শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা

author photo
- Sunday, January 27, 2019
advertise here

শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার গঠন ও পতন (১৯৪১-১৯৪৩):


** ১৯৪১ সালে ডিসেম্বর মাসে হক প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করে। এই মন্ত্রিসভা শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা নামে পরিচিত। এই মন্ত্রিসভা গঠনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন জে. সি. গুপ্তা, ফজলুল হক, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, হাসেম আলী খান, হেমচন্দ্র নস্কর, সামসুদ্দিন আহমেদ ইত্যাদি নেতৃবৃন্দ।

কংগ্রেস এই মন্ত্রিসভায় যোগদান করেনি। প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক ছাড়া এই মন্ত্রিসভার অন্যান সদস্যদের মধ্যে ছিলেন নবাব খাজা হাবীবুল্লাহ (লীগ পদত্যাগকারী), খান বাহাদুর আব্দুল করিম (সত্বন্ত্র), খান বাহাদুর হাসেম আলী খান (হকের কৃষক প্রজা পার্টি), সামসুদ্দিন আহমেদ (কৃষক প্রজা পার্টির নেতা), শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (হিন্দু মহাসভা), সন্তোষ কুমার বসু (ফরওয়ার্ড ব্লক), প্রমথনাথ বন্দোপাধ্যায় (ফরওয়ার্ড ব্লক) এবং উপেন্দ্রনাথ বর্মন (তপসিলি হিন্দু)। এই মন্ত্রিসভা গঠিত ছিল পাঁচমিশালি দল নিয়ে। এই মন্ত্রিসভার বৈশিষ্ট্য ছিল হিন্দু মহাসভার মত একটি সাম্প্রদায়িক দল গঠন। হকের পক্ষে এটি ছিল সাহসী পদক্ষেপ এবং এর ফলে মুসলিম সমাজে তার ভাবমূর্তি বিপন্ন হবার সম্ভাবনা ছিল। হকের উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে বাংলার রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা সূচনা করা। সারা ভারত হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লাভ করেছিলেন একটি অত্যন্ত অর্থদপ্তর এবং তার উজ্জ্বল উপস্থিতির জন্যে এই মন্ত্রিসভা শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা নামে পরিচিত।

** ১৯৩০ সালে কংগ্রেস আইনসভা বর্জন করলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করে। তিনি ১৯৩৯ সালে হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন। ১৯৩৭-১৯৪১ সালে গঠিত লীগ হক মন্ত্রিসভায় তিনি ছিলেন অন্যতম বিরোধী নেতা। লীগ হক মন্ত্রিসভায় লীগের শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কংগ্রেস হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। এইসময় শ্যামাপ্রসাদ হিন্দুমহাসভায় যোগদান করেন এবং পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে হিন্দুদের দুরবস্থা লক্ষ্য করে। লীগ হক মন্ত্রিসভার আমলে তিনি চাকুরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণ, মাধ্যমিক শিক্ষা বিল প্রভূতির বিরোধিতা করেন। এইরকম একজন হিন্দুকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে ফজলুল হক সমালোচনার সম্মুখীন হয়। অনেক মুসলমান এটা মেনে নিতে পারেনি। মনে রাখা ভালো লীগ হক মন্ত্রিসভা ক্ষমতাসীন থাকার সময় লীগ এই সুযোগে তার শক্তি অনেক বৃদ্ধি করেছিল। মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পাকিস্থান পরিকল্পনা তাদের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। সর্বভারতীয় স্তরে জিন্নার নেতৃত্বে মুসলিম সম্প্রদায় আরো বেশি সংঘবদ্ধ হয়েছিল। বাংলায় হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল।




** এই পরিস্থিতিতে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পথ ছিল কঠিন। হকের একমাত্র মূলধন ছিল নিজের জনপ্রিয়তা। ফজলুল হকের নিজ দল কৃষক প্রজা পার্টি অস্তিত্বের সংকটে ভুগছিল। অন্যান্য নেতাদের লক্ষ্য ছিল ফজলুল হককে একঘরে করা। সোহরওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিন ও তমিজউদ্দিন মতো দক্ষ নেতা ও সংগঠক সারা প্রদেশে চষে বেড়িযে, হককে বিশ্বাসঘাতক বলেন। তিনি বাঙালি ও অবাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চান বলে অভিযোগ করা হয়। মন্ত্রিসভায় হিন্দুমহাসভার একজন প্রতিনিধি থাকলেও এই মন্ত্রিসভাকে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা নামে চিহ্নিত করা হয়। মুসলিম লীগের মুখপাত্র স্টার অফ ইন্ডিয়া তো বটেই, লীগ সমর্থক দৈনিক আজাদ, মর্নিং স্টার প্রভুতি পত্রিকা হকের বিরুদ্ধে প্রচারে অবতীর্ণ হয়। জিন্না হকের বিরোধিতা করে। ১৯৪২ সালে নাটোরে যে উপনির্বাচন হয় তাতে হকের মনোনীত প্রার্থী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়। লীগের প্রার্থী ভোট পেয়েছিল ১০,৪৮৩ ভোট। হকের মনোনীত প্রার্থী ভোট পান ৮৪০ টি ভোট। তার জামানত বাজিয়াপ্ত হয়।

** ফজলুল হক প্রগতিশীল মুসলিম লীগ নামে লীগের একটি পাল্টা সংগঠন গড়ে তুলতে সক্রিয় হন। ইসলামের স্বার্থ এর প্রাথমিক লক্ষ্য হলেও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারও রক্ষিত হবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। লীগের পাল্টা সংগঠন গড়ে তোলার কাজ বেশিদূর আগায়নি। আসলে বাংলার মুসলমানরা তখন সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের দিকেই আকৃষ্ট হয়েছিল।



** বাংলার গভর্ণর জন হাবার্ট শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার বিরোধিতা করে। এমনকি সরকারের অনেক গোপন তথ্য ও নথি সোহরওয়ার্দীর হাতে পাচার হত। গভর্নরের সঙ্গে মতবিরোধের জন্যে শ্যামাপ্রসাদ ১৯৪২ সালে ২০ নভেম্বর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে। এদিকে হক মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য আবেদন করলে, গভর্ণর নাকচ করে। গভর্নরের এই অসহযোগিতা কথা হক ভাইসরয়কে লিখিত জানান। ভাইসরয় লিনলিথগো তার সত্যতা পুরোপুরি অস্বীকার করতেও পারেননি। কিন্তু তাতে হক রক্ষা পাননি। শেষপর্যন্ত হকের সঙ্গে গভর্নরের বিরোধ এমন এক পর্যায়ে দাঁড়ায়, মন্ত্রিসভায় ইউরোপিয় গোষ্ঠী সরকারকে সমর্থন না করে মুসলিম লীগের সহায়তায় শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা ভেঙে দেবার নীতি গ্রহণ করে। ১৯৪৩ সালে ২৮ মার্চ হার্বার্ট হককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা ভালো ভাবে কাজ করতে পারেনি।

** শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পতন বাংলার ইতিহাসে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। হিন্দু মুসলিম মৈত্রীর যে সপ্ন। তিনি দেখেছিলেন, তা শেষপর্যন্ত নষ্ট হয়। এরপর থেকেই মুসলিম লীগের শক্তি দ্রুততর গতিতে বাড়তে থাকে এবং সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হতে থাকে। হকের কৃষক প্রজা পার্টির ভিত্তি ছিল খুব দূর্বল এবং জনগণের মধ্যে এর প্রভাব ছিল অল্প। তার উপর এই দল দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষক প্রজা পার্টির দুর্বলতার সুযোগ নেন মুসলিম লীগে। এই অবস্থার জন্য দায়ী ছিল ফজলুল হক। দলকে শক্তিশালী করার জন্য যে সাংগঠনিক শক্তি ও দক্ষতার প্ৰয়োজন, তা তার ছিল না।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী:

১) ইসলাম সিরাজুল বাংলা দেশের ইতিহাস - ১ম খণ্ড।
২) Chatterjee, Joya-Bengal Divided.
৩) Banerjee, S.-Caste, Politics and The Raj Bengal.
৪) Sen, Shila-Muslim Politics in Bengal (1937-47)
৫) Jalal, Ayesha-The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan.
৬) Banerjee, S.-(ed.) Bengal:Rethinking History.
Advertisement advertise here