১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব

- January 21, 2019
সিপাহি বিপ্লব, ১৮৫৭ সাল মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে শুরু হয় এবং শীঘ্রই মিরাট,দিল্লী, অযোধ্যা এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এটা সারা বাংলাদেশ ও ভারত জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের খন্ডযুদ্ধসমূহ বাংলাদেশকে সর্তক ও উত্তেজনাকর করে তুলেছিল। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের পদাতিক বাহিনী প্রকাশ্য বিদ্রোহে মেতে ওঠে এবং জেলখানা থেকে সকল বন্দিদের মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ লুণ্ঠন করে নেয়, কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হয়।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব
চট্টগ্রামে সিপাহীদের মনোভাব ঢাকার রক্ষা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। সিপাহীদের আরও অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় কর্তৃপক্ষ ৫৪তম রেজিমেন্টের তিনটি কোম্পানি এবং একশত নৌসেনা ঢাকায় প্রেরণ করে। একই সাথে যশোর, রংপুর, দিনাজপুর এবং বাংলাদেশের আরও অনেকগুলি জেলায় নৌ-ব্রিগেড পাঠানো হয়। প্রধানত ইউরোপীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠিত করে ঢাকা রক্ষা করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

নৌ-বিগ্রেড ঢাকায় পৌঁছে সেখানে নিয়োজিত সিপাহীদের নিরস্ত্র করতে গেলে অবস্থা চরমে ওঠে। ২২ নভেম্বর লালবাগে নিয়োজিত সিপাহিগণকে নিরস্ত্র করতে গেলে তারা প্রতিরোধ সৃষ্টি করে এবং হাতাপাই হয়। সংঘটিত খন্ডযুদ্ধে বেশ কিছু সিপাহী নিহত ও বন্দি হয় এবং অনেকেই ময়মনসিংহের পথে পালিয়ে যায়। অধিকাংশ পলাতক সিপাহী গ্রেপ্তার হয় এবং অতিদ্রুত গঠিত সামরিক আদালতে সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য তাদের সোপর্দ করা হয়। অভিযুক্ত সিপাহিদের মধ্যে ১১ জন মৃত্যুদন্ড এবং বাকিরা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হয়। এই রায় আদালতে দ্রুত কার্যকর করা হয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে সিলেট, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর এবং যশোরে চাপা ও প্রকাশ্য উত্তেজনা বিরাজমান ছিল। পলাতক সিপাহি ও ইউরোপীয় সৈন্যদের মধ্যে সিলেট এবং অপরাপর স্থানে কয়েকটি সংঘর্ষ ঘটে, যার ফলে উভয় পক্ষেই প্রাণহানি ঘটে একপ্রকার মহাযুদ্ধ বেঁধে যায়। সিলেট এবং যশোরে বন্দি ও নিরস্ত্র সিপাহীদের স্থানীয় বিচারকদের দ্বারা বিচার করা হয়। ফাঁসি ও নির্বাসন ছিল এই বিচারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

সিপাহি বিপ্লবের যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ভূমিকা ও প্রতিক্রিয়া একটি অনুজ্জ্বল চিত্র প্রতিফলিত করে। জমিদার-জোতদারগণ নিশ্চিতভাবে সিপাহীদের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ গরু ও ঘোড়ারগাড়ি এবং হাতি সরবরাহ করতে, পলায়নরত সিপাহিদের গতিবিধির সন্ধান প্রদান এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে স্থানীয় স্বেচছাসেবক বাহিনী গড়ে কোম্পানির স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কৌশলগত সমর্থন প্রদান করতে থাকে।

সরকার কৃতজ্ঞতার সাথে জমিদার-জোতদারগণের এ সকল সেবার স্বীকৃতি প্রদান করে, পরে তাঁদেরকে নায়েব, খান বাহাদুর, খান সাহেব, রায় বাহাদুর, রায় সাহেব প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করে এবং নানান পার্থিব সম্পদ দ্বারা পুরস্কৃত করে। জমিদার-জোতদারগণের প্রদর্শিত ভূমিকা অনুসরণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কোম্পানির সরকারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। সাধারণ মানুষ ও কৃষককুল সার্বিকভাবে এ বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং সিপাহি বিপ্লবের যুদ্ধের স্পর্শ থেকে দূরে ছিল।

গ্রন্থপঞ্জী:
1. R. C. Majumder - History of Freedom Movement Vol. I.
2. Rudrangshu Mukherjee - Awadh in Revolt.
3. Bipan Chandra - Modern India.
4. Sekhar Bandyopadhyay – From Plassey to Partition : A History of Modern India.
5. V. D. Savarkar - History of the War of Independence.
6. প্রমােদ সেনগুপ্ত - মহাবিদ্রোহের ইতিহাস।
7. S. Sen - Eighteen Fifty Seven.
8. R. C. Majumder - The Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857.
9. রজনীকান্ত গুপ্ত - সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস।
10. S. B. Chaudhuri - Civil Distiurbances during the Britis Rule in India.