PayPal

সাঁওতাল বিদ্রোহ ইতিহাস

author photo
- Wednesday, January 23, 2019

সাঁওতাল বিদ্রোহ

১৭৯৩ সালে বাংলাদেশে লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে উপজাতিদের উপর অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে যাঁরা বিদ্রোহের পথ নিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান উপজাতি হল সাঁওতালরা। এরা ছিল পরিশ্রমী, সরলমতি এক কৃষিজীবী উপজাতি বা আদিবাসী শ্রেণী। ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়। ড: বিপিন চন্দ্র, বরুণ দে ও অমলেশ ত্রিপাঠী "ফ্রীডম স্ট্রাগল (Freedom Struggle)" গ্রন্থে বলেছেন অরণ্য বৃক্ষের অধিকারকে কেন্দ্র করে সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়। তাদের দামিন ই কো অঞ্চলে এই বিদ্রোহ হয়েছিল। সাঁওতালরা ভাগলপুর ও রাজমহলের মধ্যভাগে দামিন ই কো নামক অঞ্চলে বাস করত। পরে সাঁওতালরা প্রধানত বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, বীরভূম, মালভূম প্রভুতি অঞ্চলের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত। ১৮৫১ সালে এই "দামিন ই কো" অঞ্চলে প্রায় ১,৪৩৭ টি সাঁওতাল গ্রাম ছিল এবং প্রায় ৮২,৭১৫ জন সাঁওতাল আদিবাসী এখানে বাস করত। ১৮৫৫ সালে সাঁওতালরা ডিকু বা বহিরাগতদের বিতাড়িত করতে সংকল্প নেন। জমিদার, মহাজন ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৮৫৫ সালে বিহারের ছোটনাগপুরের ভাগনাডিহি গ্রামে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ শুরু হয়।

সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ

১) সাঁওতালরা পরিশ্রমের দ্বারা ছোট নাগপুরের অনুর্বর জমিকে উর্বর করে তুলতো। কিন্তু উপনিবেশিক শাসক ও তাদের সহযোগী দেশীয় জমিদাররা বেআইনিভাবে সাঁওতালদের জমি দখল করতে থাকে।

২) সাঁওতালরা ডিকুদের বর্বরতার শিকার হয়। প্রায়ই তাদের মারধর করা হত। সাঁওতাল মহিলাদের উপর মহাজনদের প্রতিনিধি, ইজারাদার, ইউরোপীয় রেলকর্মী ও অন্যান্যরা অত্যাচার এবং শোষণ চালাতো।

৩) চিরস্থায়ি বন্দোবস্ত প্রবর্তনের হবার পর পোড়া হাটের জমিদার জমিদারী নিয়ে নিলে বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, বীরভূম, মালভূম, ছোটনাগপুর, পালামৌ, হাজারীবাগ প্রভুতি অঞ্চলের সাঁওতাল উপজাতিরা আবাদি জমি হারায়।

৪) উপনিবেশিক শাসনের ফলে সাঁওতালদের জীবনযাত্রার গুণগত মানের অবনতি ঘটে। সাঁওতালরা নিজেদের প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় অভ্যস্থ ছিল। কিন্তু নতুন উপনিবেশিক যুগের আইন আদালত, পুলিশী ব্যবস্থা তাদের কাছে অপরিচিত ছিল। অন্যদিকে নীল চাষের জন্য নীলকর সাহেবরা সাঁওতালদের উপর অত্যাচার চালাতো।

৪) বহিরাগত মহাজন ও ব্যবসায়ী কর্তৃক সহজ সরল সাঁওতালদের বঞ্চনা ও ঋণের দায়ে জমি দখল ও ঘরছাড়া হত।

৫) ব্যবসায়ীরা দুই প্রকার বাটখারা ব্যবহার করত। তেল, লবণ প্রভুতি দ্রব্য বিক্রির সময় তারা কম ওজনের বাটখারা ব্যবহার করত, এই বাটখারার নাম ছিল বেচারাম। আর সাঁওতালদের কাছ থেকে যে শস্য নিত, তা ভারী ওজনের বাটখারার সাহায্যের যার নাম ছিল কেনারাম।

৬) সাঁওতালদের টাকা দাদন দেবার সময়, মহাজন এক প্রকার বন্ড তাদের দ্বারা সই করিয়ে নিত। প্রথম ধরনের বন্ডের নাম ছিল কামিয়াতি। যতদিন না এই ঋণ শোধ হবে ততদিন এই বন্ড অনুসারে মহাজনের জমিতে বেগার খাটতে বাধ্য হত। দ্বিতীয় ধরনের বন্ডের নাম ছিল হারওয়াহি। এই বন্ড অনুসারে মহাজনের জমিতে বিনা পারিশ্রমিক

সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা

সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা ছিলেন সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ডোমন মাঝি ও কালো প্রামাণিক। কলিয়ান হরাম ছিলেন সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসের লিপিকার ও সাঁওতালদের গুরু। তিনি তাঁর "হরকোরেন মারে হাপরাম্বো রিয়াক কথা" শীর্ষক একটি রচনায় সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিবৃত্ত লিখে রেখে গেছেন। এই ইতিবৃত্তে সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক সিধু ও কানুর সংগ্রাম-ধ্বনি, যথাঃ "রাজা-মহারাজাদের খতম করো", "দিকুদের (বহিরাগত মহাজনদের) গঙ্গা পার করে দাও", "আমাদের নিজেদের হাতে শাসন চাই" প্রভৃতি লেখা আছে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের এলাকা

চুনায় মুর্মুর দুই পুত্র সিধু ও কানুর নির্দেশে ১৮৫৫ সালে ৭ জুলাই বিহারের ভাগনাডিহি গ্রামে সাঁওতাল বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল, কালক্রমে বীরভূম, ভাগলপুর, মুর্শিদাবাদ, রাঁচি, হাজারীবাগ, ছোটনাগপুর, মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পালামৌ প্রভুতি অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এরা ইংরেজ শাসনের নাগপাশ থেকে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল। নিম্নবর্ণের হিন্দুরা সাঁওতালদের প্রতি সমর্থন জানায়। দীঘি খানার দারোগা মহেশ দত্তকে হত্যা করে। সাঁওতালদের দমনের জন্য ভাগলপুর থেকে মেজর বারোজ আসলে সাঁওতালরা তাকে পীরপাইতির যুদ্ধে পরাস্ত করেন। সাঁওতাল বিদ্রোহিরা মহাজন নিধন যজ্ঞে মেতে ওঠে। লর্ড ডালহৌসি এই বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে। বারহাইতের যুদ্ধে সাঁওতালরা শোচনী়ভাবে পরাজিত হয়। চাঁদ ও ভৈরব নিহত হন। সিধু ও কানু ধরা পড়েন।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ব্যর্থতা

১) সাঁওতালদের তীর, ধনুক, বল্লম প্রভুতি ছিল প্রাচীন আমলের, অন্যদিকে ইংরেজ বাহিনীর আধুনিক হাতিয়ার ব্যবহার।

২) ইংরেজ বাহিনী ছিল যুদ্ধে নিপুণ অন্যদিকে সাঁওতালরা ছিল যুদ্ধে অনভিজ্ঞ।

৩) সাঁওতালদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না।

৪) সাঁওতালদের অভিজ্ঞ সেনানায়ক ছিল না ও সংখ্যায় কম ছিল।

সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল ও তাপর্য

১) সরকার অধিকাংশ সাঁওতালদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করেন। সরকার সাঁওতালদের সুশাসনের জন্য ভাগলপুর ও বীরভূম জেলার কিছু অংশ নিয়ে সাঁওতাল পরগনা গঠন করেন। উপজাতি হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দেয়।

2) সুদের হার হ্রাস করা হয়, সাঁওতালদের জন্য স্বতন্ত্র আদালত স্থাপন করা হয়।

৩) সরকারি কর্মচারীদের জনসাধারণের অভাব অভিযোগের প্রতি লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। গ্রাম প্রধান ও গাঁও মাঝিকে সম্মান দেওয়া হয়।

৪) সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল একটি কৃষক বিদ্রোহ ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের গণসংগ্রাম।

৫) এই বিদ্রোহ ছিল পরবর্তী গণসংগ্রামগুলি বিশেষ করে ১৮৫৭ খ্রি: মহাবিদ্রোহের অনুপেরণা।

সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রকৃতি

সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ভারতের কৃষকশ্রেণীর অভ্যুত্থান। আধুনিক গবেষকরা সাঁওতাল বিদ্রোহকে কেবলমাত্র উপজাতি বিদ্রোহ বলে মনে করেন না। এটি ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ এবং তা থেকে সঞ্চিত এদেশীয় জমিদার মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষিজীবী মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ। সাঁওতাল শ্রেণীর গণ্ডি ছড়িয়ে নিম্ন বর্ণের দরিদ্র হিন্দুদের মধ্যেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছিল। এটি শুধুমাত্র কৃষক বিদ্রোহ ছিল না, এটি ছিল একটি স্বাধীনতার যুদ্ধ। অর্থনৈতিক শোষণ থেকে এর উদ্ধব হলেও "খেরওয়ার" বা স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা ছিল এই বিদ্রোহের লক্ষ্য।

No comments:

Post a Comment