভ কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। এই মন্ত্রীসভা শমা - হক মন্ত্রিসভা নামে পরিচিত। এই মন্ত্রিসভা গঠনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন জে.সি.গুপ্ত, শরৎচন্দ্র বসু, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়, শামসুদ্দিন আহমেদ, হাসেম আলি খান, হেমচন্দ্র নস্কর ইত্যাদি নেতা। পাঁচমিশালী দল নিয়ে এই মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তবে কংগ্রেস এই মন্ত্রীসভায় যােগদান করেনি। প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ছাড়া এই মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ (লীগ পদত্যাগকারী), খান বাহাদুর আব্দুল করিম (স্বতন্ত্র), খান বাহাদুর হাসেম আলি খান (হকের কৃষক-প্রজা পার্টি), শামসুদ্দিন আহমেদ (কৃষক-প্রজা পার্টির এক অংশের নেতা), শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায় (হিন্দু মহাসভা), সন্তোষ কুমার বসু (ফরওয়ার্ড ব্লক), প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (ফরওয়ার্ড ব্লক) এবং উপেন্দ্রনাথ বর্মন (তফসিলি হিন্দু)।
শ্যামা হক মন্ত্রিসভা
পাঁচমিশালী দল নিয়ে গঠিত এই মন্ত্রীসভা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে গােড়া থেকেই যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। এই মন্ত্রীসভার সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য হল হিন্দু মহাসভার মতাে একটি সাম্প্রদায়িক দলের অন্তর্ভুক্তি। হকের পক্ষে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ এবং এর ফলে মুসলিম সমাজে তার ভাবমূর্তি বিপন্ন হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। হকে উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সূচনা করা। সারা ভারত হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখােপাধ্যায় লাভ করেছিলেন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর (অর্থ) এবং তার উজ্জ্বল উপস্থিতির জন্যই এই মন্ত্রীসভা শ্যামা-হক মন্ত্রীসভা নামে পরিচিত হয়।

১৯২৯ সালে কংগ্রেস সদস্য হিসাবে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবন। ১৯৩০ সালে কংগ্রেস আইনসভা বর্জন নীতি গ্রহণ করায় তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি নিজে আইনসভা বর্জন নীতির বিরােধী ছিলেন। কংগ্রেসের নীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারায় তিনি ১৯৩৯ সালে হিন্দু মহাসভায় যােগদান করেন। ১৯৩৭-৪১ সালে গঠিত লীগ-হক মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন অন্যতম বিরােধী নেতা। লীগ-হক মন্ত্রিসভায় লীগের শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। তখন শ্যামাপ্রসাদ হিন্দুমহাসভায় যােগদান করেন এবং পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে হিন্দুদের দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করেন। আইনসভাতেও তিনি হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার্থে সচেষ্ট হন। লীগ-হক মন্ত্রিসভার আমলে তিনি চাকরিক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ, মাধ্যমিক শিক্ষা বিল প্রভৃতির বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে তিনি একজন কট্টর হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতা হিসাবে পরিচিত। কাজেই এমন একজন মানুষকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে হক কঠোর সমালােচনার সম্মুখীন হন। অনেক মুসলমানই এটা মেনে নিতে পারেননি। মনে রাখা ভাল লীগ-হক মন্ত্রিসভা ক্ষমতাসীন থাকার সময় লীগ এই সুযােগে তার শক্তি অনেক বৃদ্ধি করেছিল। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। পাকিস্তান পরিকল্পনা তাদের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। সর্বভারতীয় ভরে জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম সম্প্রদায় আরও বেশি সংঘবদ্ধ হয়েছিল। বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল।

এই রকম এক জটিল পরিস্থিতিতে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পথ অবশ্যই মসৃণ ছিল না। হকের একমাত্র মূলধন ছিল তার নিজস্ব জনপ্রিয়তা। কিন্তু তাঁর অনুসৃত নীতি ও পথ মুসলিম সম্প্রদায় কতদূর সমর্থন করবে, গােড়া থেকেই তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। তাঁর নিজস্ব দল প্রজা-কৃষক পার্টি অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছিল। দলছুট নেতা শামসুদ্দিন আহমদের অধীন প্রজা-কৃষক পার্টির ভগ্নাংশের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। সংগঠন গড়ে তােলার কোন ক্ষমতা বা যােগ্যতাও হকের ছিল না। অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত লীগ হৃত জমি পুনরুদ্ধারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। হকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ধবংস নামিয়ে লীগ নেতারা চেয়েছিলেন মুসলিম জনগণের কাছে নিজেদের আরও বিশ্বাসযােগ্য ও গ্রহণযােগ্য কলে তুলতে। আহনসভা নয়, গণ সংযােগকেই তারা করতে চেয়েছিল নিজেদের শক্তির ভিত্তি ও উৎস। তাদের লক্ষ্য ছিল হককে একঘরে করা। সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিন ও তমিজদ্দিনের মতাে দক্ষ নেতা ও সংগঠক সারা প্রদেশ চষে বেড়িয়ে অসংখ্য জনসভায় হকের মুন্ডুপাত করতে থাকেন, হককে বিশ্বাসঘাতক ও মুসলমানদের শত্রু বলে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়। তিনি বাঙালি ও অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছেন বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযােগ করা হয়। মন্ত্রিসভায় হিন্দমহাসভার মাত্র একজন প্রতিনিধি থাকলেও এই মন্ত্রিসভাকে শ্যাম হক মন্ত্রিসভা নামে চিহ্নিত করা হয়। মুসলিম লীগের মুখপাত্র স্টার অফ ইন্ডিয়া ত বটেই, লীগ সমর্থক দৈনিক আজাদ, মনিং স্টার প্রভৃতি পত্রিকাও হকের বিরুদ্ধে প্রচারে অবতীর্ণ হয়। স্বয়ং জিন্না হক বিরােধী প্রচারে অবতীর্ণ হন এবং পূর্ববঙ্গ সফর করেন। তিনি বাঙালি মুসলমানদের বােঝাতে সচেষ্ট হন যে তারা ভারতের মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না এবং লাহাের প্রস্তাবে বাংলার মুসলমানরাই উপকৃত হবে। এইভাবে গণসংযােগের মাধ্যমে লীগ নিজ প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারে অনেকাংশে সফল হয় এবং ১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে নাটোরের যে উপনির্বাচন হয় তাতে হকের মনােনীত প্রার্থী লীগের প্রার্থীর কাছে শােচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। লীগের প্রার্থী পেয়েছিলেন ১০,৪৮৩টি ভােট। হকের মনােনীত প্রার্থী পান মাত্র ৮৪০টি ভােট। তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

পায়ের তলায় মাটি পেতে হক উঠে পড়ে লাগেন। তিনি “প্রগতিশীল মুসলিম লীগ” নামে লীগের একটি পাল্টা সংগঠন গড়ে তুলতে সক্রিয় হন। ইসলামের স্বার্থ এর প্রাথমিক লক্ষ্য হলেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারও রক্ষিত হবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনিও পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। কিন্তু তার এইসব প্রচেষ্টা অনেকাংশে ব্যর্থ হয়। লীগের পাল্টা সংগঠন গড়ে তােলার কাজ বেশিদূর এগােয়নি। আসলে বাংলার মুসলমানরা তখন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের দিকেই আকৃষ্ট হয়েছিল। ফজলুল হকের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নীতি অবশ্যই কংগ্রেস, কৃষক-প্রজা পার্টি ও হিন্দু মহাসভার মনঃপূত ছিল। হকের আদর্শ ছিল যেভাবে হােক বাংলার স্বার্থরক্ষা করা এবং তার জন্যই তিনি হিন্দু মুসলিম ঐক্যের উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি এমনকি স্বাধীন বঙ্গরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও দেখেছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল স্বাধীন সেই রাষ্ট্রের দুটি স্বায়ত্তশাসিত বিভাগ থাকবে। একটি হিন্দু অত্যুষিত পশ্চিমবঙ্গ ও অপরটি মুসলিম প্রধান পূর্ববঙ্গ। কিন্তু শুধু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাই নয়, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাও তার বিপক্ষে ছিল। ১৯৪২ সালের ১০ই মে হিন্দুমহাসভা বাংলার বিভিন্ন স্থানে “পাকিস্তান বিরােধী দিবস" পালন করে। বাংলার মুসলমান সম্প্রদায় এতে গভীরভাবে আহত হয় এবং হিন্দুমহাসভার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখার জন্য তারা ফজলুল হককে দায়ী করে। সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের জন্য পঞ্চাশ শতাংশ পদ সংরক্ষিত হলেও সেই অনুযায়ী মুসলমানদের নিয়ােগ করা হয়নি বলেও হকের বিরুদ্ধে অভিযােগ করা হয়। প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে হক জিন্নার সঙ্গে বিরােধ মিটিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কোন কিছুতেই তিনি বাংলার স্বার্থ বিসর্জন দিতে রাজি ছিলেন না।

বাংলার গভর্নর জন হার্বার্ট শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার সঙ্গে সহযােগিতা করা দুরের কথা, তার বিরােধিতা করায় হকের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি সরকারের অনেক গােপন তথ্য ও নথিও সোহরাওয়ার্দীর হাতে পাচার হয়ে যেত। শ্যামাপ্রসাদ অভিযােগ করেন যে ক্লাইভ স্ট্রিটের প্রতি অনুগত আমলাতন্ত্র সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। শ্যামাপ্রসাদ দাবি করেছিলেন জাপানিদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্য বাঙালিদের সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হােক। ব্রিটিশ সরকার এই পরামর্শ বাতিল করে দেয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হবার পর তা কিভাবে মােকাবিলা করা হবে সে বিষয়ে জন হার্বার্ট হককে কিছু নির্দেশ দেন। হক তা নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলােচনা করতে চাইলে গভর্নর অনুমতি দেননি। বরং গভর্নরের নির্দেশ না মানলে হকের পদত্যাগ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই বিষয়ে শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গেও গভর্নরের গুরুতর মতবিরােধ ছিল। গভর্নরের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় শেষপর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদ ১৯৭২ সালের ২০শে নভেম্বর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। আসলে গভর্নরের চাইছিলেন মুসলিম লীগকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে। গভর্নরের এই অসহযােগিতার কথা হক ভাইসরয়কে লিখিকভাবে জানান। ভাইসরয় লিনলিথগো তার সত্যতা পুরােপুরি অস্বীকার করতেও পারেননি। কিন্তু তাতে হক রক্ষা পাননি। শেষপর্যন্ত হকের সঙ্গে গভর্নরের বিরোধ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়ায় যে, মন্ত্রিসভায় ইউরোপীয় গােষ্ঠী সরকারকে সমর্থন না করে মুসলিম লীগের সহায়তায় শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেবার নীতি গ্রহণ করে। ১৯৪৩ সালের ২৮শে মার্চ হার্বার্ট হককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। তাই বলা যায় শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পতনের জন্য দায়ী ছিল গভর্নর হার্বার্টের অসহযােগিতা ও বিরুদ্ধ মনােভাব।

শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পতন বাংলার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। হিন্দু-মুসলিম মৈত্রীর যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা শেষপর্যন্ত ভেঙে যায় এবং বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের কালাে মেঘ ঘনিয়ে আসে। এর পর থেকেই মুসলিম লীগের শক্তি দ্রুততর গতিতে বাড়তে থাকে এবং সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হতে থাকে। হকের এই ব্যর্থতার জন্য তিনি নিজেও অনেকটা দায়ি ছিলেন। তার কৃষক প্রজা পার্টির ভিত্তি ছিল খুব দুর্বল এবং জনগণের মধ্যে তার প্রভাব ছিল ক্ষীণ। তার উপর এই দল দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষক-প্রজা পার্টির এই দুর্বলতার পূর্ণ সুযােগ গ্রহণ করে মুসলিম লীগ। এই অবস্থার জন্য দায়ী ছিলেন স্বয়ং হক। দলকে শক্তিশালী করার জন্য যে সাংগঠনিক শক্তি ও দক্ষতার প্রয়ােজন, তা তার ছিল না। অধিকাংশ সময় তিনি কলকাতায় কাটাতেন বলে দুরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে যােগাযােগ রাখতে পারতেন না। তার প্রধান মূলধন ছিল তার নিজস্ব জনপ্রিয়তা। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তায় যখন ঘাটতি পড়ল, তখন তার পক্ষে দীর্ঘদিন টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।